শাইখ সিরাজকে বলছি

ঞ্যোহলা মং
আমি কৃষক নই। তবে বড় হয়েছি নদীতে মাছ ধরে, নিজেদের কৃষি জমিতে নানাকাজে সহায়তা করে। ছোটবেলায় অবসর সময়ে গ্রামবাসী আর আত্মীয় কৃষকের কাজেও অনেকভাবে সাহায্য করেছি। আমার বাবাও একজন ছোটখাট কৃষক। সময় সুযোগ পেলে তাঁর অল্প কিছু জায়গায় কৃষি কাজ করতে অধিক সাচ্ছন্দবোধ করেন। চাকরি জীবনে যে স্কুলগুলোতে শিক্ষকতা করেছেন সেইসব স্কুলের চারপাশে গাছপালা রোপন করেছেন (যেমন: মহালছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গাছসব বাবার নিজ হাতে লাগানো)।
কৃষি কাজের সাথে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে যোগসূত্র থাকাতে বিটিভি’র সময় থেকে হৃদয়ে মাটি ও মানুষের সূচনা সংগীত শুনলে পড়ার টেবিলে মন ধরে রাখা কঠিন ছিল। কৃষকের সাথে আন্তরিকতা, ভালবাসা এবং উপস্থাপনার সৌন্দর্য্যতা আপনাকে সকলের শাইখ সিরাজে পরিণত করেছে। আপনি এখন শুধু দেশে নন বহিঃ বিশ্বেও কৃষি ব্যক্তিত্ব হিসেবে সমান জনপ্রিয়। আপনার সাফল্য আমাদের যেমন আনন্দিত করে তেমনি আপনাকে পুরস্কৃত করলেও আমরা গর্বিত হই।
আপনার অনেকগুলো কাজের মধ্যে ছাদ কৃষি আমার খুব ভাল লাগে। শহর বন্দরে দালানকোঠার ছাদে ছাদে সবুজে ভরে উঠলে আপনি যতটুকু খুশি হবেন তার চাইতে আমরা আপনার ভক্তরা বেশি খুশি হবো। আমাদের দেশকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে এই ছাদ কৃষি। ঢাকা শহরকে এখন যারা বায়ু দূষণে সেরা দু’ নম্বর শহর হিসেবে জানে, তা বিপরীত হয়ে প্রথম সারির পরিবেশ বান্ধব শহরের দিকে ধাবিত হতে খুব বেশি সময় নিবে না। আপনার ডাকে সাড়া দিয়ে নানা শ্রেণি পেশার মানুষ নানাভাবে এগিয়ে আসছেন তা হৃদয়ে মাটি ও মানুষ প্রোগ্রাম দেখে বুঝতে পারি।
আমাদের দেশের মানুষজনকে সবকিছুতে উদ্বুদ্ধ করতে হয়। নিজ থেকে উদ্যোগ নিয়ে কাজ করার উদাহরণ কম। আপনার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকে ছাদে বাগান করছেন সত্যি কিন্তু কিছু ছাদ কৃষক অতি উৎসাহিত হয়ে ছাদের সীমানা প্রাচীর (রেলিং) এর উপরেও টব রেখে বাগান চর্চা করছেন। যা একদিকে ঝুঁকিপূর্ণ ছাদ বাগান হিসেবে গণ্য হতে পারে। কারণ তারা যদি এই ঝড়ো বৃষ্টি আর দমকা হাওয়ার দিনে টবগুলোকে ছাদের মেঝেতে নামিয়ে না রাখেন, পথচারিদের জন্য তা বিপদ ডেকে আনতে পারে। শহরে হঠাৎ দমকা হওয়ায় যে কোন সময় টব নিচে পথচারির মাথায় পড়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
গাছে পেরেক লাগিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচার
আমাদের দেশে যারা দালানকোঠা নির্মাণ করেন তাদের অনেকে কোন ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নিয়ে নির্মাণ কাজ করে থাকেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে নানা সময় পেপার পত্রিকায় দেখা যায় নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত ভারি জিনিসপত্র যেমন বাঁশ, ইট নিচে পড়ে পথচারির মৃত্যু খবর।
২০১৪ সালে, আমিও এমনি একটি ঘটনা থেকে একটুর জন্য বেঁচে গিয়েছিলাম। একদিন ঢাকা শহরে সলিমুল্লাহ রোডে হাঁটছিলাম হঠাৎ কোনকিছু বুঝার আগে একটি লম্বা বাঁশ ঠিক আমার সামনে উপর থেকে পড়ে যায়। সেই বাঁশটি ঠিকমতো আমার শরীরে পড়লে বাঁচার কথা নয়। আপনার ছাদ কৃষি আন্দোলনে, কৃষকরা যাতে টবগুলোকে সঠিক ও নিরাপদ স্থানে রাখেন সেদিকে নজর দেয়ার জন্য আহবান রাখবেন বলে প্রত্যাশা রাখছি। যাতে টব নিচে পড়ে একজন লোকেরও ক্ষতি না হয়।
আজ আরো একটি বিষয়ের প্রতি নজর দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে শেষ করতে চাই। আপনার আহবানে কিছু ছাদে ছোট ছোট নানা প্রজাতির গাছের সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছে সত্যি আবার এইও সত্যি যে, আমাদের দেশের শহর অঞ্চলের রাস্তাঘাটে ছোট বড় অনেক গাছপালা ব্যবসায়ি আর রাজনীতিবিদদের অত্যাচারে কমতে শুরু করেছে। কেননা দেশের এই রাস্তঘাটে যে পরিমানে বিজ্ঞাপন দেখা যায় তার প্রায় সব ভার বহন করতে হয় রাস্তার দুপাশে থাকা গাছপালাগুলোকে। গাছের প্রাণ আছে, আমরা জানি। তাই এই প্রাণের উপর আমরা পেরেক লাগিয়ে প্রতিদিন যেভাবে বিজ্ঞাপন প্রচার করছি তা কোন অবস্থাতেই এই গাছগুলো স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারে না। আসাদ গেইটের দুধারে যতগুলো গাছ রয়েছে প্রতিটি গাছে শত শত পেরেক পাওয়া যাবে। ফলে রাস্তার ধারে থাকা গাছপালা ধীরে ধীরে মানুষের নানা অত্যাচারে প্রাণ হারিয়ে ফেলতে পারে। এমন উদাহরণ শহরের অনেক জায়গায় পাওয়া যাবে।
আমাদের নানা ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচারের প্রয়োজন থাকতে পারে কিন্তু বিজ্ঞাপন দাতাদেরকে পরিবেশ বান্ধব বিজ্ঞাপন প্রচারে উদ্বুদ্ধ করা গেলে শহরের অনেক গাছপালা আপনাকে অভিনন্দন জানাবে। এই নিরব প্রাণিদের অভিনন্দন আপনি দেখতে পাবেন তাদের পাতা, ফুল ও ফল দেখে।
আমরা চাইলেই পেরেক এর বদলে নানা সুতা বা প্লাষ্টিক তার ব্যবহার করতে পারি। আপনি আপনার প্রোগ্রামের শেষে, প্রায় বলে থাকেন ‘একটু চেষ্টা করে দেখুন, আপনিও হয়ত এই ছাদ কৃষিতে আনন্দ খুঁজে পেতে পারেন’। আর আমি বলবো আপনিই পারেন শহরের কোন দালান থেকে কোন টব যেন মানুষের গায়ে না পড়ে তার উদ্যোগ নিতে। আপনিই পারেন শহরের গাছপালাকে বিজ্ঞাপনের নামে পেরেক আক্রমন থেকে বাঁচাতে। কারণ দেশের মানুষ আপনাকে ভালবাসে, আপনার ডাকে তারাই সাড়া দিবে।

লেখক: উন্নয়নকর্মীও ইউএন ইনডিজেনাস ফেলো।
ইমেইল:[email protected]

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। পাহাড়বার্তার -এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য পাহাড়বার্তা কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।