স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে প্রায় এক যুগ আগে। স্বামী পরিত্যক্তা, ষাটোর্ধ্ব বিধবা মা আর তিন সন্তান নিয়ে বিধবা লাচ্ছি বালা ত্রিপুরার সংসার। মা আর ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ভাইয়ের বাড়িতেই আশ্রিত ছিল এ পাহাড়ী নারী। অন্যের জমিতে কাজ করেই চলতো তার সংসার।
কয়েক বছর আগে ভাই তাদেরকে বাড়ি থেকে বের করে দিলে ধন্তীরামপাড়ার বিক্রম ত্রিপুরা পৈত্রিক জমিতে একটি ফুটো টিনের চালা দিয়ে ঝুপড়ি ঘরে বৃদ্ধ মা আর তিন ছেলে-মেয়েকে নিয়ে বসবাস শুরু করে লাচ্ছি বালা ত্রিপুরা।
অন্ন, শিক্ষা, চিকিৎসা আর বাসস্থান হারিয়ে লাচ্ছি বালা ত্রিপুরা মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। কথা বলেন এলোমেলো। মা আড়াল হলেই দূরে কোথাও চলে যান। তাই বাধ্য হয়েই মেয়েকে শিকলে বেঁধে রেখেছেন ষাটোর্ধ্ব মা হৈমন্তী ত্রিপুরা। আর এভাবেই গত চার মাসের বেশী সময় ধরে শিকলে বাঁধা তিন সন্তানের জননী লাচ্ছি বালা ত্রিপুরার জীবন। সেখানে শুয়ে-বসে দিন কাটে তার। সে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা সদর ইউনিয়নের দুর্গম ধন্তীরামপাড়ার বাসিন্দা।
বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সোমবার (১৫ জুলাই) দুপুরের দিকে ঘটনাস্থলে ছুটে যান মাটিরাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ডেজী চক্রবর্তী।
এসময় মাটিরাঙ্গা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. ইশতিয়াক আহম্মেদ, মাটিরাঙ্গা সদর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান হেমেন্দ্র ত্রিপুরা ও উপসহকারী প্রকৌশলী মো. রুহুল আমিন উপস্থিত ছিলেন।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, ফুটো টিনের ঝুপড়ি ঘরের খুঁটির সাথে হাতে শিকল ও তালা দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে মানসিক ভারসাম্যহীন লাচ্ছি বালা ত্রিপুরা। পাশেই তার নাবালক তিন সন্তানকে নিয়ে বসে আছে তাঁর বৃদ্ধা মা হৈমন্তী। মায়ের চোখে-মুখে-কপালে চিন্তার ভাঁজ। বন্দি জীবন থেকে মুক্তির জন্য শিকল ধরে টানাটানি করছেন আনিসা। মাঝে মাঝেই নিজের রাগ-ক্ষোভ ঝাড়ছেন মায়ের উপর।
ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলা ও ত্রিপুরা ভাষায় মেয়ের চিকিৎসা আর নাতী-নাতনিদের শিক্ষাসহ ভরন পোষন নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়ে বৃদ্ধ হৈমন্তী ত্রিপুরা বলেন, নিজেদের জমি নেই। অন্যের জমিতে এ ছোট্ট ঘরেই তাদের বসবাস। বৃষ্টির সময় বসবাস করা কঠিন হলেও নাতী-নাতনিদের আগলে রাখেন। ঠিকমতো খাবার জোটেনি। প্রতিবেশীরা দিলে খাওয়া হয়। নইলে উপোষ থাকেন। জানতে চাইলে বলেন, যেখানে মাথা গোঁজার ঠাই নেই সেখানে মেয়ের চিকিৎসা কিভাবে করবেন।
প্রতিবেশী বিক্রম ত্রিপুরা বলেন, তাদের সংসারে খুব অভাব। লাচ্ছি বালা ত্রিপুরার চিকিৎসাসহ পরিবারটির পুনর্বাসনের দাবী জানান তিনি। আরেক প্রতিবেশী প্রমিলা ত্রিপুরা বলেন, কয়েকমাস আগে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন থেকে তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। এখন তাদের ভরন পোষনসহ মানসিক ভারসাম্যহীন লাচ্ছি বালা ত্রিপুরার চিকিৎসাসহ পুনর্বাসনের সরকারের কাছে দাবী জানান।
মাটিরাঙ্গা সদর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান হেমেন্দ্র ত্রিপুরা বলেন, লাচ্ছি বালা ত্রিপুরার চিকিৎসার অভাবে শিকলে বাঁধা থাকে, তা তিনি জানতেন না। বিষয়টি জেনেই তাদের খবর নিতে ছুটে এসেছেন। লাচ্ছি বালা ত্রিপুরার চিকিৎসার ব্যবস্থা সহ তাদের পুনর্বাসনের উপজেলা নির্বাহীয় অফিসারের সাথে কথা বলে উদ্যোগ নেবেন বলে জানান।
মাটিরাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ডেজী চক্রবর্তী বলেন, বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে জানার পর আমরা সরেজমিনে দেখলাম। আপাতত: ওই পরিবারের থাকার ঘর মেরামতের জন্য দুই বান্ডিল ঢেউটিন, খাদ্য ও নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হলো। তার চিকিৎসায় ও সন্তানদের লেখাপড়ার নিশ্চিত করতে সমাজ সেবা অফিসারকে বলেছি। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসুচীর আওতায় ওই পরিবারটির পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হবে বলে তিনি জানান।



