শুধু সুবচনেই দায় শেষ?

‘নিমতলীর আগুনের পর রাসায়নিক কারখানা ও গোডাউন নিয়ে নিউজ করায় বাড়ির মালিকরা বেশ বিরক্ত হতেন। সাংবাদিকদের ওপর হামলাও হয়। এলাকার লোকজন গোডাউন ও কারখানার তথ্য গোপনের আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। তাদের সেই বিরক্তি কিংবা তথ্য গোপনের নির্মম ফল পাওয়া গেল চকবাজারে।’

ক্ষুব্ধ কণ্ঠে কথাগুলো বললেন একটি বেসরকারি টেলিভিশনের এক সাংবাদিক। এতগুলো মানুষ পুড়ে অঙ্গার হওয়ার পরও কারখানা মালিকরা লোভ সামলাতে পারেননি। শুক্রবারও সাংবাদিকদের ওপর গোডাউন ও কারখানা মালিকরা বিরক্ত হয়েছেন।

তবে এসব ঘটনায় সরকার, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এমনকি স্থানীয় মানুষ– কেউই দায় এড়াতে পারেন না বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন। তিনি বলেন, ‘একটি গোডাউন ভাড়া দেওয়ার কারণে বাড়িওয়ালা পাঁচ লাখ টাকা আগাম পাচ্ছেন। টাকার লোভে কেমিক্যাল রাখতে বাড়ি ভাড়া দিচ্ছেন তারা। কিন্তু এই লোভ প্রশাসন প্রশ্রয় দেবে কেন? সরকার বা প্রশাসন থেকে এখানে আইন প্রয়োগ হয়নি কেন?’

প্রশাসনের কাজ কি শুধু সুবচন দেওয়া? সুবাক্য বিতরণ করলেই সব দায়-দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? বুধবার রাতে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে মেয়র, মন্ত্রী, প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিসহ রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যে অনেকটা সে রকমই মনে হয়। পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা কী রকম ভয়াবহ আগুনের গ্রাসে ঢুকে গেল, দুর্ঘটনার প্রাবল্য কতখানি ছিল, ক্ষতির পরিমাণ কোথায় গিয়ে দাঁড়াল বা দাঁড়াতে পারে, সে সব নিয়ে ইতিমধ্যেই বিস্তর চর্চা হচ্ছে। কিন্তু প্রায় সবাই জানতে চান, দায়টা প্রশাসন এড়িয়ে যাবে কীভাবে?

ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল ওয়াহেদ ম্যানসন ও আশপাশের এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে বৃহস্পতিবার শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বলেন, আগুনে পুড়ে যাওয়া ভবনে কোনো রাসায়নিক গুদাম নেই। মন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পরদিনই পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় আগুনের ঘটনায় আলোচিত ওয়াহেদ ম্যানসনের বেজমেন্টে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিকের বিপুল মজুদ পেল ফায়ার সার্ভিস। এখানে আগুন ছড়ালে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতো বলে জানিয়েছে তারা।

নয় বছর আগেই যে গুদাম সরানোর ঘোষণা ও পরে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেটাই আবার নতুন করে দিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন। তিনি বলেছেন, পুরান ঢাকায় দাহ্য পদার্থের গোডাউন থাকতে দেবেন না। এজন্য প্রয়োজন কঠোর থেকে কঠোরতম পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সরকারের মন্ত্রীরাও রাসায়নিক ব্যবসা কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করাসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছেন।

রাসায়নিক সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক মুহিবুর রহমান বলেন, এখানে সরকারের দায় বেশি। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই ব্যর্থ হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

‘পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনে’র তথ্য মতে, ঢাকা শহরে প্রায় এক হাজার রাসায়নিক কারখানা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে প্রায় ৮৫০টি গড়ে উঠেছে অবৈধভাবে। সংস্থাটির চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, গুদামের মালিক, সিটি করপোরেশন ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা এ ঘটনার জন্য দায়ী। রাসায়নিক কারখানার মালিকরা অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিভাবেও শক্তিশালী। ফলে কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা যায় না। সরকারে বা প্রশাসনে যারা রয়েছেন, তাদের দায়িত্বটা তো শুধু বাণী বা বচন বিতরণে সীমাবদ্ধ নয়। নীতি নির্ধারণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সে সিদ্ধান্তের রূপায়ণ— সবটাই তো সরকার বা প্রশাসনের দায়িত্ব।

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।