সাজেকে খাদ্য সংকট অব্যাহত : ত্রাণ পৌঁছাতে হেলিকপ্টার সহায়তার দাবী

সরকারি ত্রানের অপেক্ষায় রাঙামাটির সাজেকের আদিবাসীরা
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের খাদ্য সংকট নিরসনে সরকারি ত্রাণ পৌঁছলেও যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় দূর্গত এলাকার জনগণ এখনও সে সুবিধা পাচ্ছে না। রাঙামাটির জেলা প্রশাসকের বরাদ্দকৃত খাদ্যশষ্য সোমবার সকালে সাজেক ইউনিয়নের মাচালং বাজারে ৫ শত পরিবারের মাঝে বিতরণ করেছে জনপ্রতিনিধিরা। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় দূর্গম এলাকার অনেক জনগণ আসতে পারেনি। আশপাশের গ্রামগুলো থেকে তিন-চার ঘন্টার পায়ে হাঁটা পথ অতিক্রম দিয়ে যারা এসেছেন তারাও হতাশ দশ কেজি করে চাল পেয়ে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা সংকট নিরসনে আরও বেশী খাদ্যশষ্য ও দূর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে হেলিকপ্টার সহায়তা চেয়েছেন।
সাজেকের শিলছড়ি এলাকার বাসিন্দা বর্ণ মালা ত্রিপুরা(৮৫) বলেন, চাল দিবে শুনে সোমবার ভোরে দু’ঘন্টার পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে মাচালং এসেছি। স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলের সংসারে থাকি, ছেলে জুম চাষ করত। গত ২ বছর ধরে জুমে ফসল হচ্ছেনা। দিনমজুর করে যে টাকা পায় তা দিয়ে সংসার চলে না। একবেলা খেয়ে অন্যবেলা না খেয়ে থাকি। আমাদের জীবন এখন জঙ্গলের আলু, লতা পাতার উপর নির্ভরশীল।
ফুলপাতাছড়া গ্রামের বাসিন্দা চন্দ্র লাল চাকমা(৩৫) জানান, গত বছর জুমের ফসল কম হয়েছে। ফসল তোলার কয়েক মাসের মধ্যে তা শেষ সে থেকে আর্থিক ও খাদ্য সংকটে ভুগছি। জুমের বীজ ফেলার সময় চললেও টাকা না থাকায় এ বছর জুম করতে পারছিনা। দিনমজুরি করে যে টাকা পায় তা দিয়ে চলে না।
একই গ্রামের রূপালী চাকমা। কোলে ৬ মাসের শিশু সন্তান। নিজের সঠিক বয়স কত জানে না সে। স্বামী চিত্তমনি চাকমা শারীরিক প্রতিবন্ধী। আগে অন্যের জুম ও ফসল তোলার সময়ে মজুরির কাজ করত। এখন সে সুযোগ বন্ধ। তাই নিজের পাশাশাপশি ৬ মাসের শিশু সন্তানকে নিয়ে অভুক্ত থাকা ছাড়া কোন গতি নেই তাঁর।
ভারতের মিজোরাম সীমান্ত ঘেঁষে ব্যাটলিং গ্রামের কার্বারী (গ্রাম্য প্রধান) মনি চাকমা জানান, তাঁর গ্রামের ২০ পরিবার বসবাস করে। তাদের অধিকাংশ জুমের ওপর নির্ভরশীল। গত ২ বছর ধরে জুম চাষ করে সুবিধা করতে পারছেনা। যে ফসল হয় তা পশুপাখি খেয়ে ফেলে। তাই অনেক গত বছর জুম চাষ করেনি। এতে করে পরিবার গুলো খুব অভাব অন্টন চলছে। সরকার থেকে ত্রাণ পাওয়ার আশায় দেড় দিন হেঁটে মাচালং এসেছে অনেকে কিন্তু দশ কেজি চাল খুব অপ্রতুল। টাকা না থাকায় স্থানীয় বাজার থেকে অনেকে চাল ক্রয় করতে পাচ্ছেনা।
সাজেক ইউপি চেয়ারম্যান নেলসন চাকমা জানান, বিগত ৪-৫ মাস ধরে সাজেকের ২০-২২টি গ্রামে আর্থিক ও খাদ্যের সংকটের কথা শুনে গত ২১ এপ্রিল উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব অর্থায়নে দূর্গত এলাকার ৪১০ পরিবারকে ৫ মেট্টিক টন খাদ্যশষ্য বিতরণ করা হয়। জেলা প্রশাসক থেকে পাওয়ার পর আজ(সোমবার) আরও ৫০০ পরিবারকে খাদ্যশষ্য বিতরণ করা হয়েছে। ২২ গ্রামের দুই হাজারের মতো পরিবারের জন্য পাওয়া বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল।
বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বড় ঋষি চাকমা জানান, অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করায় দিনদিন মাটির উর্বরতা শক্তি হ্রাস পাচ্ছে। তাই জুমিয়ারা ভাল ফলন পাচ্ছেনা। এতে করে তারা আর্থিক অনটনে ভুগছে। খাদ্যশষ্যের পাশাপাশি দূর্গম গ্রামগুলোতে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরী, মিশ্র ফলদ বাগান ও গৃহপালিত পশুপাখি পালনের ব্যবস্থা করে দিলে চলমান সংকট থেকে সাজেকবাসী মুক্তি পাবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(সন্তু গ্রুপ) বাঘাইছড়ি উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ত্রিদিপ চাকমা জানান, সরকার যে ত্রাণ দিচ্ছে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ সে সুবিধা দূর্গম এলাকাগুলোতে যাচ্ছেনা। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় সীমান্তবর্তী কমলাপুর, শিয়ালদাই, কলাবুনিয়া, তুইছুই, থারুমপাড়া, থাংলং’র মতো দেড়-দুই দিনের পায়ে হাঁটা এলাকার জনগণ সে সুবিধা পাচ্ছেনা। তাঁরা সেখানে তীব্র খাদ্য সংকটে রয়েছে। কলা গাছ, লতা পাতাসহ জঙ্গের আলু-শাক সব্জী খেয়ে তারা জীবন নির্বাহ করছে। সরকার যদি বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড(বিজিবি) সহায়তায় হেলিকপ্টারে করে দূর্গম এলাকাগুলোর জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা করে তাহলে মানুষগুলোর জীবন রক্ষা পাবে।
অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর, এমপির বরাদ্দকৃত ১০ মেট্টিক টন খাদ্যশষ্যের অনুমোদন গত রোববার রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ পেয়েছে বলে জানিয়েছেন চেয়ারম্যান বৃষকেতু চাকমা। দুই-একদিনের মধ্যে তা সাজেকে পৌঁছে যাবে বলে জানান তিনি।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।