শিবির ক্যাডার সাদাত উল্লাহ’কে নিয়ে বান্দরবান আওয়ামী লীগে তোলপাড়

একসময় বান্দরবানে অধ্যাপক পরিচয় দিয়ে দাপিয়ে বেড়াতেন। জামায়েত ঘরনার দৈনিক ইনকিলাব ও কর্ণফুলী প্রত্রিকার বান্দরবান প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে বান্দরবান প্রেসক্লাবের সামনে করতেন পত্রিকার এজেন্টের ব্যবসা। আর এর আড়ালে বিএনপি-জামায়েত সরকারের সময়ে জামায়েত শিবিরের রাজনীতির সাথে সক্রিয় থেকে আওয়ামী লীগ কর্মীদের উপর হামলার জন্য সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া থেকে শিবির ক্যাডারদের নিয়ে এসে নেতৃত্ব দিতেন। আর সেই সাদাত উল্লাহ খোদ গন ভবনে প্রবেশ করে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে অনুদান গ্রহন এবং এর আগে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে বিদেশ ভ্রমনের কারনে বান্দরবান আওয়ামী লীগ পরিবারে তোলপাড় চলছে।

সাত বছর আগে ফেসবুকে সাদাত উল্লাহ লিখেছিলেন, শেখ হাসিনার আছে পুলিশের শক্তি। আর আমাদের ঈমানের শক্তি। জীবন দিয়ে হলেও করবো আল্লামা সাইদীকে মুক্তি। যুদ্ধাপরাধের দায়ে যাবজ্জীবন পাওয়া সাঈদীকে মুক্ত করতে না পারলেও মাত্র সাত বছর পর সেই তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঢুকে অনুদান নিয়ে এলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে।

গত বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান, জামায়াতে ইসলামীর ক্যাডার সাদাত উল্লাহ দুঃস্থ সাংবাদিক হিসেবে দুই লাখ টাকার অনুদান পান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার হাতে এ অনুদান তুলে দেন। সাদাত উল্লাহ দৈনিক ইনকিলাবের বান্দরবান প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে এই অনুদান পেয়েছেন বলে জানা গেছে। এর কয়েক মাস আগেও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে জামায়াতে ইসলামী সক্রিয় সমর্থক সাদাত উল্লাহ আরও দুই লাখ টাকা অনুদান পেয়েছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

শুধু তাই নয়, কয়েক বছর আগে প্রধানমন্ত্রীর বহরে সফরসঙ্গী হয়ে বিদেশ সফর করে আলোচনায় আসেন তিনি। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার কারনে বান্দরবান আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে কিভাবে গেলেন জামায়েত শিবিরের এই নেতা। কারা তাকে এই সুযোগ করে দিলেন তা তদন্ত করারও দাবী জানান তারা।

বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অসুস্থ, অসচ্ছল ও দুর্ঘটনায় আহত সাংবাদিক ও নিহত সাংবাদিক পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আর্থিক সহায়তা ভাতা ও চেক বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পাশে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান এবং তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হাসানুল হক ইনু মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন।

ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি সরকারে যখনি এসেছি তখনই চেষ্টা করি, যেহেতু প্রধানমন্ত্রী কল্যাণ ফান্ড আছে একটা। আবার সেটা দেই কেন? কাকে দেই? কেন দেই কোথা থেকে দেই? এই নীতিমালা কি? এই প্রশ্নেরও সম্মুখীন হতে হয়। যেমন আমাদের অফিসে একটা চিঠি এসে গেল। কোন নীতিমালায় প্রধানমন্ত্রী টাকা দেন, আমি বলেছি লিখে দেন, প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছার নীতিমালায় দেন। এই ধরনের প্রশ্ন ওঠে। যাই হোক, মানুষকে সহযোগিতা করব, সেটা নিয়েও প্রশ্ন? তারপরে আবার তারাই বলবে, কথা বলার অধিকার নেই।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পিআইবি চেয়ারম্যান আবেদ খান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাফর ওয়াজেদ, বিএফইউজের সভাপতি মোল্লা জালাল ও মহাসচিব শাবান মাহমুদ।

সাদাত উল্লাহ’র বিষয় নিয়ে বান্দরবান প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মিনারুল হক তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেন, ভুল তথ্য দিয়েছেন কিনা, কারা তাকে সাহায্য করেছে, এগুলো ভেবে দেখা দরকার। কারণ তিনি না পেলে একজন দু:স্থ সাংবাদিক এই অর্থ পেতে পারতো।

জানা গেছে, একসময় তিনি বান্দরবানে বসবাস করতেন, সেই সুবাদে জামায়েত ঘরনার দৈনিক কর্ণফুলি ও দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকায় কাজ করতেন, থাকতেন শহরের ফায়ার সার্ভিস এলাকায়। এরপর সাদাত উল্লাহ ২০১২ সালের ৩ মে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। জামায়াতের প্রত্যক্ষ সমর্থনে তিনি সেবার নির্বাচিত হন। চরম্বা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মাস্টার শফিকুর রহমান সাদাত উল্লাহকে জামায়াতে ইসলামীর একজন ডোনার (অনুদানদাতা) হিসেবে নিশ্চিত করেছেন।

সাদাত উল্লাহ’র বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী বলেন,সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টে জামাতি আগ্রাসের আদ্যোপান্ত খতিয়ে দেখা হবে বলে জানালেন ট্রাস্ট এমডি সাংবাদিক ও কবি জাফর ওয়াজেদ।

এর আগে ২০১৩ সালের আগস্টে লোহাগাড়ার চরম্বা ইউপি চেয়ারম্যান থাকাকালে সাদাত উল্লাহর বিরুদ্ধে সাতজন ইউপি সদস্য কালোবাজারে ভিজিএফের ৪-৫ হাজার কেজি চাল কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ তোলেন। চরম্বা ইউপি চেয়ারম্যান চরম্বা ইউনিয়নের দুঃস্থ গরিব লোকজনের জন্য বরাদ্দকৃত ১২ হাজার ৪৬০ কেজি চাল সরকারি গুদাম থেকে তুলে কালোবাজারে বিক্রি করে দেন বলে ইউপি সদস্যরা অভিযোগ করেন।
২০১২ সালের ১১ জুলাই জামায়াতের ইসলামীর তৎকালীন সংসদ সদস্য ও বর্তমান কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর শামসুল ইসলাম কারাগার থেকে জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর সাদাত উল্লাহসহ জামায়াত নেতারা তাকে বরণ করে নেন। এ সংক্রান্ত একটি খবর তিনি ফেসবুকে শেয়ার করেন ওই বছরের ১৪ জুলাই।

সময় টিভির বান্দরবান প্রতিনিধি এস বাসু দাশ বলেন, বান্দরবানে সরকারের কোন মন্ত্রী সফরে আসলে সাদাত ঠেলেটুলে মন্ত্রীদের পাশে দাঁড়িয়ে যেতেন, আর কাউকে দিয়ে সুকৌশলে ছবি তুলে রাখতেন। পরে বিভিন্ন জায়গায় এই ছবি প্রদর্শন করে আওয়ামী লীগার সেজে এই ধরণের ফায়দা লুটতেন। বিষয়টি বান্দরবানে সাংবাদিকদের অজানা নয়।

আরো জানা গেছে, ২০১২ সালের ৩ ডিসেম্বর সাদাত উল্লাহর একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে আহ্বান জানানো হয়, আজ সারাদেশে সমাবেশে ১৪৪ ধারা জারি করার প্রতিবাদে জামায়াতের ডাকে আগামীকাল সারাদেশে সকাল সন্ধ্যা হরতাল সফল করুন। ২০১২ সালের ৮ ডিসেম্বর নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে সাদাত উল্লাহ লিখেছেন, হে আল্লাহ, আল্লামা সাঈদীকে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দাও ..।

এছাড়া তিনি একটি ছবি শেয়ার করেন, যাতে লেখা ছিল, নিরপরাধ আল্লামা সাইদীর ১ দিনের সাজা হলেও গ্রাম বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষ বাঁশের লাঠি, বর্শা-বল্লম ও তীর-ধনুক হাতে রাস্তায় নেমে পড়বে। ওই একই দিনে ফেসবুকে তার আরেকটি স্ট্যাটাস ছিল, শেখ হাসিনার আছে পুলিশের শক্তি। আর আমাদের ঈমানের শক্তি। জীবন দিয়ে হলেও করবো আল্লামা সাইদীকে মুক্তি। জাগো মুসলিম জাগো। আমরা সাইদী ভক্ত, পারলে ঠেকাও।’

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে জামাত-শিবিরের দায়িত্বশীল কোন পদে ছিলেন না বলে দাবি করে সাদাত উল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসগুলো মিথ্যা। তিনি এই অনুদানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদিন বীর বিক্রম পিএসসিকে মামা সম্বোধন করে ধন্যবাদ জানান এবং ২০১১ সালে সাংবাদিক কোটায় প্রধানমন্ত্রীর সাথে বিদেশ সফরের সুযোগ করে দেন বলে জানান।

এদিকে জামায়েত শিবির ক্যাডার চরম্বা ইউনিয়নে জামায়েত থেকে নির্বাচিত সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সাদাত উল্লাহ’র গন ভবনে প্রবেশ ও দু:স্থ সাংবাদিক হিসাবে অনুদানের অর্থ প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে গ্রহনের ঘটনায় বিস্ময় ও উদ্বেগ প্রকাশ করে এই ঘটনার জোর তদন্তের দাবি জানিয়েছে বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগ।

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।