হারিয়ে যাচ্ছে তংচঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী লোকগীতি উভাগীত

“গাইচ্ছোয়া ডঅরের্ কেঁয়ত্ কেঁয়ত্ সাম্পানান্ উসাল্লোই; যাইন্ নে ন যাইন্ কি জানি বেলান্ ডুবেল্লোই” বাংলাঃ-(গাছে গাছে ঘর্ষণ খেয়ে, গাছগুলো ক্যাঁচ ক্যাঁচ আওয়াজ করছে আর সাম্পান উজানে যাচ্ছে। যাবো কি যাবো না, তা জানি না; সূর্য ডুবে যাচ্ছে),”উরি যাইনে ফুঞ্চুনি গাইছত্পু ইজ্জেহৈ টগেক্কোয়া; ও চিয়ন্ বেই ভাঙি কঅ-না

কুবা ত নেক্কোয়া? বাংলাঃ-(উড়ে গিয়ে গাছের উপর বসেছে টিয়াপাখি। হে প্রিয়া, বলো না, কে-বা তোমার (হবু) স্বামী/প্রেমিক পুরুষ),”ইচর মাধাত্ ডাক্ কারেত্তে ডাক্কোয়া রাদাবাওই; এদক্ দোল্ দোল্পু রিত্তুনি কুবা লুইদুং মুই!,বাংলাঃ-(ইচরের মাথায় বসে ডাকছে বড় মোরগ। এতো সুন্দর পরীদের মধ্যে থেকে আমি কাকে বিয়ে করবো) উপরের কথা গুলো তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের কিছু লোকগীতি উভাগীত এর কয়েকটি চরণ।

অতীতকালে তংচঙ্গ্যা যুবক-যুবতী ও প্রেমিক-প্রেমিকারা যে গীত গেয়ে পরস্পর মনের ভাব প্রকাশ করতেন তা তংচঙ্গ্যা সমাজে উভাগীত নামে পরিচিত। তখনকার দিনে আধুনিক তংচঙ্গ্যা গান ছিল না। উভাগীতই ছিল মনের ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। তেমনটি জানালেন রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার ওয়াগ্গা ইউনিয়ন এর বাসিন্দা শিক্ষক ও তংচঙ্গ্যা ভাষার কবি, গীতিকার চন্দ্রসেন তংচঙ্গ্যা।

তিনি জানান, একসময় আমাদের বিভিন্ন উৎসব পার্বনে বাবা, দাদুরা সেই গানগুলো করতো কিন্ত আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমরা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি আমাদের এই ঐতিহ্যবাহী উভাগীত।

কথা হয় উভাগীত শিল্পী কাপ্তাইয়ের দেবতাছড়ি মহাজন পাড়ার প্রভাত তংচঙ্গ্যা ও দেবতাছড়ি কড়ইতলি মইনপাড়ার কিনাংগো তংচঙ্গ্যার সাথে। তাঁরা জানান, আমরা আমাদের যৌবন কাল হতে পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে এই গান করেছি। প্রচুর দর্শক রাতভর উপভোগ করতো এই গান। এখনতো বয়স ৫০ পার করে ফেলেছি। আর এখন তেমন এই উভাগীতের কদর নেই। এই প্রজন্মের তংচঙ্গ্যা ছেলে মেয়েদের এই গানের প্রতি তেমন আর্কষণ নেই।

বাংলাদেশ বেতার রাঙামাটি কেন্দ্রের তংচঙ্গ্যা গানের শিল্পী সুরকার ও গীতিকার শিক্ষক সূর্যসেন তংচঙ্গ্যা ও রাঙামাটি বেতারে শিল্পী সুমনা তংচঙ্গ্যা জানান,উভাগীত সাধারণত দ্বৈত সংগীত। অনেকটা পালাগানের মতো। এক্ষেত্রে একজন গীতের মাধ্যমে প্রস্তাব পেশ করেন এবং অপরজন গীতের মাধ্যমে সেই প্রস্তাবের প্রত্যুত্তর দিয়ে থাকেন। সাধারণত প্রেম প্রস্তাব বা প্রত্যাখ্যান বা মনের খেদ উভাগীতের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে থাকে। তবে একজন ব্যক্তি দ্বারাও উভাগীত গাওয়া হয়।

তাঁরা আরোও জানান, উভাগীত গাওয়ার জন্য সময়ের কোন বাধ্যবাধকতা নেই। এটি যেকোনো সময় গাওয়া যায়। শোনা যায়, অতীতে যুবক-যুবতীদের উপস্থিত বুদ্ধি, তাঁদের জ্ঞানের গভীরতা, দক্ষতা পরিমাপ করতে বিভিন্ন পূজা-পার্বনে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে উভাগীতের প্রতিযোগিতা করতেন।

কাপ্তাইয়ের রেশম বাগান এলাকার বাসিন্দা জনপ্রিয় তংচঙ্গ্যা গানের গীতিকার, গবেষক আদি চন্দ্র তংচঙ্গ্যা (বর্তমান নাম- মৈত্রী জ্যোতি ভিক্ষু) এবং কাপ্তাইয়ের ওয়াগ্গা ইউনিয়ন এর বিভিন্ন তংচঙ্গ্যা পাড়া এবং চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নের রেশম বাগান তংচঙ্গ্যা পাড়ার প্রবীন ব্যাক্তিদের সাথে কথা বললে তাঁরা জানান, বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা উভাগীতের নাম শুনলেও গাইতে জানে না। সেটা কীভাবে গাইতে হয়, তাও জানে না। কেন গাইতে হয়, তাও জানে না।

এর কারণ কী জানতে চাইলে তাঁরা জানান, আধুনিক তংচঙ্গ্যা গানের আবির্ভাব, উভাগীতের প্রতি তাচ্ছিল্য, উভাগীত মনের কথা প্রকাশক হওয়ায় বর্তমান প্রজন্ম তা গাইতে লজ্জাবোধ করা, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে আগের মতো আর উভাগীতের প্রতিযোগিতা হয় না। যার ফলে এই গীত আমরা হারাতে বসেছি। তবে আমরা চাই এই গীত আবার ফিরে আসুক এবং রাঙামাটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট এইসব গান সংরক্ষণ করুক।

উভাগীতের কোন অডিও বা ভিডিও সংরক্ষণ আছে কিনা এই বিষয়ে আজ শুক্রবার জানতে চাওয়া হলে, রাঙামাটি ক্ষুদ্র নৃ- গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক রুনেল চাকমা জানান, শুধুমাত্র তংচঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের উভাগীত নয় এই অঞ্চলে বসবাসরত অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী গীত গুলো আমরা অডিও এবং ভিডিও করে তা সংরক্ষণ করবো।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।