হিমাগার সংকটে পাহাড়ের কৃষি, ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত কৃষক

পাহাড়ি অঞ্চলের কৃষি আজ এক দ্বিমুখী বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে উৎপাদন বাড়ছে, কৃষক বাণিজ্যিক চাষে আগ্রহী হচ্ছে; অন্যদিকে সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার ঘাটতিতে সেই উৎপাদনই কৃষকের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় পাহাড়ে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা যাচ্ছে না এটি এখন আর অভিযোগ নয়, এটি একটি কাঠামোগত সংকট।

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলাজুড়ে চলতি মৌসুমে আলু, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, বেগুন, মরিচ, শিম, করলা ও নানা ধরনের মৌসুমি সবজির উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, পাহাড়ি উর্বর জমি ও কৃষকদের পরিশ্রমে ক্ষেতজুড়ে সবুজের সমারোহ দেখা যাচ্ছে। তবে উৎপাদন বাড়লেও বিপণন ব্যবস্থার দুর্বলতায় কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকেরা। অধিকাংশ সবজি একই সময়ে পরিপক্ব হওয়ায় কৃষকেরা একযোগে বাজারে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে সরবরাহ বেড়ে গিয়ে হঠাৎ করেই দাম পড়ে যাচ্ছে, যা কৃষকের উৎপাদন খরচও তুলতে দিচ্ছে না।

স্থানীয়ভাবে হিমাগার বা কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থা থাকলে কৃষকেরা সবজি সংরক্ষণ করে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ধাপে ধাপে বিক্রি করতে পারতেন। এতে একদিকে বাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতো না, অন্যদিকে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হয়ে কৃষক উপকৃত হতেন। একই সঙ্গে লাভের আশায় কৃষকেরা ভবিষ্যতে আরও উৎসাহ নিয়ে চাষাবাদে এগিয়ে আসতেন। কৃষি উৎপাদনের এই সম্ভাবনাময় অঞ্চলে হিমাগার স্থাপন তাই শুধু কৃষকের স্বার্থেই নয়, বরং টেকসই কৃষি বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যও সময়ের দাবি এটি।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে পাহাড়ে সবজি আবাদ ২০–৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ একই সময়ে সংরক্ষণ অবকাঠামোতে যুক্ত হয়নি একটি কার্যকর হিমাগার।

কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মাটিরাঙ্গা উপজেলায় সবজি চাষের জমির আবাদ ছিল ৫৯০ হেক্টর। এ সময় সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১১,০৬৩.৫ মেট্রিক টন।
পরবর্তী ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সবজি চাষের জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৬১০ হেক্টর। এতে সম্ভাব্য উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১,৪৩৮.৫ মেট্রিক টন।

এছাড়া ২০২৩–২৪ অর্থবছরে মাটিরাঙ্গা উপজেলায় ১৪০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ করা হয়। সে সময় আলুর লক্ষ্যমাত্রা উৎপাদন ছিল ১২.০৫ মেট্রিক টন। পরবর্তী ২০২৪–২৫ অর্থবছরে একই পরিমাণ জমিতে (১৪০ হেক্টর) আলু চাষ বজায় থাকলেও লক্ষ্যমাত্রা উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১৩ মেট্রিক টন। তবে আলুর বাজারদর কমে যাওয়া এবং এলাকায় হিমাগার না থাকায় কৃষকদের আগ্রহে ভাটা পড়ে। এর ফলে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে উপজেলায় আলুর চাষ কমে গিয়ে মাত্র ৭৮ হেক্টর জমিতে নেমে আসে।

কৃষি বিভাগের হিসাব বলছে, দেশে উৎপাদিত মোট সবজির প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সংগ্রহ-পরবর্তী পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায়। পাহাড়ি এলাকায় এই ক্ষতির হার আরও বেশি। এর মূল কারণ হলো সংরক্ষণ সুবিধার অভাব এবং বাজারে একসঙ্গে অতিরিক্ত পণ্য সরবরাহ।

এই বাস্তবতায় কৃষক উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন। এক বিঘা জমিতে সবজি চাষে যেখানে গড়ে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়, সেখানে মৌসুমের ভরা বাজারে সেই সবজি বিক্রি করতে হচ্ছে উৎপাদন খরচের নিচে। ফলে লাভ তো দূরের কথা, অনেক কৃষক ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো পাহাড়ি অঞ্চলের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা। দুর্গম সড়ক, পরিবহন সংকট ও বাড়তি খরচের কারণে চট্টগ্রাম বা ঢাকার পাইকারি বাজারে সময়মতো পণ্য পৌঁছানো কঠিন। ফলে স্থানীয় আড়তদার ও মধ্যস্বত্বভোগীরাই হয়ে উঠছেন বাজারের নিয়ন্ত্রক। সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় কৃষক বাধ্য হচ্ছেন তাদের শর্তে পণ্য বিক্রি করতে।

এখানেই হিমাগারের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। মাটিরাঙ্গায় কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা থাকলে কৃষিপণ্যের সংরক্ষণকাল ২ থেকে ৪ গুণ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। এতে বাজারে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, দাম স্থিতিশীল থাকে এবং কৃষক ন্যায্যমূল্য পান।

NewsDetails_03

কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধু মাটিরাঙ্গা নয় পাহাড়ি তিন জেলায় সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে কার্যকর কোনো বহুমুখী কোল্ড স্টোরেজ গড়ে ওঠেনি। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিষয়টি আলোচনায় এলেও বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

খবর নিয়ে জানা গেছে, জেলার রামগড় উপজেলায় কৃষি বিপণন কার্যালয় থাকলেও কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কৃষকদের বিপণনসংক্রান্ত তথ্য ও সহায়তা প্রদান এবং বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন ও তদারকিতে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য রামগড় উপজেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

এখন প্রশ্ন হলো, পাহাড়ের কৃষি সম্ভাবনাকে কি অবহেলায় নষ্ট হতে দেওয়া হবে? যেখানে হিমাগান স্থাপন করলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে, কৃষকের আয় বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং পাহাড়ের অর্থনীতি শক্ত ভিত পাবে। সেখানে সিদ্ধান্তহীনতা কতটা যুক্তিযুক্ত?

পাহাড়ে হিমাগার না থাকাটা শুধু একটি অবকাঠামোগত ঘাটতি নয় এটি কৃষকের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এখন প্রশ্ন একটাই এই সংকট নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া হবে কবে?

মাটিরাঙ্গার কৃষক মো. আব্দুল হাই বলেন, আমরা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলাই। কিন্তু সেই ফসল রাখার জায়গা না থাকায় যখন রাস্তায় ফেলে দিতে হয়, কিংবা চোখের সামনে পঁচে যেতে দেখি এবং কম দামে বিক্রি করতে বাদ্য হই।

তখন বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে, কলিজা যেন ফেটে যায়। সরকার যদি আমাদের জন্য হিমাগারের ব্যবস্থা করত, তাহলে এত কষ্ট করে ফলানো ফসল নিয়ে আর আমাদের পথে বসতে হতো না। কিছুদিন রেখে ভালো দামে বিক্রি করতে পারতাম।”

কৃষকদের অভিযোগ, পাহাড়ি অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে বাইরের বাজারে সময়মতো পণ্য পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দ্রুত বিক্রি না হলে মাঠ কিংবা ঘরেই নষ্ট হয়ে যায় কৃষিপণ্য। এতে একদিকে যেমন আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষিকাজে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেক কৃষক।

স্থানীয় কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়ে হিমাগার স্থাপন করা গেলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে, বাজারে স্থিতিশীলতা আসবে এবং কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুম বলেন, ‘এখানে হিমাগারের ব্যবস্থা থাকলে হয়তো কৃষক এই পচা নষ্ট হওয়া থেকে ২৫ শতাংশ যে সংগ্রহত্তর ক্ষতি হয়। এই ক্ষতি তারা লাঘব করতে পারতো যদি কোল্ড স্টোরেজ থাকতো।’

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, পাহাড়ি এলাকায় কৃষি উৎপাদন দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু সংরক্ষণ অবকাঠামো না থাকায় কৃষকরা প্রত্যাশিত সুবিধা পাচ্ছেন না। বিষয়টি অতি জনগুরুত্বপূর্ণ মনে করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বার বার জানানো হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, পাহাড়ি অঞ্চলের কৃষি সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দ্রুত হিমাগার স্থাপনসহ আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। তা না হলে কৃষক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি দেশের কৃষি অর্থনীতিও পিছিয়ে পড়বে।

আরও পড়ুন