৩৭ বছরে সুন্দরবন হারিয়েছে ১৪৪ বর্গকিলোমিটার!

sundorbon লবণাক্ততা, ভাঙন ও ভূমিদস্যুর ছোবলে পড়ে গত ৩৭ বছরে সুন্দরবনের ১৪৪ বর্গকিলোমিটার হারিয়ে গেছে। আর সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত শিল্পকারখানায় আরও কত এলাকা উজাড় হয়েছে, সে হিসাব এখনও পাওয়া যায়নি। দেশের পরিবেশ গবেষকরা বলছেন, জাতিসংঘের রামসার কনভেনশন অনুযায়ী সুন্দরবন আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি জলাভূমি। ওই কনভেনশনে বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে স্বাক্ষর করে। এর ফলে শর্ত অনুযায়ী সুন্দরবনের ক্ষতি হতে পারে, এমন কোনও তৎপরতা বাংলাদেশ চালাতে পারে না।
বাংলাদেশ স্পেস রিসার্চ অ্যান্ড রিমোট সেনসিং অর্গানাইজেশন (স্পারসো)-এর ‘টাইম সিরিজ অ্যানালাইসিস অব কোস্টাল ইরোশন ইন দ্য সুন্দরবনস ম্যানগ্রোভ’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হচ্ছে, ম্যানগ্রোভের চিরায়ত রীতি অনুযায়ী নতুন করে বন গড়ে উঠেছে যতটুকু, তার চেয়ে ভেঙেছে বেশি। এ সময়ে নতুনভাবে বন জেগেছে মাত্র ১০৪ বর্গকিলোমিটার, আর ভাঙনের কারণে হারিয়েছে ২৩৩ বর্গকিলোমিটার। আবার ভাঙার হার পূর্ব দিকের চেয়ে পশ্চিম দিকে বেশি। শুধু ভাঙনের কারণেই প্রতিবছর ৬ বর্গকিলোমিটার করে ধ্বংস হচ্ছে সুন্দরবন। ১৯৭৩ সালের পর মাত্র ৩৭ বছরে সুন্দরবনের আয়তন কমেছে ১৪৪ বর্গকিলোমিটার।
গবেষকদের ধারণা, উজানের নদীগুলোর ক্ষীণ প্রবাহ ও সমুদ্র স্রোতের মধ্যে ভারসাম্যহীনতার কারণে ভাঙা-গড়ার ব্যবধান বাড়ছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনেরও প্রভাব আছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভাঙা-গড়ার এই প্রবণতা স্থায়ী হলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এ ম্যানগ্রোভ বনটির বাংলাদেশ অংশ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাবে।
স্পারসোর ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৭০ থেকে ১৯৯০ সালের তুলনায় ১৯৯০ থেকে ২০১০ সালে বন কমেছে সবচেয়ে বেশি। স্বাভাবিক ম্যানগ্রোভ বনের নিয়মে স্বাধীনতা-পরবর্তীকাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সুন্দরবন বেড়েছে ২৯ বর্গকিলোমিটার হারে। আবার একই সময়ে হারিয়েছে ৩২ বর্গকিলোমিটার। অন্যদিকে ১৯৯০ থেকে ২০১০ সময়কালে বনের আয়তন বেড়েছে বছরে মাত্র ৬ বর্গকিলোমিটার হারে। এ সময়ে মানচিত্র থেকে হারিয়েছে ৪২ বর্গকিলোমিটার।
উল্লেখ্য, সুন্দরবন সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমি। যা বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বিস্তৃত। ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার রয়েছে বাংলাদেশে। সুন্দরবন ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
ভাঙাগড়ার মধ্যে আয়তনে ছোট হয়ে আসার পাশাপাশি সুন্দরবনের আশেপাশে নানা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ভূমি অধিগ্রহণ ও মানুষের অবাধ বিচরণের কারণে বনটি তার বৈশিষ্ট্য হারানোর শঙ্কায় পড়েছে। বনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করা হলেও পরিবেশ অধিদফতর এই এলাকাতেই ১৫০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পকে অবস্থানগত ছাড়পত্র দিয়েছে। ইতোমধ্যে আয়তন কমার পাশাপাশি কমেছে গাছ ও প্রাণি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের গবেষণা মতে, ১৯৫৯ সালে এই বনে প্রতি হেক্টরে সুন্দরী গাছের সংখ্যা ছিল ২১১টি। কিন্তু ১৯৮৩ সালে ১২৫ ও ১৯৯৬ সালে ১০৬ এ নামে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০২০ সালের হেক্টর প্রতি গাছের সংখ্যা নেমে আসবে ৮০টিতে।
মূলত পানি ও মাটিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার কারণেই, সুন্দরবনে গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে। সেই পানিতে যদি কয়লা যুক্ত হয় এবং বাতাসে সালফার ডাই অক্সাইড যু্ক্ত হয়, তাহলে কী ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক মোহম্মদ ফিরোজ জামান বলেন, ‘আমাদের সামনে আর কোনও পথ নেই। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখ থেকে বাঁচাতে হলে বনকে বনের মতো থাকতে দিতে হবে।’
এ প্রসঙ্গে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন বলেন, ‘সুন্দরবনের কোলঘেঁষে কোনও ধরনের শিল্পকারখানা স্থাপন করলে, এর বর্জ্য, ধোঁয়া যে বনের ভয়াবহ ক্ষতি করবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।কারণ সুন্দরবনের ইকো সিস্টেম একদমই অনন্য।’ খবর-বাংলাট্রিবিউন।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।