কাপ্তাই হ্রদের ৬ রুটে নৌ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ : ড্রেজিং নিয়ে শুধু কথা হয়, কাজ হয় না

শুকিয়ে গেছে কাপ্তাই হ্রদের পানি
রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের বয়স হতে চলেছে প্রায় ৫৯ বছর। বয়সের ভারে নাব্য সংকটে পড়ে কাপ্তাই হ্রদের ড্রেজিং করা নিয়ে শুধু কথা হয়েছে, কাজ শুরু করা যায়নি আজ পর্যন্ত। এই ৫৯ বছরে কাপ্তাই হ্রদের তলদেশ ভরাট হতে হতে প্রতিবছরই পুরনো চরগুলোর সাথে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন চর। ফলে, শুকনো মৌসুমে ৬টি নৌরুট সম্পুর্ণরুপে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ৬টি উপজেলার ৪ লাখ বাসিন্দার দুর্ভোগ- দুর্দশা চরমে অবস্থান করে।
১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ প্রদানের ফলে কর্ণফুলি নদীর মূল মোহনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সৃষ্টি হওয়া এই হ্রদের আয়তনও বিশাল। একে ভরাটের হাত থেকে রক্ষা করতে না পারলে এখানকার মানুষের অর্থনীতি,যোগাযোগ, পর্যটন শিল্প মুখ থুবড়ে পড়বে। প্রায় ৭২৫ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট এই হ্রদে রয়েছে বিপুল প্রজাতির মৎস সম্পদ। প্রতিবছর কয়েক কোটি টাকার মৎস্য সম্পদ আহরণ ও বাজারজাতকরণ করা হয় এই হ্রদ থেকে।
প্রায় ১০ হাজার মৎসজীবি মানুষের জীবিকা নির্বাহ করে থাকে এই হ্রদ। কাপ্তাই হ্রদ ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে বহু প্রজাতির মাছও বিলুপ্তির পথে। মাত্র বছর ৭/৮ পূর্বে হ্রদে বিখ্যাত কাতলা, কই, কালা বাউশ, সরপুটি, মাগুর, পাবদা, বোয়াল, চিতল ও মহাশোল সহ বড় দামী মাছগুলো এখন আর পাওয়া যায় না। ৫৯ বছর পূর্বে কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট বাংলাদেশের একমাত্র বৃহত্তম কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদ প্রয়োজনীয় ড্রেজিং ও সংস্কারের অভাবে ক্রমান্বয়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ফলে কাপ্তাই হ্রদটি পার্বত্য মানুষের জন্য অভিশাপ হলেও এদেশের সোনালী দিগন্তের সূচনা করেছিল।
১৯৬০ সালে কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দিয়ে কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করা হয়। মূলতঃ বিদ্যুৎ উৎপাদন, বন্যা নিয়ন্ত্রন, মৎস্য উৎপাদন, পর্যটন, জলপথ, যাতায়াত ও বনজ সম্পদ আহরণের জন্য কাপ্তাই বাঁধটি নির্মাণ করা হলেও গত ৫৯ বছরে একবারের জন্য এর সংস্কার বা ড্রেজিং না হওয়ায় এটি এখন ভরাট হয়ে যাওয়ার পথে। বছরের পর বছর ধরে পলি জমে লেকের তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ার ফলে হ্রদে পানি ধারণ ক্ষমতাও অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় অনাবৃষ্টির কারণে কাপ্তাই হ্রদের বাঘাইছড়ি, লংগদু, কাট্টলী, বরকল কাপ্তাই, রাঙ্গামাটি সদরসহ বিভিন্ন স্থানে জেগে উঠেছে চর।
এ প্রসঙ্গে উদীচী রাঙ্গামাটি জেলা সংসদের সভাপতি ও বিশিষ্ট সমাজকর্মী অমলেন্দু হাওলাদার বলেন, কাপ্তাই হ্রদ ড্রেজিং না হওয়ার ফলে প্রতিনিয়িত এখানকার মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। তিনি বলেন,প্রতিনিয়ত শহরের বর্জ্যগুলো হ্রদের পানিতে ফেলার কারনে হ্রদ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় ড্রেজিং এর প্রয়োজনীয়তার কথা আলোচনা হয়েছে বিভিন্ন ফোরামে। এখানকার অসেচতন মানুষের কারনে দুষিতও হয়ে পড়ছে এই বিশাল লেক। তাই যত দ্রুত সম্ভব এই হ্রদকে ড্রেজিং এর ব্যবস্থা করা ।
একই প্রসঙ্গে কাপ্তাই হ্রদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য মনিরুজ্জামান মহসিন রানা বলেন, কাপ্তাই হ্রদ ড্রেজিং না হওয়ার ফলে হ্রদের নাব্যতা হারাচ্ছে। এর পাশাপাশি হ্রদ তীরবর্তী যেসব ঘরবাড়ি আছে এবং শহরের বর্জ্যগুলো ফেলা হচ্ছে কাপ্তাই হ্রদে। এর কারনে কাপ্তাই হ্রদের পানিও দূষিত হচ্ছে। তিনি বলেন, কাপ্তাই হ্রদ ব্যবস্থাপনা কমিটির শেষ সভা হয়েছে প্রায় এক বছর হবে তাই এ হ্রদকে বাঁচাতে হলে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া এবং প্রতিনিয়ত কাপ্তাই হ্রদ ব্যবস্থাপনা কমিটির মিটিংও হওয়া প্রযোজন।
এছাড়া পার্বত্য এ জেলার ১০ টি উপজেলার মধ্যে ৬টি উপজেলার সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হলো এই হ্রদ। শুকনো মৌসুমে হ্রদের পানি কমে গেলে দুর্গম পাবত্য এলাকায় অবস্থিত উপজেলায় বসবাসরত হাজার হাজার মানুষের জীবনে নেমে আসে অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্ট। দুর্বিষহ হয়ে পড়ে জীবন যাপন এবং স্থবির হয়ে পড়ে উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম। অমানবিক পরিস্থিতির সাথে যুদ্ধ করে এই ক’মাস টিকে থাকতে হয় এই সব উপজেলায় বসবাসকারী জলসাধারনকে। শুকনো মৌসুমেই নয় অন্যান্য মৌসুমেও হ্রদের বুকে ভেসে উঠা পাহাড়ী টিলা আর চরগুলোর কারণে বিঘœ হচ্ছে লঞ্চ চলাচল। এর ফলে দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে যাত্রী,লঞ্চমালিক ,চালক সবাইকে। ভেসে উঠা চর এবং টিলায় আটকে যায় লঞ্চ,বাড়ে দূর্ঘটনা। কারণ এই অঞ্চলে লঞ্চ বা নৌযান দৃর্ঘটনার কবলে পড়লে উদ্ধারের কোন ব্যবস্থাই নেই। তাছাড়া অনেক দুর্গম পথ হওয়ায় ঠিকমতো খবর পাওয়া ও মুশকিল। অথচ নির্মম বাস্তবতা হলো হ্রদ সৃষ্টির ৫৯ বছরেও এই হ্রদে কোন প্রকার ড্রেজিং করা হয়নি,নেয়া হয়নি কোন উদ্যোগও।
অপরদিকে, বাংলাদেশ আভ্যন্তরীন নৌ-চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থা রাঙামাটি জোন এর চেয়ারম্যান মঈনউদ্দিন সেলিম বলেন, কাপ্তাই হ্রদের পানি শুকিয়ে যাওয়ার ফলে ২২ এপ্রিল থেকে জেলার ৬ টি উপজেলায় লঞ্চ চলাচল সম্পূর্নরুপে বন্ধ হয়ে গেছে।আমরা বর্তমানে লঞ্চ ব্যবসার সাথে যারা জড়িত সকলেই বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে দিনযাপন করছি।
এ প্রসঙ্গে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ বলেন, কাপ্তাই হ্রদের নৌ-যান চলাচলকে স্বাভাবিক রাখার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড কাপ্তাই হ্রদ ড্রেজিং এর বিষয়ে বিআইডাব্লিউটিকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারা সম্প্রতি কাপ্তাই হ্রদের বিভিন্ন এলাকায় সার্ভে করেছে। এরপর ড্রেজিং প্রক্রিয়া শুরু হবে।
এদিকে, লংগদু,বাঘাইছড়ি,বরকল ,জুড়াছড়ি,নানিয়ারচর,বিলাইছড়ি উপজেলায় বসবাসরত হাজার হাজার মানুষের দুর্ভোগ আর হতাশা বাড়ছেই। ড্রেজিংএর প্রয়োজনীয়তা যে অপরিসীম তা কেবল এ অঞ্চলে বসবাসকারী সাধারণ মানুষই জানে।

আরও পড়ুন
Loading...