গণমাধ্যম বর্জনের সংস্কৃতি : একটি পাঠ প্রতিক্রিয়া

চলতি সপ্তাহে দেশে কয়েকটি বেসরকারি সম্প্রচার মাধ্যমে ইতোপূর্বে প্রচারিত কিছু প্রতিবেদন নিয়ে দেশের পরিচিত ধর্মীয় বক্তারা বিরুপ অবস্থানের জানান দিয়েছেন। তাঁরা সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ উত্থাপনের সাথে সেসব টিভিকে বর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়াও অন্যান্য মাধ্যমে। এতে গণমাধ্যম জগতে এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। গণমাধ্যম সমাজের কর্তাব্যক্তিরা অভিযোগের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে জানান দিলেও বর্জনের সপক্ষে প্রচারণা থেমে নেই। বরং বর্জনপক্ষ সংঘবদ্ধ শক্তিতে আরো সুসংগঠিত উপায়ে দেশ-বিদেশের বাংলাভাষী দর্শক শ্রোতাদের দৃষ্টি কামনায় নিরন্তর সচেষ্ট রয়েছেন। দেশের সাধারণ পাঠক-দর্শক-শ্রোতারা দুই পক্ষের অনাকাঙ্খিত বাদ-বিবাদে নিজেদের নিরাপদ দূরত্বে রাখাটাই স্বাভাবিক। কারণ, ভোক্তা হিশেবে খবরের দর্শক-শ্রোতাদের কাছে অন্যসব বিনোদন কনটেন্ট’র মতো সামাজিক মাধ্যমে চলমান এই বাগবিতন্ডা নিরেট একটি কর্পোরেট মিডিয়ার নিজস্ব বিষয় বলে মেনে নিচ্ছেন।

একজন সাধারণ গণমাধ্যমকর্মী হিশেবে আমার কাছে বিষয়টি মোটেই সাদামাটা কোন বিরোধ নয়। বরং এটি একটি সংবেদনশীল, গুরুত্ববহ এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনার বিষয়। দেশে এ ধরনের পরিস্থিতি এটিই একমাত্র এবং নতুন নয়। জনপ্রিয় বাংলা দৈনিক ‘প্রথম আলো’ তাঁর জন্মলগ্ন থেকেই নানামুখী বৈরীতা মোকাবেলা করে আসছে। কখনো ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, কখনো ধর্মীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠি, কখনো সরকারিদল হিশেবে ‘বিএনপি-আওয়ামীলীগ’ আবার কখনো অন্যান্যরা। শুধু ‘প্রথম আলো’ নয়; ইংরেজি দৈনিক ‘নিউ এইজ’ বাংলা দৈনিক ‘সমকাল’ও ‘ওয়ান-ইলেভেন’ সরকারের সময়ে হেনস্থার মুখোমুখি হয়েছে। এখনো ‘বিডিনিউজসহ অনেক ছোটবড়ো গণমাধ্যম নানা রকমের চাপ সামলে পথ পাড়ি দিচ্ছে। ধর্মপ্রধান রাজনীতিপ্রবণ দেশ হিশেবে একটি গণমাধ্যমের সামনে যখন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরাই প্রধানতম প্রতিপক্ষ হিশেবে আত্মপ্রকাশ করেন; তখন সত্যিই পরিস্থিতি অনেক নাজুক হয়ে উঠে। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা সাক্ষ্য দেয়, ‘রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ গণমাধ্যম’-এর পাশে কেউ না থাকার। শুধু তাই নয়, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও মেলে না। হয় আত্মসর্মপন নয়তো স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে চলে যাওয়া। এই পন্থায় একটি স্বাধীন দেশে ‘ইনসাফ’ হতে পারেনা। প্রচলিত আইন-আদালতের চৌহদ্দিকে আমলে না নিয়ে সাময়িক জনপ্রিয়তাবাদের কাছে মাথানত অথবা সংখ্যাগরিষ্ট জনগোষ্ঠির কন্ঠকেই জিতিয়ে দেয়ার মানসিকতা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। এর ফলে সত্য-অসত্য উদঘাটনের পথ যেমন রুদ্ধ হয় তেমনি সমাজেও এক ধরনের অন্ধত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পথ অবারিত করে।

ঘটনার সূচনা হয়েছে ঢাকসু’র সদ্য সাবেক ভিপি নুরুল হক নূরের সাথে একাত্তর টিভি’র সংলাপে যাওয়া না যাওয়ার বিরোধ থেকে। তাঁকে জড়িয়ে দায়েরকৃত একটি ধর্ষণচেষ্টার এজাহারের সূত্র ধরে একাত্তর টিভি নূরকে একটি সরাসরি সংলাপে যুক্ত হবার আহ্বান জানানো হয়। সেই সংলাপ আলোর মুখ না দেখলেও চাউর হয়েছে, ‘একাত্তর’ বনাম ‘ব্যক্তি নূর’-এর বাহাস। সেই লড়াইয়ের এক পর্যায়ে আলোচিত ছাত্রনেতা নুরুল হক নূর সামাজিক মাধ্যমে একাত্তর টিভিকে বর্জনের প্রথম আহ্বান জানান। প্রথমদিকে বিষয়টি ছোট পরিসরে থাকলেও শেষতক সেই বিরোধের ‘আগুনে ঘি ঢালা’র মতো হয়ে দৃশ্যপটে চলে আসেন সাম্প্রতিক আলোচিত অনেক ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা। এই টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচারিত সংলাপ অনুষ্ঠানে এর আগে অতিথিদের সাথে টিভি উপস্থাপক বা উপস্থাপিকার পুরনো তর্কাতর্কি বা মতানৈক্যকে পুঁজি করে নামে-বেনামে জড়িয়ে পড়েন অন্যরাও।

ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা ‘একাত্তর টিভি’র বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য এবং সাংবাদিকতার নীতি নৈতিকতা নিয়েও। দেশের অচেতন-সচেতন সব মানুষই তথ্য প্রযুক্তির বদৌলতে ‘একাত্তর টিভি’সহ অন্যান্য গণমাধ্যম ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সম্পৃক্ত করে কী ধরনের সংবাদ প্রতিবেদন প্রচার করেছে; সেটি এখনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরছে। পরিবেশিত সংবাদভাষ্যে যেসব ধর্মীয় সমাবেশের উদ্ধৃতি খন্ডিতভাবে যুক্ত করা হয়েছে, সেসব সমাবেশে তিনি বা তাঁদের দেয়া পুরো বক্তব্যও ফেইসবুক, টুইটার, ইউটিউব-এর মাধ্যমে সহজেই সংগ্রহযোগ্য। যেকোন গণমাধ্যম-এর পরিচালন নীতি বা কৌশল নিয়ে যেকারো আপত্তি থাকতেই পারে। তেমনিভাবে ‘একাত্তর টিভি’র পরিবেশিত আলোচিত খবরগুলোর পেছনে তাঁদের মনোজাগতিক অবস্থান কী ছিল সেটিও অজানা থাকতে পারে। মানুষ মাত্রেই ভুল করা এবং সংশোধন হওয়া স্বাভাবিক। মহাজ্ঞানী মানুষও বিভ্রান্ত হতে পারেন। তবে মানুষের ধর্মীয় ভাবাবেগে ঘাত-প্রতিঘাত সৃষ্টি করে, এমন তৎপরতা ব্যক্তিগতভাবে আমার অপছন্দ। দেশের ধর্মপ্রাণ প্রায় সব মানুষই ধর্ম নিয়ে বিরোধকে গ্রহণ করতে চান না। অনেক সময় সজ্ঞানে বিদগ্ধ ব্যক্তিত্বরাও ধর্মীয় বিরোধপূর্ন আলোচনাকে এড়িয়ে চলেন।

একজ ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের সব ভাষণই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য বা সর্বজনগ্রাহ্য হবে, এমন মনে করার কোনই যৌক্তিক সুযোগ নেই। ‘একাত্তর টিভি’ এবং অন্যান্য গণমাধ্যম সারাদিনে এবং বছরজুড়ে যেসব সংবাদ পরিবেশন করে তার বেশিরভাগই জনগুরুত্বপূর্ন। অনেক গণমাধ্যম প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার ছাড়াও বছরের অনেকদিন মূল্যবান চিন্তা ও জ্ঞানঋৃদ্ধ ধর্মীয় আলোচনা উপস্থাপন করেন। সেখানে অনেক ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব সরাসরি টেলিফোনে দর্শক-শ্রোতাদের অনেক কঠিন প্রশ্নের সহজ উত্তর প্রদান করেন। যেকোন গণমাধ্যমের পরিবেশনায় একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব আহত বা অসম্মান বোধ করলে তিনি প্রতিবাদ প্রেরণের পাশাপাশি সংক্ষুব্ধ হলে আইনেরও আশ্রয় নিতে পারেন। তাই বলে এসব অজুহাতে কোনো গণমাধ্যম রাজনৈতিকভাবে চরম পক্ষপাতদুষ্ট বা সংবাদ নিরপেক্ষতার অবস্থানকে পেছনে ফেলে ক্ষমতার লেজুড় হয়ে উঠুক; সেটি এদেশের সাধারণ মানুষ অতীতেও মেনে নেয়নি। ভবিষ্যতেও নেবে না। এর ফলে একটি গণমাধ্যমের সপক্ষের জনমত এবং গণভাবজগত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এ ধরনের বৈরি পরিবেশ মোকাবেলা করে টিকে থাকা গণমাধ্যম হিশেবে ‘প্রথম আলো’ ‘সমকাল’ ‘দি ডেইলি স্টার’ এবং সর্বশেষ ‘বিডিনিউজ’ আমাদের সামনে বড়ো উদাহরণ।

আমি ব্যক্তিগতভাবে ‘একাত্তর টিভি’র সংবাদ এবং সংলাপ প্রায়ই দেখার চেষ্টা করি। এই সময়ে যেকটি প্রতিবেদন নিয়ে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের বড়ো রকমের আপত্তি রয়েছে, সেসব বিষয় নিয়ে দ্বিপাক্ষিক অথবা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে খোলামেলা আলোচনার সুযোগ রয়েছে। পরমত সহিষ্ণুতার পথ ছেড়ে জেদাজেদি কোনপক্ষের জন্যই শুভফল বয়ে আনতে পারেনা। গণমাধ্যমকর্মীদের যদি সমাজের শ্রদ্ধার পাত্র ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা পরিহার করেন বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বর্জনের পথে চলা সামাজিকভাবে অপ্রীতিকর। পৃথিবীর প্রত্যেকটি ধর্মেই ভুল শোধরানোর লক্ষে আলোচনার সপক্ষে যুক্তিগ্রাহ্য পথ খোলা আছে।

ভুুলে গেলে চলবে না, একটি গণমাধ্যমহীন সমাজ এখন আর ভাবার সুযোগ নেই। যেই বিরোধ দেশের মূলধারার গণমাধ্যমের সাথে চলছে; তার চেয়ে অনেক বেশি স্পর্শকাতর, অবমাননাকর এবং সংবেদনশীল বিষয় আমরা প্রতিদিন প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করছি। দেশের একটি গণমাধ্যমকে চাইলেই যে কোন দল-মত-পথের মানুষ গালমন্দ করতে পারি। কিন্তু ফেইসবুক-ইউটিউব-এ ছড়িয়ে থাকা অগণিত অশ্লীলতার বিরুদ্ধে আমরা জনমত গড়ে তুলতে পারছি না।

দেশে সমাধানযোগ্য বিষয় নিয়ে আমরা সহনশীল আলোচনা করতে পারিনা বলেই পৃথিবীর দেশে দেশে আমাদের দেশ-রাজনীতি এমনকি ধর্মীয় বিরোধ বা মতাদর্শিক সংঘাত নিয়ে বর্হিবিশ্বে অনেক নেতিবাচক আলোচনা ডালপালা ছড়ায়। যে বা যাঁরা মনে করেন, ‘অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ হয়ে যাবে’ সেদিন এখন আর নেই। ক্ষমতা যেমন চিরস্থায়ী নয় তেমনি জ্ঞানের সীমাও দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়। আজকে আমি যা ভাবছি বা অন্যকে ভাবতে-মানতে বাধ্য করছি সামনের দিনে ‘অমাবশ্যা-পূর্ণিমা’ এবং ‘জোয়ার-ভাটা’র মতো সময়ের স্রোতে তাও মিলিয়ে যেতে পারে।

প্রদীপ চৌধুরী: পাহাড়ের সংবাদকর্মী।

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।