বান্দরবানে রুমায় অনাথালয়ের ছাত্রীনিবাসের পাকা ভবন জরুরি

news3উপজেলার একমাত্র অনাথ আশ্রম ‘অগ্রবংশ অনাথালয়ের পর্যাপ্ত সহযোগিতার বরাদ্ধ না াথাকায় ছাত্রাবাসের শিক্ষার্থীদের খাবার সমস্যা প্রকট আকারে ধারণ করছে। জুলাইয়ে দ্বিতীয় সপ্তাহে টানা ক‘দিন ধরে প্রবল বর্ষনের পর থাকা-খাওয়াসহ নানাদিক থেকে অনাথালয়টি আরো সমস্যা বেড়ে যায়। প্রবল বর্ষনে পাহাড় ধসের কারণে ঝুঁকির মধ্যে এই দু‘টি ভবনে রয়েছে শিক্ষার্থীরা। ভবন দু‘টি ধসে পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। এঅবস্থায় ছাত্রাবাসটি এখন নানান সমস্যায় জর্জড়িত।
এপ্রতিবেদক শুক্রবার(১৫জুন) বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখেন অনাথালয়ের বালকদের থাকা ভবনে উপর আড়া-আড়ি করে একটি গাছ পড়ে আছে। ভবন ওয়ালে প্রায় চার ফুট পর্যন্ত মাটি। প্রবল বর্ষনের উত্তর দিক থেকে পাহাড় ধসে ভবনের ওয়ালে এসব মাটি জমেছে। এখান থেকে পানি চুয়ে ভবনে ঢুকছে। একটি কক্ষে ভেতরে ফ্লোর ভিজা। তখনই কক্ষে অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা ফেøার মুছা করছিল। আর পাহাড় থেকে বৃষ্টির ভেজায় মাটি দলা-দলায় ভবনের দিকে সরে আসাটা লক্ষ্য করা গেছে।
অনাথালয়ের মূল বৌদ্ধ বিহারের দক্ষিণ দিকে ছাত্রীদের থাকা ঘর। প্রায় ৪০ফুটের লম্বা। ছাদের ঢেউটিন দিয়ে গাছের খুঁটি বসিয়ে তৈরি করা হয়েছে এ ঘরটি। এটি খাঁড়া পাহাড় সীমানায় তৈরি হয়েছে। নীচে তাকালে যে কারোর চোখ শিউরে উঠবে নি:সন্দেহে। ঠিক সেভাবেই অবস্থা ও অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে রান্না ও স্টাডি ঘর। অনাথালয়টি চারি দিকে ঘুরে দেখতে গেলে, কী দেখলেন এমন প্রশ্ন করে এগিয়ে এলেন এ অনাথালয়ের নির্বাহী পরিচালক ও বিহারের অধ্যক্ষ উঃ নাইন্দিয়া ভিক্ষু। পাহাড় ধসের দিকে হাত দেখিয়ে উঃ নাইন্দিয়া ভিক্ষু এ প্রতিবেদকে জানান ভবনের ওয়ালে যে মাটি জমেছে, এটি পুরোপুরি সরিয়ে ফেলতে অনেক শ্রমের প্রয়োজন। আর শ্রমিক দিয়ে কাজ করাতে গেলেও কমপক্ষে দুই লক্ষ টাকা দরকার। এটাকা পাবো কোথায়? মাটি সরিয়ে দিলে, তাও স্থায়ি সমাধান হবেনা। ভবনের দিকে মাটি ধস বন্ধ করতে হলে রিটার্নিং ওয়াল করা প্রয়োজন। খাঁড়া পাহাড় হওয়ায় স্টাডি হল ও ছাত্রীদের ঘর এই দু‘টি ঘর রক্ষা করতে রিটার্নিং ওয়ালের বিকল্প নেই। অনাথালয়ের বর্তমানে প্রায় ৯০জন শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে উল্লেখ করে নাইন্দিয়া ভিক্ষু বলেন ছেলেদের জন্য এভবনটি পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর ২০১১সালে উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। তবে এখনো ছাত্রীদের জন্য কোনো পাকা ভবন নেই। এনিয়ে ইতোমধ্যে পার্বত্য মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে আবেদন করা হয়েছে। নাইন্দিয়া ভিক্ষু আরো বলেন অনাথালয়ের রাস্তায় একটি ছোট ঝিরি থাকায় আসা-যাওয়ার দর্শনার্থীদের কষ্ট পোহাতে হয়। এঝিরিতে একটি বক্স কালভার্ট করা গেলে বিহার দর্শনার্থীর পাশাপাশি অনাথালয়ের অবস্থানরত শিক্ষার্থীরাও নিয়মিত স্কুল যাওয়া-আসা সুবিধা বৃদ্ধি পাবে।
আশ্রম প্রতিষ্ঠার সম্পর্কে বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ উঃ নাইন্দিয়া বলেন অগ্রবংশ অনাথালয়টি বিগত ২০০৫ সালে প্রয়াত ভিক্ষু ভদন্ত উ: ইন্ডিগ্ ামহাথের ওরফে অগ্রবংশ ভিক্ষু তাঁর নিজের উদ্যোগে এপ্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। তখন তিনি (নাইন্দিয়া) ৯বছরের শিশু শ্রমন হিসেবে ছিলেন এ প্রতিষ্ঠানে। ২০০৬সালে সমাজ সেবা অধিদপ্তরের অধীনে নিবন্ধিত হয়। তারপর থেকে সীমাব্ধতার মধ্যে বিভিন্ন পাড়ার অনাথ ও দরিদ্র ছেলেমেয়েদের এ অনাথালয়ে রেখে পাড়া লেখার সুযোগ দিয়ে আসছে। অনাথালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে উ: নাইন্দিয়া ভিক্ষু বলেন এ আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও বিহারে অধ্যক্ষ ভদন্ত উন্দিগ্ ামহাথেরো এক কঠিন রোগে ২০১০সালে ১১মে মহাপ্রয়ান লাভ করেন। তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হবার পর পরিচালনা কমিটি সদস্যগণ ও বিহারের দায়ক-দায়িকা আমাকে(নাইন্দিয়া) এই অনাথ আশ্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেন। তাই ২০১১সাল থেকে অগ্রবংশ অনাথালয়ের নির্বাহী পরিচালক ও বিহারাধ্যক্ষ হিসেবে দালিত্ব পালন করে আসছেন বলে জানান তিনি।
অনাথালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানায় অগ্রবংশ অনাথালয়ে এক চতুথাংশ মেয়ে শিক্ষার্থী। দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়–য়া ছেলেমেয়ে এখানে থেকে পড়ালেখা করছে তারা। ৯০জনের বেশি। অন্যদের মতো দুর্গম গালেঙ্গ্যা ইউনিয়নের কোনো এক গ্রাম থেকে আনা অনাথ দুই বোন নাইউচিং ও নাই¤্রাচিং মারমা। এই দুইবোন বয়সে যখন দেড় ও তিন বছর তখন মা-বাবা একমাসের ব্যবধানে ডায়রিয়া ও জ্বরে মারা যায়। ওইসময় থেকেই এ অনাথালয়ে জীবন বাঁচা ঠাই মিলে দুইবোনের। এখন বড়বোন সপ্তম ও ছোটবোন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ালেখা করছে। অন্য অনাথের মতো সব খরচ অনাথালয় কর্তপক্ষ দেখভাল করে আসছে।
সপ্তম শ্রেণি পড়–য়া শিক্ষার্থী নাইউচিং জানায় পড়াপলেখা করে শিক্ষিত হয়ে ভবিষ্যতে একজন শিক্ষক হতে চায় সে। ছোটবোন হতে চায় একজন ডাক্তার। একটি অনাথ আশ্রমে থেকেও শিক্ষার্থীদের আশা-আকাঙ্কা অনেক। ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার ও পুলিশ অফিসারের মতো সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন। ভবিষ্যত উজ্জলের আশা-পরিকল্পনা শিক্ষার্থীদের থাকে বটে। তবে ছাত্রাবাসের থাকা নিয়ে তাদের আশংকা নিত্যদিন লেগেই থাকে। নবম শ্রেণি ছাত্রী আনু মারমা ও নবতি ত্রিপুরা তাদের ছাত্রীনিবাসের দিকে হাত দেখিয়ে বলে ঘরটি পুরানো হয়ে গেছে। টিনের ছাদ থেকে বৃষ্টি পড়ে। খুব অসুবিধা বোধ করি। বাঁশ ও গাছের তৈরি এ ঘরটি। তাছাড়া বৃষ্টি পড়লে আমাদের ঘরটি কখন যে, পাহাড় ধসে চলে যায়। মাঝে-মধ্যে খুব ভয় করি। এসব কথা বলার সময় পাশে বিহারের উপাধ্যক্ষ উ: পইনিয়া ভিক্ষুও ছিলেন।
এব্যাপারে বিহারের অধ্যক্ষ উ: নাইন্দিয়া ভিক্ষু বলেন মেয়ে শিক্ষার্থীদের সবদিক দিয়ে নিরাপত্তার বিবেচনায় ছাত্রীদের থাকার জন্য একটি পাকা ভবন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। ছাত্রীনিবাস নির্মাণের জন্য বিভিন্ন অফিসে ঘুরাঘুরি করেছি অনেক। এব্যাপারে শুধু আশ্বাস পেয়েছি, ছাত্রীনিবাসটি করিয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি এখনো। তাছাড়া কোনো সংস্থা থেকে সহযোগিতা বা বরাদ্ধ না পাওয়ায় ছাত্রাবাসের প্রায় ৯০জন শিক্ষার্থীদের দু‘বেলা খাওয়া নিয়েও এখন খুব দুশ্চিন্তায় ভোগছেন বলে জানিয়েছেন নাইন্দিয়া ভিক্ষু। বিষয়টি পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী ও জেলা প্রশাসকের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।