বান্দরবানে হারিয়ে যাওয়ার পথে আদিবাসীদের মাচাং ঘর

বান্দরবান পার্বত্য জেলায় বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্টি সম্প্রদায় যেন নানাভাবেই শিল্পী। তাদের অনেকেই নিজেদের পোশাক নিজেরাই তৈরি করেন। চাষাবাদের ক্ষেত্রেও রয়েছে তাদের ভিন্ন পদ্ধতি। পাহাড়ের ঢালুতে ভিন্ন কায়দায় অন্যদিকে বিশেষ পদ্ধতিতে তাদের তৈরি মাচাং ঘর।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবানে সদর উপজেলা, রুমা, থানছি, লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, রোয়াংছড়িসহ সাতটি উপজেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্টির অনেক পরিবারই তাদের বসবাসের জন্য মাচাং ঘরগুলো তৈরি করে। বিশেষ করে দূর্গম এলাকায় জুম চাষাবাদ এবং বসবাসের জন্য মাচাং ঘরগুলো তৈরি হয়। সাধারণত বাঁশ ,ছন দিয়ে নিপুন ভাবে তৈরী হয় এসব মাচায় ঘর। তবে ঘরের বেশির ভাগ অংশেই বাঁশের ব্যবহার হয়ে থাকে। ছনের মাচাংগুলো দেখতে যেমন চৌকস, তেমনি প্রাকৃতিক শীতাতাপ হওয়ার কারনে এই মাচাং ঘরে বসতে ও ঘুমাতে প্রচন্ড আরামদায়ক।
আরো জানা গেছে,জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং পাহাড় থেকে বাঁশ ও ছন হারিয়ে যাওয়ার ফলে বর্তমানে বান্দরবানের বিভিন্নস্থানে বাঁশের, ছনের তৈরি ঘরের সংখ্যা কমেই যাচ্ছে। জুম পাহাড়ের শীর্ষে কিংবা ছোট বাগান বাড়ীতে একসময় জমির মালিকরা মাচাং ঘর তৈরি করে সেখানে তাদের সময় ব্যয় করতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে চাহিদার মত বাঁশ, গাছ ও ছন না পাওয়ায় এখন পার্বত্য জেলাগুলো মাচাং ঘর হারিয়ে যাওয়ার পথে।
বান্দরবানের পরিবেশবিদ অং চা মং বলেন, পার্বত্য এলাকায় এক সময় মাচাং ঘরের যতেষ্ট কদর ছিল। যেকোন পাহাড়ী বাগানে একটি মাচাং ঘর দেখতে পেতাম, কিন্তুু বর্তমানে কিছু অসাধু বন খেকোদের কারণের পাহাড়ে এখন আর আগের মত ছন, বাঁশ, গাছ পাওয়া যায় না। কারণ বন খেকোরা বড় বড় গাছ কাটার কারণে পরিবেশ একদিকে দূষিত হচ্ছে অপরদিকে প্রয়োজনমত ছন, বাঁশ ও গাছ না পাওয়ার কারনে আদিবাসীদের ঐতিহ্যের মাচাং ঘর তৈরিতে অনেকেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। তিনি আরো বলেন, ঐতিহ্যবাহী মাচাং ঘরকে টিকে রাখতে হলে সরকারী-বেসরকারীভাবে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
পার্বত্য জেলায় বসবাসরত পাহাড়িরা পাহাড় কাটায় অভ্যস্ত ছিলনা। আর এ পাহাড় কাটা রোধ করতেই তারা মাচাং ঘর বেঁধে থাকেন। পাহাড়ের মাটি সাধারণত ঢালু থাকে। মাচাংঘর না বাঁধলে পাহাড়ি ঢালু মাটি সমতল করতে কাটতে হত পাহাড়। এসব কারণেই পাহাড়িরা মাচাংঘরে জীবন ধারণ করে থাকেন। আর এ থেকেই পাহাড়ি সমাজে এটি একটি সংস্কৃতি বহন করে আসছে।
বান্দরবানের বিশিষ্ট চিত্র শিল্পী ও কবি আমিনুর রহমান প্রামানিক বলেন,আদিকাল থেকে পার্বত্য এলাকায় বসবাস করা আদিবাসী সম্প্রদায় মাচাং ঘরে বসবাস করে আসছে,তারা ঘর তৈরির কথা ভাবলেই মাচাং ঘরের কথা বলতো এবং বন জঙ্গল থেকে ভালোমানের বাঁশ ও ছন নিয়ে মাচাং ঘর তৈরি করত কিন্তু এখন মাচাং ঘর হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের কাছ থেকে।
কালক্রমে পার্বত্য জেলায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বন-জঙ্গল উজাড় হয়ে পড়েছে। তাই এখন বন্যপশু বা হিংস্র প্রজাতির জীব-জন্তুসমূহ বিরল হয়ে পড়ছে। ফলে সেই হিংস্র পশুর আশংকাও আর নেই। পাশাপাশি আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন প্রায়ই ঘরে দরজা ব্যবহার চলছে। ফলে এখন মাচাংঘরের ঐতিহ্য ও কদর কম দেখা যায়। কেবল গ্রামাঞ্চলে সংস্কৃতিগত কারণে অথবা বিশেষ বাস্তবতায় এখনও ব্যবহার রয়েছে এ ঐতিহ্যবাহী মাচাংঘরের।
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্টির সাংস্কৃতিক ইনিস্টিটিউটের কনভেনিং কমিটির সদস্য সিং ইয়ং ম্রো জানান,একসময় মাচাং ঘর পাহাড়ের জন্য জনপ্রিয় হলে ও দিন দিন এই ঘর হারিয়ে যাচ্ছে। এখন জনসাধারণ ইট সিমেন্টের দালান তৈরি করতে ব্যস্থ। মূলত বনে বাঁশ,গাছ আর ছন নেই,আর তাই সাধারণ মানুষ মাচাং ঘর তৈরি করতে পারছে না আর আমরা হারিয়ে ফেলছি মাচাং ঘর।

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।