মাঠে ধান, কাদামাখা পথ, উভয় সংকটে নাইক্ষ্যংছড়ির মানুষ
কালবৈশাখীর তাণ্ডব
কালবৈশাখীর আকস্মিক তাণ্ডবে বান্দরবানের সীমান্তবর্তী নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় যেন নেমে এসেছে এক নীরব বিপর্যয়। ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টিতে মাঠজুড়ে নুয়ে পড়েছে বোরোধান, কোথাও বা পানিতে ডুবে আছে আধাপাকা শস্য। কৃষকের বুকভরা স্বপ্ন এখন মিশে গেছে কাদামাটির সঙ্গে—ফলন বিপর্যয়ের শঙ্কায় দিশেহারা তারা।
আজ বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সরেজমিনে উপজেলার বাইশারীসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়—ধানের মাঠ যেন ঝড়ের আঘাতে বিধ্বস্ত এক প্রান্তর। যে ধানগুলোতে মাত্র থোড় আসছিল, সেগুলো মাটিতে লুটিয়ে পড়ে পানিতে ডুবে আছে। কোথাও কোমরভাঙা হয়ে পড়ে আছে ধানগাছ, আবার কোথাও বৃষ্টির পানিতে জমে থাকা পানিতে শুয়ে আছে সোনালি স্বপ্ন।
এখনও পুরো উপজেলায় পুরোদমে ধান পাকার প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। কিছু জমিতে ধান কাটা শুরু হলেও অধিকাংশ ক্ষেতেই ধান রয়েছে থোড় ও আধাপাকা অবস্থায়। ফলে এই সময়ের ঝড় ও বৃষ্টি সবচেয়ে বড় আঘাত হেনেছে বোরো মৌসুমে। কৃষকদের আশঙ্কা—চিটা ধরা, পচন এবং ফলন অর্ধেকে নেমে আসার আশঙ্কা।
বাইশারী ইউনিয়নের উত্তর করলিয়ামুরা গ্রামের কৃষক মো. ছৈয়দ আলম কারবারী বলেন, এবার ধান ভালো হওয়ার কথা ছিল। প্রতি কানি ১১০-১৩০ আড়ি ধান পাবো ভেবেছিলাম। কিন্তু এক ঝড়েই সব শেষ হয়ে গেল। অনেক ধান মাটিতে পড়ে গেছে, এখন অর্ধেকও পাবো কি না জানি না।
ঘুমধুম ইউনিয়নের কৃষক মো. ছালাম বলেন, যে ধানগুলোতে থোড় আসছিল, সেগুলো একেবারে শেষ। বৃষ্টির পানিতে ডুবে গেছে, বাতাসে পড়ে গেছে। এগুলো আর ঠিকমতো ধান ধরবে না।
সদর ইউনিয়নের কৃষক মো. ছৈয়দ হোছাইন বলেন, ধান কাটার সময়ও হয়নি, আবার ঝড় এসে সব নষ্ট করে দিল। যদি আরেকটু বৃষ্টি হয়, তাহলে পুরো ফসলই শেষ হয়ে যাবে।

কালবৈশাখীর এই তাণ্ডব শুধু কৃষকের মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, আঘাত হেনেছে সাধারণ মানুষের জীবনেও। নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে বাইশারী বাজারগামী একটি চলন্ত সিএনজির ওপর দক্ষিণ বাইশারীর মাইক বাদশার বাড়ির সামনে হঠাৎ গাছের ডাল ভেঙে পড়ে। এতে সিএনজিটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং হাজেরা খাতুন (৪০) নামের এক নারী যাত্রী গুরুতর আহত হন। মাথায় আঘাত পেয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
অন্যদিকে বৃষ্টির পানিতে বেহাল হয়ে পড়েছে বাইশারী বাজার থেকে আলিক্ষ্যং সড়কের পুরাতন পরিষদ এলাকা। সড়ক সংস্কার কাজের মধ্যে পানি জমে কাদা সৃষ্টি হওয়ায় সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী ও সেবা নিতে আসা লোকজন চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বাইশারী হাসপাতাল সড়কেও একই চিত্র—পানি জমে দুর্ভোগ নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ইনামুল হক বলেন, কালবৈশাখীর ঝড় ও বৃষ্টিতে ধানের বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা কম। তবে যেসব জমিতে থোড় আসছে, সেখানে কিছুটা ক্ষতি হতে পারে। উন্নত জাতের ধানে সাধারণত ফলনে তেমন প্রভাব পড়ে না। তবে এই আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। তিনি আরও বলেন, পাহাড়ি এলাকায় যারা জুম চাষ ও সবজি চাষ করেছেন, তাদের জন্য এই বৃষ্টি বরং উপকার বয়ে এনেছে।
এদিকে, বাইশারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আলম কোম্পানির সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উপজেলা কৃষি সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ১৫টি কৃষি ব্লকে মোট ১ হাজার ২ শত ৩৯ হেক্টর জমিতে বোরোধান চাষ হয়েছে, যা স্থানীয় হিসেবে প্রায় ৭ হাজার ৬ শত ৫০ কানির সমান। এর মধ্যে কিছু জমিতে ধান পাকা শুরু হলেও অধিকাংশ জমিতে এখনও থোড় বের হচ্ছে বা আংশিক পরিপক্ব অবস্থায় রয়েছে। এই অবস্থায় কালবৈশাখীর আঘাতে সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়েছে মধ্যবর্তী পর্যায়ের ধান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সময়ের ঝড় ধানের ফলনে বড় ধরনের ধস নামাতে পারে, যদি আবহাওয়া দ্রুত স্বাভাবিক না হয়।
সব মিলিয়ে এক ঝড়েই নাইক্ষ্যংছড়ির কৃষকের স্বপ্নে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তার ছায়া। মাঠে পড়ে থাকা ধানগাছ আর কাদায় থমকে থাকা সড়ক—দুই মিলিয়ে সীমান্তবর্তী এই জনপদের মানুষের চোখে এখন হতাশা আর প্রশ্ন—এবার কি ঘরে তুলতে পারবো সোনালি ধান, নাকি সবই ভেসে যাবে কালবৈশাখীর তাণ্ডবে।



