বৈসাবি উৎসবে পাচন রান্না ও এর গুরুত্ব প্রসঙ্গে

ঞ্যোহলা মং
পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের প্রধান উৎসব বৈসাবি। বৈসাবি শব্দটি ব্যবহার করছি, যদিও শব্দটি দ্বারা সকল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে না। এই উৎসবের প্রধানতম আকর্ষণ থাকে পাচন তরকারি। স্থানীয় ভাষায় অনেকে গন্দ মুই, হাঙ র্স বং, ফাঃসং হাঙ, পাজন ইত্যাদি নামে চিনে থাকেন। আদিবাসীদের ভাষা আর পোষাকে শুধু বৈচিত্র্যতা নয় তাদের রান্নার প্রক্রিয়ায়ও জাতিগোষ্ঠীভেদে কিছু ভিন্নতা দেখা যায়। এবারের বৈসাবিতে আমার সুযোগ হয়েছে শহরের কিছু আদিবাসী পরিবারের রান্না করা পাচন খাওয়ার। যদিও আগে অনেকবার অনেক জায়গায় খেয়েছি।
পাঠকদের বলে রাখি আমি রন্ধন শিল্পী নই। তবে ছোটকাল থেকে রান্না করার সময় মাকে সাহায্য করার অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে সময়ে সময়ে নিজেই রান্না করে খেয়েছি। দেশ বিদেশের অনেক রান্না’র প্রোগ্রাম টিভিতে দেখার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় দু বছর থাকাকালিন সময়ে টিভিতে এক রান্না’র প্রোগ্রাম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখেছি তার উপস্থাপনার সৌন্দর্যতার কারনে।
তারপরও বলবো পাচনকে নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করার জন্য এই অভিজ্ঞতা কিছুই নয়। পড়ালেখা থাকা উচিত রন্ধন বিষয়ে, তবে পাচন পাচনই। আপনি যেভাবেই রান্না করেন না কেন, তার সাধারণ কিছু জুমের উপকরণাদির কারনেই স্বাদ আপনা আপনি হয়ে যায়। অন্ততঃ গ্রামে পাচন খেতে গেলে আমার তেমনটিই মনে হয়।
তবে আজকালকাল শহরের পাহাড়ী বাবুদের মাঝে পাচনকে আরো আকর্ষণীয় করতে নানা প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। ছোটবেলায় পাচন রান্নার উপকরণাদি আগে থেকে সংগ্রহ করে রাখতে খুব একটা দেখিনি। মূলত সাপ্তাহিক বাজার দিনকে হিসাবে নিয়েই নানা পদের উপকরণ সংগ্রহ করা হতো। তবে এও ঠিক যে, সেই সময়ে জিনিসপত্রের সহজলভ্যতা ছিল। বন ছিল, জুম চাষ হতো। এখন বনের পরিমাণ কমতে কমতে তলানিতে রয়েছে। জুমচাষীদের সংখ্যা গণনার নাগালের মধ্যে। ফলে জুমের ফলন আর বনের উৎপদিত নানা উপকরণাদির দুষ্পাপ্যতা দেখা দিয়েছে। এতে জুম ও বনের উপকরণাদির বদলে সমতলের নানা ফলন এমনকি দেশ বিদেশের অনেক উপকরণাদিও যুক্ত হয়েছে আমাদের বছরের সেরা তরকারি পাচনে। শহরের পাহাড়ী বাবু পরিবারের মধ্যে পাচনকে ঘিরে এক ধরনের নিরব প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। যা গ্রামীণ সমাজে অনুপস্থিত। তারা এই সময়ে বরং উপকরণাদি ভাগাভাগি করেই আনন্দ খুঁজে পায়। রান্নার বাহাদুরীতে নয়।
বৈসাবি উৎসবে রান্না করা পাচন
এবারে এক বন্ধুর বাড়ীতে ৮০ প্রকারের উপকরণ দিয়ে রান্নার পাচন খেয়েছি। আমার জীবনে, যা প্রথম। কিছু পরিবারকে দেখেছি একদিন আগে থেকে সবজিসব কেটে জমা করতে। আবার কিছু পরিবারকে দেখেছি একদিন আগে কেটে ফ্রিজে রেখে দিয়ে সকাল সকাল রান্না করে ফেলতে। কিছু পরিবারকে দেখেছি যেদিন রান্না হবে সেইদিনই সবজি কাটাকাটি করতে।
আবার কাটাকাটির ক্ষেত্রেও ভিন্নভিন্ন কৌশল প্রত্যক্ষ করেছি। কেউ কাটার পরে বড় গামলাতে সবজিসব ধোয়, আবার অনেককে দেখেছি ধুয়ে নিয়ে তারপর কাটতে। দেখা যায় যারা কাটার আগে ধুয়ে নেন, কাটার পর পুনরায় না ধোয়ে সরাসরি রান্নায় বসিয়ে দেন।
এবার আসা যাক রান্নায়। কেউ কেউ অত্যধিক তৈল দিয়ে বাজারের দোকানপাটে সবজি রান্নার রং আনেন, কেউবা তৈল কম দিয়ে শুধু সাধারণ সবজি রং’কে ধরে রাখেন।অনেক পরিবারকে দেখেছি বাজারের সবচেয়ে দামি একাধিক প্রজাতির শুঁটকি ব্যবহার করতে। অনেককে দেখেছি বাজারের দামি শুঁটকির পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে বাজারে পাওয়া আদিবাসীদের তৈরী নিজস্ব শুঁটকি মাছের ব্যবহার করতে। কিছু পরিবারকে পেয়েছি নানা শুঁটকি মাছ এর পাশাপাশি কাঁচা মুরগি মাংসেরও ব্যবহার করতে। এছাড়াও দুই এক পরিবার পেয়েছি যারা বেশি পরিমাণে জ্বাল দিয়ে মাংস রান্নার রং নিয়ে আসতে। আবার কিছু পরিবারকে পেয়েছি একেবারে পরিমাণ মত রান্না করতে। যে রান্নাতে সবজিকে হালকা কাঁচা কাঁচা ভাব রাখা হয়েছে।
সবশেষে আসা যায় পরিবেশনের ধরণ। অনেকে পরিবেশন করেছেন একটু গরম গরম রেখে। আবার অনেকে স্বাভাবিক ঠান্ডা অবস্থায়। অনেকে পরিবেশন করেছেন ছোট ছোট প্লেটে পরিমাণ মত। আবার অনেকে একটি বড় বাটিতে পাচন নিয়ে, ছোট ছোট খালি প্লেট দিয়ে। যাতে পরিমাণমত নিয়ে খাওয়া যায়। ফলে দেখা যায় প্রক্রিয়া থেকে পরিবেশন পর্যন্ত রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল। যা থেকে আমাদের বছরের সেরা পাচন তরকারি রান্নার স্বাদ আর গন্ধেও পার্থক্য উপলব্ধি করা যায়। এবার অনেকের বাড়িতে পাচন খেতে গিয়ে তেমনি ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ, গন্ধ এবং পরিবেশনের কৌশল প্রত্যক্ষ করেছি। যা খেতে গিয়ে আপনি অনায়াসে একজন সাধারণ বিচারকের (যদিও রান্নার বিচার করার জন্য পাচন পরিবেশন করা হয় না) ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন।
বৈসাবি উৎসবে রান্না করা পাচন
আমার মতে, পাচন এর স্বাদ উপকরণ বৃদ্ধির মাঝে নির্ভর করে না। বরং ২০-৩০ উপকরণ দিয়েও সেরা পাচন রান্না হতে পারে। এবারে তাদের পাচন ভাল লেগেছে, যারা সবজি কাটার আগে ধুয়ে নিয়েছেন। এতে সবজির স্বাদ ও গন্ধ ঠিক থাকে। যারা কাটার পর পরেই রান্না করেছেন। যারা রান্নায় সবজি রং ধরে রাখতে পেরেছেন। অর্থাৎ যারা বেশি সিদ্ধ আর পুড়ে ফেলেননি। যারা বাজারের গন্ধমুক্ত ভাল শুঁটকি নির্বাচন করতে পেরেছেন। বাজারে অনেক ধরনের শুঁটকি পাওয়া যায়, যার ব্যবহারে তরকারিকে স্বাদ বাড়ানোর বদলে নষ্টই করে দেয়। যারা বাজারের শুঁটকি’র বদলে স্থানীয় আদিবাসীদের তৈরী শুঁটকি ব্যবহার করেছেন। এবং সর্বোপরি যারা কাঁচা মাংস ব্যবহার না করে বরং হালকা গরম গরম পাচন পরিবেশন করতে পেরেছেন। মূলত তাদের রান্না করা পাচনই আমার কাছে সেরা পাচন বলে মনে হয়েছে।
পাচন রান্নায় নানা বৈচিত্র্যতা থাকবে। কিন্তু পাচন রান্নায় উপকরণ বাড়ানোর নামে হাতে যা পাচ্ছি তা দিয়ে রান্না করা হতে একটু সাবধানতা অবলম্বন করা গেলে, বৈসাবি এলে আমাদের পাচন খাওয়ার যে প্রবল বাসনা থাকে তা সব সময়ের জন্য অব্যাহত থাকবে। পাচন রান্নার নামে যদি কাঁচা মাছ আর মাংসও উপকরণ হিসেবে যুক্ত করতে থাকি আগামীতে এর আবেদন হারিয়ে ফেলতেও পারে।
তবে বৈসাবিতে পাচন রান্নায় আদিবাসীরা বেশ সচেতন। পার্বত্য অঞ্চলে নানা ধর্মের মানুষের উপস্থিতি মাথায় রেখে উপকরণসব ব্যবহারে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করা হয়। শুধু তাই নয় এবারের পাচন খেতে গিয়ে কোথাও অতিরিক্ত মরিচের ব্যবহার পাইনি। এতে বুঝা যায় পাচন শুধু বড়দের জন্য নয় বরং শিশুদের উপযোগী করেও রান্না করা হয়। এটিই আদিবাসীদের পাচনের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এটিই ‘আদিবাসী মূল্যবোধ’। এটিই আদিবাসীদের ভালবাসা, সহযোগিতা আর সহভাগিতা, যা তারা আজও লালন ও পালন করে চলেছে।

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও ইউএন ইনডিজেনাস ফেলো। ইমেইল:[email protected]

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। পাহাড়বার্তার -এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য পাহাড়বার্তা কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।