রুমায় এক অনন্ত বৌদ্ধ ভিক্ষু ও লংবাইটং পাড়া বৌদ্ধ বিহার

উ: জ্ঞানজ্যোতি মহাথেরো ওরফে ইদয় ম্রো

উ: জ্ঞানজ্যোতি মহাথেরো ওরফে ইদয় ম্রো‘র রাঙ্গামটি জেলার কাপ্তাই বাঁধের ডুবে যাওয়া কোনো এক গ্রামে আদিবাসী ম্রো পরিবারে তাঁর জন্ম। বাল্যকালে পড়ালেখা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শেষ না করলেও বাংলাদেশ স্বাধীনতার দুই বছর আগেই রাঙ্গামাটি জেলার চাকমা সার্কেলের ১১৯নং মৌজা হেডম্যান এর পদ লাভ করেন। মৌজার হেডম্যান হিসেবে প্রজাদের সেবামূলক সামাজিক আচারসহ নানা সময়ে সৃষ্ট সমস্যাগুলো সমাধানের প্রচেষ্টায় মনোবল ছিল অটুট। তখনও তিনি বুদ্ধের অনুশাসন ও রীতিনীতির প্রতিপালনের আসক্ত ছিলেন। সময় ও সুযোগ পেলেই নিজঘরে ধ্যানে বসতেন তিনি।
তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের রাজনৈতিক বিরাজমান পরিস্থিতির কারণে ১৯৯১সালে মৌজা হেডম্যান এর পদ থেকে ইস্তফা দেন। তখন ৪সন্তানের জনক তিনি। এসময় এক চাকমাকে হেডম্যানের দায়িত্ব অর্পন করেন তিনি। ১৯৯২সালে বান্দরবানের খ্যংওয়া ক্যং বা রাজ বৌদ্ধ বিহারে অধ্যক্ষ ও গুরু ভান্তে উ: পঞঞোজোত মহাথেরো‘র নিকট নিত্যদিন মানব সন্তানের স্বাভাবিক জীবন সংসারের সব মায়া ত্যাগ করে বৌদ্ধ ধর্মীয় নিয়ম অনুসারে প্রবজ্যা(শ্রমন) গ্রহণ করেন ইদয় ম্রো। শ্রমন হিসেবে প্রায় দুই বছর সময় পার হন।
১৯৯৪সালে শুরুর দিকে কাপ্তাইয়ের চিৎমরম বৌদ্ধ বিহারে অধ্যক্ষ স্বর্গীয় উ: পাইন্দিতাহ মহাথেরো‘র নিকট উপসম্পদা গ্রহণ করেন।এরপর ইদয় ম্রো থেকে নাম দেয়া হয় “জ্ঞানজ্যোতি ভিক্ষু বা ভান্তে”। তখন থেকে দীর্ঘ প্রায় সাত বছর চিৎমরম বৌদ্ধ বিহারে বুদ্ধ ধর্মীয় আচার-বিচার শিক্ষা গ্রহণ ও দেশনা দান চর্চায় নিয়োজিত থাকেন।

বিহারের প্রধান পৃষ্ঠপোষক উনুশৈপ্রু’র সাথে পাড়াবাসী

২০১০ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে বান্দরবানের রুমা উপজেলায় গালেঙ্গ্যা ইউনিয়নের চিম্বুক বেইলে লংবাইটং পাড়া বৌদ্ধ বিহারে বিহারাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আদিবাসী ম্রো সম্প্রদায়ের এ প্রবীন বৌদ্ধ ভিক্ষু উ: জ্ঞানজ্যোতি মহাথেরো।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর চিম্বুক সড়কে আদিবাসী ম্রো সম্প্রদায়ের এই পাড়ায় একটি বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রাণপণ প্রচেষ্টায় ছিলেন রুমার একমাত্র অনাথ আম্র “অগ্রবংশ অনাথালয়”র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি স্বর্গীয় ভদন্ত উ: ইন্দিগা মহাথেরো। তিনি ওই সময় নতুন বিহার প্রতিষ্ঠার লক্ষে বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুদান সংগ্রহে ধরণা দিতে থাকেন। এটি ২০০৭-০৮ সালের কথা। নানা স্থানে ধরণা দিতে গিয়ে স্বর্গীয় উ ইন্দিগা মহাথেরো মিলিত হন উ নুশৈ প্রু র সঙ্গে। উ নুশৈ প্রু তখন বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য ও রুমা উপজেলা সার্বিক উন্নয়নের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বান্দরবান বোমাং সার্কেলের ১৪তম রাজা প্রয়াত উ মংশৈপ্রু’র কনিষ্ঠ সন্তান।
রাজকুমার উ নুশৈ প্রু স্বর্গীয় উ:ইন্দিগা‘র প্রস্তাবে বৌদ্ধ বিহার নির্মানে অনুদান প্রদানে রাজি হয়ে যান। কথার সঙ্গে কাজ শুরু করেন রাজকুমার নুশৈ প্রু। সম্পূর্ণ নিজস্ব তহবিল থেকে বান্দরবান থানচি সড়কের পাশে রেংচং ম্রো পাড়ায় একটি বৌদ্ধ বিহার নির্মাণের কাজ শুরু করেন। ২০০৮সালে ২৫জুন বিহার প্রতিষ্ঠায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। বর্ষাকাল, গুড়ি-গুড়ি বৃষ্টিতেও তা দ্রুতগতিতে শেষ হয়-বিহার নির্মাণ কাজটি। ওই সময়ে জেলা পরিষদের সদস্য উ নুশৈ প্রু তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত বিহারটি নামকরণ করেন ‘লংবাইটং পাড়া বৌদ্ধ বিহার’। তা আনুষ্ঠানিকভাবে এক আড়ম্বপূর্ণ আয়োজনে বিহার উসর্গ করা হয়- ২০০৮সালে ২রা ডিসেম্বর। তখন থেকেই লংবাইটং পাড়া বৌদ্ধ বিহারে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন প্রয়াত ভদন্ত উ: জ্ঞানজ্যোতি ভিক্ষু ওরফে ইদয় ম্রো। পরবর্তীতে ২০১১-২০১২ অর্থ বছরে লংবাইটং বৌদ্ধ বিহারটি টিন শেডে পাকা ভবন নির্মাণ কের দেন বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লা।
গত ৪জুলাই,২০১৭ সকাল ৯টায় নিজ বিহারে বর্ধক্য জনিত কারণে উ: জ্ঞানজ্যোতি ভিক্ষু শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। মহান প্রয়াণকালে তাঁর বয়স ছিল ৯৭ বছর। উপ-সম্পদা গ্রহণের বর্ষাবাসের ওয়া-২৩বছর।
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ানুষ্ঠান
ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপণা ও ধর্মীয় ভাব গম্ভীর্যে উ: জ্ঞানজ্যোতি মহাথেরো’ র অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান গত ১৬জুন২০১৭ বিকালে যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বান্দরবানের রুমা উপজেলায় গালেঙ্গ্যা ইউনিয়নের চিম্বুক লাইনে লংবাইটং পাড়া বৌদ্ধ বিহার প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হয়। এ উপলক্ষে দুপুরে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তৃতা দেন বান্দরবান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লা।

সইং নৃত্য পরিবেশন করছেন রেইছা পাড়া নৃত্যদল

তিনি বলেন, পাড়া তথা এলাকাবাসীকে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে হবে। এসময় লংবাইটং পাড়ার বসবাসরত স্বচ্ছল সাত পরিবারকে ১০হাজার টাকা করে অনুদান প্রদানের ঘোষণা দেন।
করুণা শিশু সদন‘র পরিচালক উ: গাইন্ডামালা মহাথেরোর সভাপতিত্বে এ সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য ও লংবাইটং পাড়া বৌদ্ধ বিহার প্রধান পৃষ্ঠপোষক উ নুশৈ প্রু ও অং প্রু ম্রো। রুমার অগ্রবংশ অনাথালয়ের পরিচালক ‍উ নাইন্দিয়া থের উপস্থাপনায় স্বাগত বক্তব্য দেন রেংচন ম্রো।
বিকালে রাঙ্গামাটি রাজস্থলীর নৃত্যের দল জ্ঞানজ্যোতির দাহ প্রাককালে প্যাগোডার সাদৃশ্যে বিশেষ এক তালাহ নিয়ে সইং নৃত্য পরিবেশন করা হয়। এ সইং নৃত্যে ধর্মীয়প্রাণ নর-নারীদের উপস্থিতি ভীর লক্ষণীয় ছিল।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।