সুন্দরবন, ও তো বোবা!

untitled-20_233260মমতাজ লতিফ
প্রকৃতি-পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীলতা বর্তমান বিশ্বের সর্বত্র লক্ষ্য করা যায়। আমাদের এখানেও মনোযোগ বাড়ছে। তবে সব সমস্যা সমাধান করা হচ্ছে- সেটা বলা যাবে না। উদাহরণ হিসেবে আমরা বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যার কথা বলতে পারি। সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে নিয়মিত এসব নদ-নদীর দূষণ নিয়ে প্রতিবেদন থাকে। সরকারও উদ্বেগ প্রকাশ করে। মাঝে মধ্যে তাদের সক্রিয়তাও দেখি। কিন্তু হঠাৎ যেন সবকিছু থেমে যায়। আর হতাশার সঙ্গেই বলে উঠি- যা চাই তা পাই না।
পুরো দুনিয়ায় সুন্দরবন আছে মাত্র একটি। এ বনটি মানুষের হাতে দ্বিখণ্ডিত বাংলার এখনকার বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত। ওখানেও দরিদ্র মৌয়াল, কাঠুরে, জেলে বাস করে; এখানেও এসব পেশার মানুষ বাস করে। একটা পার্থক্য আছে। ওপারের মানুষ দেবী মনসা, ওলাবিবি, বনবিবি, বাঘের দেবতা দক্ষিণ রায়- এদের পূজা করে। এদের পূজাদান নারী-পুরুষ, শিশু সবার জন্য প্রধান কর্তব্য। অর্থাৎ প্রকৃতিকে সম্মান করে তারা তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। আমরা সমাজতাত্তি্বক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে থাকি যে, মানুষের ধর্মের উৎপত্তি হয়েছিল প্রথমত তাকে যে প্রকৃতি খাদ্য, আশ্রয় জোগায় সেই প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে। এভাবে প্রকৃতি উপাসক ধর্মের উৎপত্তি হয়েছে এবং সৃষ্টি হয়েছে নানা পূজা, উপাসনার। প্রকৃতির দানের ওপর নির্ভরশীল মানুষ প্রকৃতির প্রতি অনেক বেশি যত্নবান হবে- এটাই স্বাভাবিক। এটি স্পষ্ট বোঝা যায় এদিকের সুন্দরবন আর ওপারের সুন্দরবন- বনের বৃক্ষ, বাঘ, হরিণ, পাখির সংখ্যা থেকেও পৃথক।
তার পরও একটা কথা বারবার সবার মনে জাগে- পুরো পৃথিবীতে সুন্দরবন তো একটাই এবং সুন্দরবন যে বোবা। সে তো বলতে পারেনি যখন শ্যালা নদীতে তেলের ট্যাংকার ডুবে হাজার হাজার লিটার তেল তার সুন্দরী, গেওয়া, গরান, গোলপাতা বৃক্ষ; বাঘ, হরিণ, পাখি, মাছ, অন্য জলজ, উভচর ডাঙার প্রাণীদের নিঃশ্বাস বন্ধ করে দিচ্ছিল, মৃত্যু ঘটাচ্ছিল, তখন তার কতটা কষ্ট হয়েছিল! ও তো জানে ওর ও বনের বাসিন্দা বোবা প্রাণী, বৃক্ষের ভালো থাকা নির্ভর করে পৃথিবীর শাসক- মানুষের ওপর! ওরা একটা কথা জানে না, সব মানুষের হাতে সব ক্ষমতা নেই, সব মানুষের পছন্দ করা মানুষের নেতা বা নেত্রীর হাতে আছে মানুষ, বন, প্রাণী, জল, নদী, প্রকৃতিকে ভালো রাখার অনেকখানি ক্ষমতা। আমাদের জাতীয় নেতৃত্বের প্রতি অনুরোধ, আপনাদের প্রজ্ঞা দ্বারা উপলব্ধি করুন, শ্যালা বা অন্য বিকল্প নদী-খাল দিয়ে বোঝাই করা কয়লা, তেল- যে পণ্যই হোক; ঝড়-তুফানে হোক, শত্রুতামূলক আচরণ দ্বারা সরকারি প্রকল্পকে বাধাগ্রস্ত করতেই হোক, একটা বড় জাহাজ দিয়ে কয়লা, তেল, ক্লিংকার, সিমেন্ট বোঝাই ট্রলার বা নৌকা ডোবার আশঙ্কা রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প শুরু হলে আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। কারণ প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঝড়-তুফান, জলোচ্ছ্বাস বৃদ্ধি পেয়ে সুন্দরবনসহ বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলকে বিপর্যয়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, উপকূল ভাঙনের কবলে ফেলবে- এতে সন্দেহ নেই। আমরা যতই ঝড়ের বিপদসংকেত মেনে চলি না কেন- নৌযানডুবির হার বৃদ্ধি পাবে। ফলে বহন করা সব ধরনের পণ্য নদী, খাল, সুন্দরবনের উপকূলের জলে পড়ে জলকে দূষিত করবে। বনাঞ্চলের একাংশকে ক্রমশ বঙ্গোপসাগর গ্রাস করবে।
দ্বিতীয়ত,মুক্তিযুদ্ধের শত্রুপক্ষ মুক্তিযুদ্ধজাত স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করার কোনো সুযোগ হাতছাড়া করবে না- এটি এখন সবার জানা। তারা মাঝে মধ্যে কয়লা বোঝাই ট্রলার-নৌকা ডোবানোর সহজ কাজটি করে যাবে বলে আমাদের আশঙ্কা হয়। এ কথা বলে নেওয়া ভালো, ভূতত্ত্ব সম্পর্কে আমার কোনো জ্ঞান নেই। কিন্তু এটুকু জানা আছে, কয়লা পোড়ালে যে কার্বন-মনোক্সাইড গ্যাস বের হয়, সেটিই প্রকৃতি ধ্বংসের সবচেয়ে প্রধান উপাদান। এ কারণে পৃথিবীজুড়ে আজ ‘সবুজ বিদ্যুৎ’-এর প্রতি সমর্থন ও সব দেশের সরকার কয়লা ও তেল বাদ দিয়ে প্রকৃতিবান্ধব বিদ্যুতের প্রতি ঝুঁকেছে।
ইউরোপের অনেক দেশের বিদ্যুতের সর্বমোট উৎপাদনের প্রায় ৮০ ভাগ সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য অন্যান্য উৎস থেকে তৈরি হচ্ছে, যা প্রকৃতিবান্ধব এবং প্রকৃতির শত্রু কার্বন নিঃসরণকারী কয়লার ব্যবহার সেখানে বর্জন করা হয়েছে। পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র ইউরোপের অনেক দেশে ছিল, এখনও কিছু আছে। তবে জনগণের প্রতিবাদের ফলে সেগুলোর সংখ্যাও হ্রাস পাচ্ছে। ইউরোপ বর্তমানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ রেখেছে। ভারতও বিদ্যুৎ তৈরিতে কয়লা ব্যবহার করছে না।
উল্লেখ্য, বিশেষজ্ঞদের অভিমতের উত্তর আমার অনেকটাই অজানা, যেহেতু আমার এ বিষয়ে জ্ঞান নেই। তবে আমার উদ্বেগ অন্যত্র। আমি দৃঢ়ভাবে আমাদের ধীমান প্রধানমন্ত্রী ও তার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে দেখতে চাই না। কারণ, এ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অজানা। এ কারণে আমি বিনীতভাবে জানাতে চাই, যেহেতু রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিতর্কে দু’পক্ষই যুক্তি উপস্থাপন করছে; সুতরাং এতে একটা বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে- সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত না-ও হতে পারে, আবার ক্ষতিগ্রস্ত হতেও পারে। এ ক্ষেত্রে আমরা অবশ্যই যুক্তির পথে হাঁটব। যেহেতু সুন্দরবন, সরকার ও রামপালবিরোধী- এ তিনটি পক্ষ এ বিতর্কে জড়িত এবং প্রধান পক্ষ- সুন্দরবন যে ভিকটিম হতে পারে, সে তো বোবা।
সুতরাং আমাদের মতো আমজনতা মনে করছে, রামপালের ক্ষেত্রে যেহেতু সুন্দরবন কিছু বলতে অক্ষম, অন্য দুই পক্ষ শক্ত শক্ত যুক্তি তুলে ধরছে, সে ক্ষেত্রে যদি প্রকল্পের পর সুন্দরবন মহাবিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়, যে পরিণতি আর কোনোদিন কোনোভাবে উল্টে দেওয়ার পথ থাকবে না, সে পর্যন্ত সর্বনাশ অথবা আশার অপেক্ষায় না থেকে বরং আপাতত প্রকল্পটিকে হয় অন্যত্র, সুন্দরবন থেকে আরও বেশ দূরে, দু’পক্ষের মিলিত নিরাপদ দূরত্ব নির্ধারণ করে স্থান ঠিক করুন। অথবা আপাতত জলবায়ু পরিবর্তনের ফল দেখার জন্য বছর দুয়েক প্রকল্পটি স্থগিত রেখে নতুন নির্ধারিত দূরত্বে নতুন স্থানে প্রকল্পটি শুরু করুন। যদিও কয়লা ধুলে যেমন ময়লা যায় না, তেমনি তার কার্বন নিঃসরণও হ্রাস করা যাবে না। সারা দুনিয়া গ্রিন এনার্জির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সেখানে আমরা কেন জেনেশুনে বিষপান করব? এটি করলে আমরা বড় ধরনের মূর্খ বলে প্রমাণিত হবো। তা ছাড়া ভারত কিন্তু কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরে এসে জলবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তবে ওরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মিত্র কিন্তু ওরা খুব দক্ষ ব্যবসায়ী, দেশের স্বার্থ রক্ষায় সচেষ্ট; যে কয়লা ওরা ব্যবহার করবে না, সেটা বিক্রি করার সুযোগ ওরা ছাড়বে না। বলা চলে, পৃথিবীর এক নম্বর দেশপ্রেমিক সম্ভবত ভারতীয়রা। সূত্র : সমকাল

শিক্ষাবিদ

আরও পড়ুন
Loading...