মাতামুহুরী নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী মারমাপাড়া, বসতঘর, ফসলী জমি

news---11বান্দরবানের লামা পৌর এলাকা ঐতিহ্যবাহী শিলেরতুয়া মারমা পাড়াটি মাতামুহুরী নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে এ পাড়া থেকে নদীর গর্ভে হারিয়ে গেছে ২০টি বসতঘরসহ অনেক ফসলী জমি। চলতি বর্ষা মৌসুমে মাতামুহুরী নদী ভাঙ্গন তীব্র আকার ধারণ করেছে। নদী ভাঙ্গনে দুকূলে অবস্থিত ঘরবাড়ী, ফসলী জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বেশ কয়েকটি গুরুত্বপুর্ণ সড়ক নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার আশংকায় সংশয়ে জীবন যাপন করছে লামা উপজেলার হাজার হাজার মানুষ। ইতিমধ্যে নদী ভাঙ্গনে শতাধিক ঘরবাড়ী, সরকারী বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট ও ফসলী জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আর ফসলি জমি ও বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে উপজেলার গরীব অসহায় শতশত পরিবারের মানুষ। নদী ভাঙ্গনে উপজেলার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ লামা পৌর এলাকার রাজবাড়ী, লামা সদর ইউনিয়ন ও রূপসীপাড়া ইউনিয়ন। দ্রুত নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধ করা না গেলে অচিরেই উপজেলার মানচিত্র পাল্টে যেতে পারে বলে জনপ্রতিনিধিরা আশংকা করছেন। নদী ভাঙ্গন রোধে উপজেলার আপামর জনসাধারণ নদী সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় ব্যাবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি তুলেছেন।জানা গেছে, উপজেলার বুক চিরে বয়ে চলা মাতামহুরী নদীর দু’কূলে অবস্থিত লামা পৌরসভা, লামা সদর ইউনিয়ন, রূপসীপাড়া ইউনিয়নের প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রাম প্রতিবছর কয়েক ঘন্টার ভারী বর্ষণ এবং পাহাড়ের ঝিরি বেয়ে আসা পানি মাতামুহুরী নদীতে মিশে প্রবল স্রোতের সৃষ্টি করে লন্ডভন্ড করে দেয়। এর ফলে ধ্বংস হয়ে যায় ঘরবাড়ী, রাস্তা -ঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, বিভিন্ন এনজিও, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হতদরিদ্র পরিবারগুলোর সাজানো সংসার। এবছর নদীর দু’কূল ভাঙ্গনে ইতিমধ্যে শতাধিক ঘরবাড়ী, রাস্তাঘাট ও কয়েক’শ একর ফসলী জমি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ভাঙ্গন পিড়িত পরিবারগুলো এখন বসবাস করছে অন্যের বাড়ীতে কিংবা আশ্রয়ন প্রকল্পের বাসিন্দা হয়ে। শতশত বিঘা জমির মালিকরা আজ ভূমিহীন প্রজা মাত্র। লামা পৌর এলাকার শীলেরতুয়া আদিবাসী পাড়া কারবারী ম্রাসাথোয়াই মার্মা, পৌর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মংহ্লাচিং মার্মা ও মংএ মেম্বার বলেন, চলতি বর্ষা মৌসুমে ২০ টি বসত ঘর নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বিলীন হওয়া পরিবারগুলো অনেকেরই আর কোন জায়গা জমি না থাকায় ওরা খোলা আকাশে নিচে বসবাস করছে। গত চার বছর আগেও তাদের পাড়াটি দুই সারিতে সাজানো ছিল। মাতামুহুরীর ভয়াল থাবায় একসারি ভেঙ্গে গেছে। এ বছর যে হারে মাতামুহুরী ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে তাতে বাকী সারি বসতঘর চলতি বর্ষায় ভেঙ্গে যাতে পারে। পাড়ার উক্যসিং মার্মা, হ্লাচাঅং মার্মা, মংবা মার্মা, মংচানু মার্মা, অংচাগ্য মার্মা, উচিথিং মার্মা, মংহ্লাচিং মার্মা, মংনুচিং মার্মা, লুংথং মার্মা, ক্যহ্লাচিং মার্মা. অংথুইআংচিং মার্মা, অংক্যথোয়াই মার্মা ও মংপ্রুচি মার্মার বসতঘর বিলীন হয়ে যায়। এর মধ্যে অংচাগ্য মার্মা রূপসী পাড়া ইউনিয়নের বালুচর পাড়ায় গিয়ে নতুন করে বসবাস করছেন। সাবেক বিলছড়ি গ্রামের আদু মিয়া জানায়, গত কয়েক বছরে তার প্রায় ৫ একর ফসলী জমি এ নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। নিজের জমি হারিয়ে এখন অন্যের জমি চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। লামা বাজারের স’মিল পাড়ার মোহম্মদ সেলীম, মো. শামসু ও ছোট নুনারবিল মার্মা পাড়ার চহ্লা মার্মা জানায়, গত ৩ বছর আগে মাতামুহুরী নদী তার বসতঘর থেকে প্রায় একশ গজ দূরে ছিল। এ মৌসুমে তার বসতঘর সম্পূর্ণ নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ার আতংকে আছেন। বসতভিটা ভাঙ্গলে তাদের আর মাথাগোজার ঠাঁই থাকবে না। এ চিত্র শুধু পৌর এলাকার নয়, লামা সদর ও রূপসীপাড়া ইউনিয়নেও একই চিত্র। রূপসী পাড়া ইউনিয়নের অংহ্লাপাড়ার বাসিন্দারা অংগ্য মার্মা জানান, মাতামুহুরী নদীর শাখা নদী লামাখালের উপর বাঁশের সাকো দিয়েই অন্যপাড়ে চলাচল করা যেত। গত কয়েক বছরের ভাঙ্গনে চলতি মৌসুম থেকে বাজার ভাঙ্গা শুরু হয়েছে। লামা পৌরসভা মেয়র মো. আমির হোসেন, রূপসী পাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান চাছিংপ্রু মার্মা ও লামা সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মিন্টু সেন বলেন, মাতামুহুরী নদীর ভাঙ্গনের প্রতি বর্ষা মৌসুমে এলাকার পাকা ও কাচা রাস্তাঘাট, ফসলি জমি, সরকারী বেসরকারী ভবন ও বসতঘর বিলীন হয়ে যাচ্ছ। অচিরেই এ নদী ভাঙ্গন রোধ করা না গেলে আগামী কয়েক বছরেই পৌর এলাকাসহ ইউনিয়নগুলো নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। এদিকে, চলতি মৌসুমে বন্যায় গৃহহারা হওয়ার আশংকায় মাতামুহুরী নদীর তীরবর্তী অসহায় প্রায় ১৩শ পরিবারের হাজার হাজার মানুষ সংশয়ে দিনযাপন করছে। সরজমিন দেখা গেছে ইতিমধ্যে লামা পৌর এলাকার রাজবাড়ী, কুড়ালিয়ারটেক, লামামুখ বাজার, সাবেক বিলছড়ি, লাইনঝিরি-সাবেক বিলছড়ি সড়ক, চাম্পাতলী আর্মিক্যাম্প, টি.টি এন্ড ডি,সি, হাসপাতাল পাড়া, স’মিল পাড়া, লামা বাজার পাড়া, বাজার ঘাট সংলগ্ন ফরেষ্ট অফিস, শীলেরতুয়া মার্মা পাড়া, সাবেক বিলছড়ি মার্মা পাড়া ও সদর ইউনিয়নের মেরাখোলা, মেউলারচর, রূপসী পাড়ার অংহ্লাপাড়া, শীলেরতুয়া এলাকার বহু সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, ফসলী জমি, ঘরবাড়ী মাতামুহুরী নদীর দু’কূলের অব্যাহত ভাঙ্গনে দুই তৃতীয়াংশ স্থাপনা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আশরাফ জামান বলেন, মাতামুহুরী নদী ভাঙ্গন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও প্রযোজনীয় অর্থ বরাদ্দের অভাবে তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে লামা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, আমি লামা পৌর মেয়র থাকাকালীন সময়ে পৌরসভার স্মারক নং- লামা/পৌর/২০০২/৩৭০ মূলে বিস্তারিত বিষয় উল্লেখ করে পানি সম্পদ মন্ত্রীর নিকট একটি আবেদন করি। এর প্রেক্ষিতে শীলেরতুয়া ও সাবেক বিলছড়ি এলাকায় মাত্র ২০ মিটার ব্ল¬ক ঢালাই কাজের বরাদ্দ হয়। বাকী ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় এখনও কর্তৃপক্ষের কোন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছেনা। ফলে বর্ষা মৌসুম এলেই পৌর শহরসহ উপজেলার নদী তীরবর্তী পরিবারের লোকজনকে নদী ভাঙ্গন আতংকে জীবন যাপন করতে হয়।

আরও পড়ুন
Loading...