নৌ দুর্ঘটনায় থেমে যাওয়ার শঙ্কায় শিক্ষার্থী সাবিত্রী ত্রিপুরার শিক্ষাজীবন

বান্দরবানের থানচিতে সাঙ্গু নদীতে দুটি ইঞ্জিনচালিত নৌকার মুখোমুখি সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয়েছে থানচি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাবিত্রী ত্রিপুরা। নৌকার ইঞ্জিনের আঘাতে তার হাতের আঙুল ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। বর্তমানে চকরিয়ার মালুমঘাট মেমোরিয়াল খ্রিস্টান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে সে। চিকিৎসার দীর্ঘ সময় ও বিপুল ব্যয়ের আশঙ্কায় দরিদ্র পরিবারটি চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছে। মেয়ের চিকিৎসার জন্য সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় মানুষের কাছে আর্থিক সহযোগিতা চেয়েছেন তার অভিভাবকেরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে সাঙ্গু নদীতে ইয়াংহ্রেস এলাকায় দুটি ইঞ্জিনচালিত নৌকার মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে নৌকায় থাকা দুই শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়। তারা হলেন, দুর্গম রেমাক্রী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কালু ত্রিপুরাপাড়ার বাসিন্দা দরিদ্র কৃষক পিলিপ্স ত্রিপুরা ও রুমাতি ত্রিপুরার মেয়ে সাবিত্রী ত্রিপুরা এবং ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী হেনা ত্রিপুরা। হেনাকে থানচি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর হোস্টেলে পাঠানো হয়েছে। দুই শিক্ষার্থীই থানচি যিহোবা যিরি ব্যাপ্টিস্ট মিশনের হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করে আসছিল।

রেমাক্রী ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জন ত্রিপুরা বলেন, শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটি শেষে ওই দিন সকালে গ্রাম থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে হোস্টেলে ফিরছিল দুই শিক্ষার্থী। ইয়াংহ্রেস এলাকায় পৌঁছালে একটি নৌকার অদক্ষ চালকের কারণে মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। এতে দুই শিক্ষার্থী নৌকা থেকে ছিটকে পড়ে। এ সময় নৌকার ইঞ্জিনের আঘাতে সাবিত্রীর হাতের দুটি আঙুল গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয় লোকজন তাদের উদ্ধার করে থানচি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। পরে সাবিত্রীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়।

কালুপাড়ার বাসিন্দা জয়বা ত্রিপুরা বলেন, বর্তমানে সাবিত্রী মালুমঘাট মেমোরিয়াল খ্রিস্টান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যস্থতায় দুর্ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই নৌকার মাঝি ও মালিকপক্ষের সমন্বয়ে চিকিৎসার জন্য ৪০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।

NewsDetails_03

যিহোবা যিরি ব্যাপ্টিস্ট মিশনের হোস্টেল সুপার দুসাজন ত্রিপুরা বলেন, দুই শিক্ষার্থীর মধ্যে হেনা সুস্থ হয়ে উঠেছে। তবে সাবিত্রীর শারীরিক অবস্থার কারণে আগামী নভেম্বর ও ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েছে।

স্থানীয় বিএনপি নেতা মংএনু মারমা ও শৈবাথোয়াই মারমা বলেন, থানচিতে পর্যটকদের আগমন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিনচালিত নৌকার সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অনেক নতুন, অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক। কিন্তু নদীপথে নৌযান পরিচালনা, বিপজ্জনক বাঁক অতিক্রম কিংবা অন্য নৌযানকে পাশ কাটানোর বিষয়ে চালকদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা কারিগরি প্রশিক্ষণ নেই। ফলে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

ঢাকার বাসিন্দা পর্যটক মো. হারুন রশিদ বলেন, থানচির দুর্গম এলাকার মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম সাঙ্গু নদী। শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানির গভীরতা কমে যাওয়ায় পাথুরে বাঁকগুলোতে নৌচলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। যথাযথ প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স ছাড়া নৌযান পরিচালনার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়ছে। অনভিজ্ঞ চালকদের চিহ্নিত করে উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দ্রুত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং নৌচলাচলে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।

আহত সাবিত্রীর বাবা পিলিপ্স ত্রিপুরা বলেন, ‘চিকিৎসক হেরল স্যার আমাদের মেয়েকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। আঙুলে অস্ত্রোপচারসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত লাগতে পারে। এ ছাড়া সুস্থ হতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে। আমি একজন দরিদ্র মানুষ। মেয়ের চিকিৎসার এত টাকা কীভাবে জোগাড় করব, তা ভেবে দিশেহারা হয়ে পড়েছি।

থানচি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কানন সরকার বলেন, ‘আমি বর্তমানে পারিবারিক প্রয়োজনে মালুমঘাট হাসপাতালে অবস্থান করছি। সাবিত্রীর চিকিৎসার বিষয়টিও খোঁজখবর রাখছি। মুঠোফোনে স্থানীয় চেয়ারম্যান, জনপ্রতিনিধি, ইঞ্জিনচালিত নৌকার চালক ও মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছি। আমরাও সহযোগিতা করব। তবে কোনো পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ বা মামলা না হওয়ায় এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই।অনুপম মারমা

আরও পড়ুন