পাহাড়ে সশস্ত্র সংঘাত, থমকে যায় পর্যটন

পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার ও সংঘাতের কারণে বারবার অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে পাহাড়ি জনপদ। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সম্ভাবনাময় পর্যটন খাতে। নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে পর্যটকদের ভ্রমণ নিরুৎসাহিত হওয়া এবং প্রশাসনের বিভিন্ন সময়ে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারির ফলে ক্ষতির মুখে পড়ছেন হোটেল-রিসোর্ট ব্যবসায়ী, পর্যটন গাইড, জিপচালক, নৌকার মাঝিসহ হাজারো মানুষ।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে সারা বছরই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা ছুটে আসেন বান্দরবানে। পাহাড়, ঝরনা, মেঘের উপত্যকা ও দুর্গম পর্যটন স্পটগুলো জেলার প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু পাহাড়ে সংঘাত বা গোলাগুলির খবর ছড়িয়ে পড়লেই নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয় পর্যটকদের মধ্যে। অনেকেই আগাম বুকিং বাতিল করেন, আবার কেউ কেউ ভ্রমণ পরিকল্পনা স্থগিত করেন।

পর্যটনসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাহাড়ে সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হলে এর প্রথম ধাক্কা আসে পর্যটন খাতে। নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসন নির্দিষ্ট এলাকায় পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ করে দিলে হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের বুকিং বাতিল হতে থাকে। পর্যটকবাহী যানবাহন চলাচলও কমে যায়। এতে আয় বন্ধ হয়ে যায় পর্যটননির্ভর হাজারো মানুষের।

সংঘাতের প্রভাব পর্যটনে
বান্দরবানে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে। এর মধ্যে ২০২২ সাল থেকে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)-এর সশস্ত্র তৎপরতা নতুন করে পাহাড়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করে।

কেএনএফের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, সংঘাত, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য সহিংস ঘটনার কারণে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পর্যটকদের যাতায়াতেও প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে রুমা, থানচি ও রোয়াংছড়ির মতো উপজেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে বিভিন্ন সময়ে পর্যটকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

স্থানীয় পর্যটকবাহী জিপচালক মো. কামাল বলেন, ‘পর্যটক না এলে আমাদের দিনে এনে দিনে খাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়। পাহাড়ে গোলাগুলি বা আঞ্চলিক কোন্দল শুরু হলে পর্যটকরা বান্দরবানে আসেন না। তখন আমাদের ব্যবসাও বন্ধ থাকে।’

প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ টাকা ক্ষতির দাবি

বান্দরবান হোটেল-রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জসীম উদ্দিন জানান, সংগঠনটির নিবন্ধিত ৭১টি হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রায় এক হাজার মানুষ যুক্ত।

তিনি বলেন, ‘সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিলে অনেক সময় পাহাড় অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। এর প্রভাব পড়ে পর্যটনে। প্রশাসন থেকে বিভিন্ন উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। তখন হোটেল-রিসোর্টগুলোও বন্ধ থাকে। এতে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়।’
পর্যটন খাত সচল রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরও জোরদার কার্যক্রম প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ব্যাংক ডাকাতির পর যৌথ অভিযান

স্থানীয় সংবাদকর্মী ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২ এপ্রিল রাতে বান্দরবানের রুমা উপজেলায় সোনালী ব্যাংকের শাখায় হামলা, পুলিশ ও আনসারের অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে। পরদিন ৩ এপ্রিল থানচি উপজেলার সোনালী ব্যাংক ও কৃষি ব্যাংকে হামলা, ডাকাতি ও টাকা লুটের ঘটনা ঘটে।
এসব ঘটনার পর রুমা থানায় ১৩টি, থানচি থানায় চারটি, বান্দরবান সদর থানায় একটি এবং রোয়াংছড়ি থানায় তিনটি—মোট ২১টি মামলা দায়ের করা হয়।

মামলাগুলোর আসামিদের গ্রেপ্তারে বান্দরবানে যৌথবাহিনীর অভিযান পরিচালিত হয়। এতে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি র্যাব, পুলিশ, বিজিবি ও আনসার সদস্যরা অংশ নেন। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যমতে, অভিযানে কেএনএফের সদস্য ও সহযোগীসহ ১০৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে বাড়বে পর্যটন

NewsDetails_03

থানচি ট্যুরিস্ট গাইড কল্যাণ সমবায় সমিতির এই নেতা বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও সুদৃঢ় করা গেলে বান্দরবানে সারা বছর পর্যটকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব।
তার মতে, এতে সরকারের রাজস্ব বাড়ার পাশাপাশি থানচির হাজারো পরিবারের জীবিকা নিশ্চিত হবে এবং পুরো জেলার পর্যটন শিল্প আরও এগিয়ে যাবে।

থানচিতে ফিরছে পর্যটকের ভিড়

দীর্ঘ মন্দার পর আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে বান্দরবানের থানচি উপজেলার পর্যটন খাত। থানচি ট্যুরিস্ট গাইড কল্যাণ সমবায় সমিতি লিমিটেডের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রেজাউল করিম জানান, তাদের সমিতির আওতায় ১৫৪ জন গাইড কাজ করেন।

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে থানচির পর্যটন খাত আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। প্রশাসনের উদ্যোগে পর্যটন সেক্টর যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে আমরা ট্যুরিস্ট গাইড, নৌকার মাঝি ও ব্যবসায়ীরা নতুন আশার আলো দেখছি।’

রেজাউল করিম জানান, গত দুই-তিন বছর থানচিতে পর্যটন কার্যক্রম ব্যাহত থাকায় সংশ্লিষ্টদের চরম কষ্টে দিন কাটাতে হয়েছে। পর্যটনই তাদের প্রধান আয়ের উৎস। পর্যটক না আসায় অনেক গাইডকে বাধ্য হয়ে দিনমজুরের কাজ করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘পরিবারের দৈনন্দিন খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। অনেক পরিবারকে অনাহার-অর্ধাহারেও দিন কাটাতে হয়েছে।’

তবে বর্তমানে পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে বলে জানান তিনি। বান্দরবান জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা থানচির বিভিন্ন আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট ধীরে ধীরে খুলে দেওয়া হচ্ছে। তাজিংডং পাহাড় ও বাকলাই ঝরনার মতো পর্যটন স্পট উন্মুক্ত হওয়ায় পর্যটকের আগমনও বেড়েছে বলে জানান তিনি।

‘এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিনই পর্যটক আসছেন। আমাদের কাজ আবার শুরু হয়েছে। পরিবার নিয়ে এখন কিছুটা স্বস্তিতে আছি,’ বলেন রেজাউল করিম।

পাহাড়ের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা পর্যটনের

স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, পার্বত্য জেলা বান্দরবানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানে পর্যটন শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সংঘাত ও নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে পর্যটন কার্যক্রম বারবার ব্যাহত হলে এর প্রভাব পড়ে পুরো স্থানীয় অর্থনীতিতে।

তাদের মতে, পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে পর্যটনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি পর্যটননির্ভর ব্যবসা ও বিনিয়োগও আরও সম্প্রসারিত হবে।

পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পর্যটন ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে পাহাড়ে সশস্ত্র তৎপরতা বন্ধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

পাহাড়ে নিরাপদ পরিবেশ ফিরলে শুধু পর্যটন শিল্প নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকাও স্থিতিশীল হবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।. এর উপর ভিত্তি করে একটা গ্রাফিক্স করে দিন

আরও পড়ুন