রুমায় বিদ্যালয়ে পাঠদান বাদ দিয়ে ব্যবসায় ব্যস্ত যে শিক্ষক

উপস্থিতি থাকেন ১ থেকে ৫ দিন।

বিদ্যালয়ে উপস্থিতি মাসে এক থেকে পাঁচদিন। কোনো মাসে একদিনও উপস্থিত থাকেন না। তারপরেও মাস শেষে সরকার কোষাগার থেকে টাকা তুলতে কোনো সমস্যা হয়নি তার। কথিত মানুষ গড়ার কারিগর এক শিক্ষকের এভাবে অনায়াসে চলছে আড়াই বছর। বান্দরবানের রুমায় পাইন্দু হেডম্যান পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ আল আমিন এর দায়িত্ব পালনের চিত্র এটি।

অথচ নিয়মিত বিদ্যালয়ের উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীরদের পাঠদান করার কথা, সে কিনা দিনে বিদ্যালয়ে ফাঁকি দিলেও সন্ধ্যা হতে না হতেই রুমা বাজারে দোকানে বসে বিকাশে টাকা লেনদেনের ব্যবসার কাজে নিয়মিত উপস্থিত থাকেন, এসব কথা বলেছেন পাইন্দু হেডম্যান পাড়াবাসীর।

গত মঙ্গলবার (২৭ আগস্ট) দুপুরে পাইন্দু হেডম্যান পাড়ার একটি দোকানে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে খোলামেলায় আলাপকালে তারা এসব কথা জানিয়েছেন।

এর আগে এ প্রতিবেদক ১১টায় পাইন্দূ হেডম্যান পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখেন, প্রধান শিক্ষক আল আমিন বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন না। উড়ছিল না-জাতীয় পতাকাও।
তবে তিনটি কক্ষে তিনজন শিক্ষক পাঠদান করছেন।

তার মধ্যে দুইজনই প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে সাময়িক সময়ের জন্য ওই বিদ্যালয়ে পাঠদান করছেন। এই দুই জনের মধ্যে একজনের নাম প্রুচিংথোয়াই মার্মা । তিনি জানান, শিক্ষক প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাদের এ বিদ্যালয়ে চার মাসের জন্য পাঠিয়েছেন।

বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি (এসএমসি) সাবেক সভাপতি ছোহ্লা মং মারমা বলেন, চলতি আগস্ট মাসে প্রধান শিক্ষক আল আমিন এই পর্যন্ত (২৭আগস্ট) মাত্র একদিন দুপুরে এসেছিলেন। তখন বিদ্যালয় পাশে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের ওয়াশরুম নির্মাণ শ্রমিকদের নিয়ে এসেছিলেন। ঐদিনও কোনো ক্লাস না করে চলে গেছেন প্রধান শিক্ষক।

ছোহ্লামং মারমা অভিযোগের ভাষ্যমতে, গত জুলাই মাসে ৯ থেকে ১৭ তারিখের মধ্যে বিদ্যালয়ে মাত্র পাঁচ দিন এসেছিলেন। এ বিদ্যালয়ে যোগদান করার পর থেকে প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয় অনুপস্থিতিরসহ অনিয়ময করে যাচ্ছেন।

ছোহ্লামং মারমা এর ভাষ্যমতে, ২০২৪ সালে বিদ্যালয় মেরামত কাজের জন্য বরাদ্দের বিষয়ে তাকে কিছুই জানানো হয়নি। গত ৩০জুনের আগে চেক-এ শুধু সভাপতি সীল দিয়ে কোনো কিছু লেখা ছাড়াই প্রধান শিক্ষক তাঁকে স্বাক্ষর দিতে বলা হয়। ওই চেক দিয়ে কত টাকা উত্তোলন করেছেন, এটা জানা ছিল না । পরে লোকজন মারফত জানতে পারলেন যে, বিদ্যালয় মেরামতের জন্য বরাদ্দের কথা।

ততক্ষণে ৩০ জুনের পরবর্তী প্রায় দেড়মাস পেরিয়ে গেছে। ওই সময় পাড়ার লোকেরা তাঁকে বলত, প্রধান শিক্ষকের সাথে যোগসাজশে টাকাগুলো আত্মসাৎ করেছেন। তখন প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। হঠাৎ বরাদ্দের হিসাব নিকাশের অবস্থা জানতে চাওয়ায় মুঠোফোনে প্রধান শিক্ষকের ভাষা অস্পষ্টতা ছিল। অবশ্যই খানিকের মধ্যে প্রধান শিক্ষক তাঁকে (সাবেক সভাপতি) জানায়, বিদ্যালয়ের জন্য রং কিনতে বান্দরবানে যাচ্ছেন।

ছোহ্লামং এর কথা শেষ না হতেই ওই দোকানে বসে থাকা পাইন্দু হেডম্যান পাড়া বারবারী থোয়াইসা মারমা(৬৬), ক্যহ্লাচিং মারমা (৫০), ক্যহ্লাথোয়াই (৩৫) ও উবাসিং মারমা(৩৫)সহ আরো অনেকে বলেছেন, বেশ কয়েক বছর আগেও তাদের পাড়ার বিদ্যালয়ে বদলী হয়ে কয়েক বছর থাকার পর অন্যত্র বদলী চলে গিয়েছিলেন আল আমিন। তখনকার সময়েও নিয়মিত আসতেন না।

আবার ঘুরে-ফিরে ২০২২ সালে মে মাসে এই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এটা পাইন্দু পাড়াবাসীর জন্য খুব দু:খজনক বলে উল্লেখ করেন পাড়া প্রধান থোয়াইসা মারমা বারবারী। তিনি বলেন, এ ধরনের শিক্ষক ১০০জন থাকলেও পাড়াবাসীর ছেলে মেয়েদের পড়ালেখায় কোনো উপকারে আসবে না।

পাড়াবাসীরা বলছেন, অনিয়মিত উপস্থিতির ব্যাপারে অভিযোগ দিলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি উপজেলা শিক্ষা অফিস। খোলামেলায় আলাপকালে খাতায় দিন তারিখ লিপিবদ্ধ করে রাখা লেখা দেখিয়ে সাবেক সভাপতি ছোহ্লামং মারমা আরও জানান, তিনি সভাপতি থাকাকালীন ২০২৩ সালে ৭জুলাই কৃষি ব্যাংক থেকে পনেরো হাজার উত্তোলন করেন। এটাকা কোনো কাজ করা হয়নি।

সূত্রমতে, বিদ্যালয় মেরামত কাজের জন্য ২০২৩-২৪ অর্থ সালে ৬০হাজার টাকা বরাদ্দ পায়। এটাকায় ২৮ ডিসেম্বর তৃতীয় কিস্তি ২১হাজার পাঁচশ টাকা উত্তোলন করে প্রধান শিক্ষক। তবে এর আগে দুই কিস্তি সভাপতি স্বাক্ষর ছাড়া টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। স্বাক্ষর জাল করে টাকা ব্যাংক উত্তোলন করেন, এমন অভিযোগও জানিয়েছেন সাবেক সভাপতি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক মোঃ.আল আমিন অনিয়মিত উপস্থিতির কথা অস্বীকার করে বলেন পাড়াবাসীরা বিদ্যালয়ে কখনো আসেন না, তাই বিদ্যালয়ে আছে কি নেই, তা তারা সঠিক বলতে পারেননা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আশীষ চিরান বলেন, জুলাই মাসে রাজনৈতিক কারণে বিদ্যালয় বন্ধ ছিল।

আরও পড়ুন