জনবল বাড়াতে চট্টগ্রাম বান্দরবান টার্গেট ছিল নব্য জেমমবি’র

জঙ্গি গ্রুপে নিজেদের জনবল বাড়াতে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও বান্দরবানের পাহাড়ি জনপদ নাইক্ষংছড়িকে টার্গেট করেছিলো নব্য জেএমবি। ২০১৪ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালে পুলিশের প্রিজনভ্যান থেকে তিন জঙ্গি নেতাকে ফিল্মি কায়দায় ছিনতাইয়ের এক বছর পর চট্টগ্রামে নব্য জেএমবি’র সন্ধান পেয়েছিলো পুলিশ। সেই সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলো জেএমবি নেতা এরশাদ হোসেন মামুন। দুই দফা তদন্তের তিন বছরের মাথায় জঙ্গি সংক্রান্ত এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) দাখিল করেছেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। মামলায় দুর্ধর্ষ ছয় জঙ্গি নেতাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বগুড়ার ডা. নজরুল ও ফারদিন জঙ্গি গ্রুপের অর্থায়ন ও অস্ত্রের যোগান দিতো। দুজনেই মারা যাওয়ায় অর্থায়ন ও অস্ত্রের উৎসের সন্ধান পায়নি পুলিশ। গত ২৪ জানুয়ারি বিজ্ঞ আদালতে চাঞ্চল্যকর এ মামলার চার্জশিট দাখিল করেন পিবিআইয়ের পরিদর্শক (ওসি) সন্তোষ কুমার চাকমা।

২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গাজিপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে আদালতে নেয়ার পথে ময়মনসিংহের ত্রিশালের সাইনবোর্ড এলাকায় জেএমবির তিন দুর্ধর্ষ নেতা সালাউদ্দিন ওরফে সজীব, রকিব হাসান ওরফে হাফেজ মাহমুদ ওরফে রাসেল ও মিজান ওরফে বোমা মিজানকে পুলিশের প্রিজনভ্যান থেকে ছিনিয়ে নেয়া জঙ্গি গ্রুপের কর্র্মী ও সমর্থকরা। এ ঘটনার এক বছরের মাথায় ২০১৫ সালের ২৩ মার্চ নগরীর আকবরশাহ থানার এনআর স্টিল মিল এলাকার জনৈক জসিমের ভাড়া ঘর থেকে বিষ্ফোরকদ্রব্য ও বোমা তৈরির সরঞ্জামসহ এরশাদ হোসেন মামুন নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ ব্যাপারে আকবরশাহ থানার এসআই শহিদের রহমান বাদি হয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। সেই সময় এরশাদ জানিয়েছিলো চট্টগ্রামে নব্য

জেএমবি সুসংগঠিত হচ্ছে। গাইবান্ধার বুলবুল আহমেদ সরকার চট্টগ্রামের সামরিক শাখার দায়িত্ব পালন করছেন। বগুড়ার ডা. নজরুল ও ফারদিন অর্থায়ন আর

অস্ত্রের যোগান দিচ্ছে। এছাড়া আরো বেশ কিছু জেএমবি নেতার নাম জানিয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দেন এরশাদ মামুন। এসব বিষয় গভীরভাবে তদন্ত না করে ঘটনার চারমাসের মাথায় এরশাদকে একমাত্র আসামি করে গুরুত্বপূর্ণ এ মামলার চার্জশিট দেয় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আকবরশাহ থানার এসআই মোহাম্মদ সোলাইমান।

চার্জশিটের তিনমাসের মাথায় নগরীর সদরঘাট থানার মাঝিরঘাটে বহুজাতিক কোম্পানি রেকিট বেনকিজারের অফিসে হামলা টাকা লুট করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার সাহা বাবুকে গুলি করে হত্যা করে জঙ্গি সদস্যরা। পালিয়ে যাবার সময় নিজেদের হ্যান্ড গ্রেনেড বিষ্ফোরণে ঘটনাস্থলে রফিক ও রবিউল নামে দুই জঙ্গি সদস্য মারা যায় ডাকাতির ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে জঙ্গি গ্রুপের সন্ধান পায় নগর গোয়েন্দা পুলিশের তৎকালীন অতিরিক্ত উপ কমিশনার মো. বাবুল আক্তার। এতে দেখা যায়, এরশাদ মামুন তার জবানবন্দিতে যাদের নাম বলেছিলেন তারাই বহুজাতিক কোম্পানির অফিসে হামলা করেছে। বিষয়টি জানতে পেরে ২০১৫ সালের ৬ অক্টোবর এসআই সোলেমান বিজ্ঞ আদালতে একটি সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করেন। এতে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের তুলসিপাড়ার মৃত আক্তার হোসেন সারকারের ছেলে বুলবুল আহম্মেদ সরকার ওরফে এম এ হাসান ফুয়াদ ওরফে আপেল ওরফে রকি ওরফে মেহেদী, ঝিনাইদহের মো. মমিনুল ইসলামের ছেলে মো. সুজন, ফুয়াদের মাম শ্বশুর চট্টগ্রামের চরপাথারঘাটার ইছানগর গ্রামের আবদুল গণি সওদাগরের ছেলে মাহবুবুর রহমান ওরফে মাহবুবুল ওরফে খোকনকে অভিযুক্ত করা হয়। জঙ্গি গ্রুপের অস্ত্র ও অর্থের সন্ধান না পাওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট চাঞ্চল্যকর এ মামলা পুনরায় তদন্ত করতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (চট্টগ্রাম মেট্টো) আদেশ দেন আদালত।

দ্বিতীয় মেয়াদে টানা দেড় বছর তদন্ত শেষে গত ২৪ জানুয়ারি আদালতে এরশাদ মামুনসহ ছয় জঙ্গি নেতার বিরুদ্ধে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন পিবিআইয়ের পরিদর্শক (ওসি) সন্তোষ কুমার চাকমা।

ছয় আসামি হলেন, দিনাজপুরের বিরল থানার মো. রিয়াজুল ইসলামের ছেলে মো.এরশাদ হোসেন ওরফে মামুন ওরফে জয় ওরফে বিজয় ওরফে শুভ, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের তুলসিপাড়ার মৃত আক্তার হোসেন সরকারের ছেলে বুলবুল আহম্মেদ সরকার ওরফে এম এ হাসান ফুয়াদ ওরফে আপেল ওরফে রকি ওরফে মেহেদী, ঝিনাইদহের মো. মমিনুল ইসলামের ছেলে মো. সুজন, চট্টগ্রামের চরপাথারঘাটার ইছানগর গ্রামের আবদুল গণি সওদাগরের ছেলে মাহবুবুর রহমান ওরফে মাহবুবুল ওরফে খোকন, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের মৃত মাওলানা ওসমান গণির ছেলে দুর্ধর্ষ জঙ্গি নেতা রাজিব গান্ধি ওরফে জাহাঙ্গীর আলম ও নোয়াখালির কোম্পানিগঞ্জের মো. আবুল কালামের ছেলে রাজু ওরফে নুরনবী। তারা সবাই বর্তমানে কারাগারে বন্দী আছেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,২০১৫ সালে রাজিব গান্ধি জেএমবির উত্তর বঙ্গের সামরিক শাখা, বুলবুল আহমেদ সরকার চট্টগ্রামের সামরিক শাখা ও তার মামা শ্বশুর মাহাবুবুর রহমান বান্দরবানের নাইক্ষংছড়িতে জেএমবি সদস্যদের প্রশিক্ষনের দায়িত্বে ছিল। বোমা তৈরি করতে গিয়ে ফারদিন ও আর্থিক ভাগ ভাটোয়ারার বিষয় ডা. নজরুল নিহত হওয়ায় অস্ত্র ও অর্থের উৎসের সন্ধান মেলেনি।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারাগারে থাকা জেএমবির সামরিক কমান্ডার বুলবুল আহমেদ সরকারকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করতে আদালত আদেশ দিলে কারাগারে গিয়ে জানা যায় বুলবুল উচ্চ আদালত থেকে উক্ত মামলায় জামিনে আছেন। আদালতে দাখিলকৃত কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের জনৈক জালাল/জামাল জঙ্গি নেতা বুলবুলের জিম্মাদার হয়েছেন। পরবর্তীতে সংিশ্লষ্ট থানার মাধ্যমে যাচাই করে দেখা যায় জামাল অথবা জালাল নামে গোবিন্দগঞ্জে কোন ব্যক্তি নেই। বিষয়টি বিজ্ঞ আদালতকে অবহিত করা হয়েছে। সূত্র : দৈনিক পূর্বেকাণ

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।