থমকে আছে জীবন

রাঙামাটি শহরতলির এক পাহাড়ের খাঁজে ছিল ‘কিনামনি ঘোনা’ গ্রামটি। এখন এর কোনো অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। গত ১৩ জুনের ভয়াবহ পাহাড়ধস পুরো গ্রামটিকে একরকম মাটিচাপা দিয়ে গেছে। গ্রামটির প্রথম বাসিন্দা কিনামনি চাকমাসহ ছয়জন নিহত হয়েছেন। আর বাড়িছাড়া হয়েছে গ্রামের ২২ পরিবারের সবাই। বিধ্বস্ত ঘরবাড়িগুলোর অংশবিশেষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।

‘কিনামনি ঘোনা’র মতো পরিস্থিতি পুরো রাঙামাটিতে। রাঙামাটি শহরের ভেদভেদী, নতুনপাড়া, যুব উন্নয়ন এলাকা, পশ্চিম মুসলিমপাড়ার বসতিগুলো এখনো ক্ষতবিক্ষত। শিমুলতলী, উলুছড়া, বিলাইছড়িপাড়া, বড়াদমসহ বিভিন্ন এলাকায় কেবলই ন্যাড়া পাহাড়। এসব পাহাড়ের খাঁজেই আগে ছিল বহু বাড়িঘর। জেলা প্রশাসনের হিসাবে, পাহাড়ধসে ১২০ জন প্রাণ হারানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৮ হাজার ৫০০ পরিবার। সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে ১ হাজার ২৩১টি বাড়ি, আংশিক বিধ্বস্ত বাড়ির সংখ্যা ৯ হাজার ৫০০। বাকিগুলো নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ধসের শিকার পরিবারগুলোর বেশির ভাগই এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছে। জীবিকা নেই, থমকে গেছে জীবন। যদিও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে খাবারের জোগান দিচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। এসব আশ্রয়হীন মানুষের পুনর্বাসনের কী হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি জেলা প্রশাসন। প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তহীনতা অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়েছে।

পাহাড়ধসের এক মাসেও জেলার যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক করা যায়নি। আদৌ তা আগের পর্যায়ে নেওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ আছে। সড়কপথে এখনো বাস-ট্রাক রাঙামাটি যেতে পারছে না। এক টনের বেশি ওজনের মালামাল পরিবহন এখনো বন্ধ রাখতে হয়েছে। রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কটিও এখন পর্যন্ত চালু করা যায়নি। ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম থেকে কোনো যাত্রী বা মালামাল রাঙামাটি পৌঁছাতে হলে শহর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরের ঘাগড়া পর্যন্ত গিয়ে অটোরিকশা, ছোট গাড়ি ও এক টনের কম ওজন পরিবাহী পিকআপে করে পৌঁছাতে হচ্ছে। সে ক্ষেত্রেও বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। শহরের ভেতরেও অনেক স্থানে রাস্তার অর্ধেক পর্যন্ত ধসে গেছে। পাহাড়ধসের পর কাপ্তাই হয়ে নৌপথে রাঙামাটিতে যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের এক বিশেষ সুযোগ তৈরি করা হয়। এখনো তা অব্যাহত আছে। তবে কাপ্তাইতেও এখন ভারী যানবাহন চলাচল সীমিত ও সংরক্ষিত করতে হয়েছে। কারণ, সেখানেও রাস্তাঘাটে কিছু বিপজ্জনক ফাটল সৃষ্টি হয়েছে।

কিনামনি ঘোনা এলাকার জীবন বসু চাকমা আশ্রয় নিয়েছেন ভেদভেদী পৌর উচ্চবিদ্যালয়ে। তিনি বলেন, দু-একটি বাড়িঘর ছাড়া তাঁর গ্রামের সবই শেষ। পশ্চিম মুসলিমপাড়ায় আবদুল আলম মামুনের সাতজন স্বজন হারানোর আহাজারি এখনো কমেনি। সেদিনের ঘটনা বর্ণনা করে মামুন বলেন, পাহাড়ধসের খবর শুনে বাড়ি থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তাঁরা। এমন সময় বাড়ির পাশে পাহাড়টি ধসে পরিবারের নয় সদস্য মাটিচাপা পড়েন। এর মধ্যে তাঁর বাবা মো. নবী হোসেন ও ভগ্নিপতি মোহাম্মদ হোসেন কোনো রকমে বের হয়ে এলেও বাকিরা কেউই বেঁচে নেই। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাবা নবী হোসেনও মারা যান।

মা ও বোনকে হারিয়ে এখনো বিহ্বল ভেদভেদী পৌর উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী লতিকা চাকমা। গতকাল সে বলে, পাহাড়ধসে তাদের বাড়িটি তছনছ হয়ে যায়। তার দেহের অর্ধেক মাটির নিচে আটকে যায়। চিৎকার করলে লোকজন তাকে উদ্ধার করে। পরদিন তার মা ও ছোট বোনের লাশ পাওয়া যায়। বাবা বাইরে ছিলেন।

আশ্রয়হীনদের কী হবে

আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা আশ্রয়হীন মানুষদের কী হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি জেলা প্রশাসন। রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) প্রকাশ কান্তি চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা স্থায়ী পুনর্বাসনের জন্য জায়গা খুঁজছেন। এখনো জায়গা পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত নন এমন লোকজনও আশ্রয়কেন্দ্রে আছেন বলে তাঁদের কাছে খবর আছে। অনেকের বাড়িঘর সম্পূর্ণ অক্ষত এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁরা নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন। কিন্তু আশ্রয়কেন্দ্রে এসে খাবার নিয়ে যাচ্ছেন। সে জন্য প্রশাসন স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা, সুশীল সমাজ ও জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত নির্ণয়ের জন্য কাজ করছে।

জেলা প্রশাসন ভাবছে, যাদের বাড়ি ও জায়গা বিধ্বস্ত হয়েছে কিন্তু অন্যত্র ভালো জায়গা আছে, তাদের বাড়ি নির্মাণ করে দেবে প্রশাসন।

কেন পাহাড়ধস

পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তিরাও এই অঞ্চলে এবারের মতো পাহাড়ধস দেখেননি। কী কারণে এমন ধস হলো—এ প্রশ্ন সবার। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড় কেটে বন উজাড় করে অবৈধ বসতি তৈরি এর বড় কারণ। জনবসতিহীন যে পাহাড়গুলোতে ধস হয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগেই ছিল সেগুনবাগান। আর কিছু ছিল আম-লিচু ও অন্যান্য ফলের বাগান। পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্রিটিশ আমল থেকে সেগুন বন করা হলেও এই গাছ ওই অঞ্চলের নিজস্ব (ইনডিজিনাস) গাছ নয়। যেসব পাহাড়ে সেগুনবাগান করা হয়, সেখানকার মাটিতে দূর্বাঘাসও জন্মায় না। আম-লিচুর বাগান করার জন্যও পাহাড় কাটা ও প্রাকৃতিক বন উজাড় করা হয়। ফলে অব্যাহতভাবে ওই সব পাহাড়ের মাটি ক্ষয় হতে থাকে এবং পাহাড়গুলো নাজুক হয়ে পড়ে। পাহাড়ধসের অরেকটি কারণ হিসেবে দায়ী করা হয় জুম চাষকে। কিন্তু রাঙামাটি সদর, বরকল, কাপ্তাই ও কাউখালী উপজেলায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, যেসব পাহাড়ে ধস হয়েছে তার মধ্যে জুম চাষের পাহাড়ের সংখ্যা সবচেয়ে কম। বলতে গেলে নগণ্য।

তবে পাহাড়ধসের আসল কারণ কী কী, তা নির্ণয় করা খুব জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় ব্যক্তিরা। ভয়াবহ দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ধসের কারণগুলো নির্ণয় করার কোনো বিকল্প নেই। সূত্র: প্রথমআলো

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।