পাহাড় প্রশ্নে সবাই মুসা ইব্রাহিম হলে হবে না

হয়ত ভাবছেন পর্বতারোহী মুসা আবার পাহাড়ে কি করল? মুসার সাথে পাহাড়ের কি সর্ম্পক? আমিও তাই ভাবতাম। কিন্তু যখন খবরে দেখি মুসা ইব্রাহিম হিংস্র আদিবাসীদের ভয়ে রয়েছেন দূর কোন এক অভিযানে গিয়ে তখন এর সর্ম্পক আমি খুঁজে পায়। আজকের মুসা এমনি এমনি নিশ্চয়ই হননি। তার পাহাড় উঠার স্বপ্ন নিশ্চয়ই শুরু হয়েছে আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম দিয়ে। কারণ দেশের কোথাও তো আর এত বড় বড় পাহাড় নেই, তাকে দূর, আরো উঁচু, পাহাড়ে উঠতে স্বপ্ন দেখাবে।
সেই থেকে তার পার্বত্য পাহাড়, পার্বত্য আদিবাসীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা থাকার কথা। পার্বত্য পাহাড়ে উঠতে নিশ্চয়ই কোন এক স্থানীয় পাহাড়ী তাকে সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু তিনি আদিবাসীদের চিনলেন ভয়ংকর হিংস্র প্রাণী হিসেবে। প্রকাশিত খবর মতে, তার সর্বশেষ অভিযানেও সঙ্গী ছিলেন একজন আদিবাসী নেতা।

“পার্বত্য পাহাড় আর আদিবাসীদের প্রশ্নে সবাই যেন মুসা ইব্রাহিম। পাহাড়কে ব্যবহার করেছে নিজের প্রয়োজনে। পাহাড়কে ব্যবহার করতে গিয়ে কেউ পাহাড়কে ভালবাসতে শেখেনি। পাহাড়কে জানার চেষ্টা করেনি।”


পাহাড়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কিংবা প্রভাব নিয়ে যারাই গিয়েছে পাহাড়কে নিজেদের প্রয়োজনে, নিজেদের মতো ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। নিজেদের ক্ষমতা আর প্রভাবকে পাহাড়ের প্রয়োজনে ব্যবহার করেছেন বলে স্থানীয়দের জানা নেই। পাহাড়কে যে যেভাবে পারে দখল করার চেষ্টা করা হয়েছে। পাহাড়ের মত রাখতে কাউকে কাজ করতে দেখা যায়নি। পাহাড়কে সবসময় ‘নগদ অর্থ’ চশমা দিয়ে ব্যাখা ও মূল্যায়ন করা হয়েছে। পাহাড়কে প্রাকৃতিক সম্পদ, দেশের মূল্যবান বনভূমি, স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থার ফল, স্থানীয় সংস্কৃতির ধারক ও বাহক (ভিলেজ কমন ফরেস্ট) হিসেবে দেখা হয়নি ।
যারাই গিয়েছে বনকে প্রাকৃতিকভাবে ফেলে রাখাকে আদিবাসীদের অজ্ঞতা, তারা বোকা, অলস, চালাক নয় ইত্যাদি বলার পাশাপাশি ভূমি সব খাস হিসেবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার ও উপস্থাপন করার মাধ্যমে বন ও পাহাড়কে তাদের স্ব স্ব স্বার্থে ব্যবাহারের জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন রাবার বাগান, সেগুন বাগান, কমলা বাগান, মিশ্র ফল, চা বাগান ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আমরা সকলে জানি রাবার বাগান আর সেগুন বাগানে কোন পশু পাখি থাকে না। সেখানে কোন ধরনের খাবার থাকে না বলে।
বন সৃষ্টির নামে প্রাকৃতিক বনগুলোকে ধবংস করা হয়েছে। প্রাকৃতিক বনগুলোকে ধবংস করতে জুম চাষকে দায়ী করে হাজার হাজার বনও পাহাড় নানা প্রভাবশালিদের নামে লিজ দেয়া হয়েছে সেকথা আমরা জানি। পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়ন নামে যত বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে সবই কমবেশি পাহাড়, বন আর স্থানীয়দের উচ্ছেদ করার প্রকল্পই বলা চলে। কাপ্তাই বাঁধও তার মধ্যে একটি।
পাহাড় পাহাড়ের মতো থাকুক, বন বনের মতো থাকুক, সেখানকার স্থানীয় আদিবাসীরা নিজেদের মতো করে বসবাস করুক এমন দৃষ্টিভঙ্গি নির্ভর উন্নয়ন কার্যক্রম আদো তিন পার্বত্য জেলায় কোথাও বাস্তবায়িত হয়েছে কিনা জানা নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামে বদলিকৃত সরকারি বড় বড় কর্মকর্তারা কতজন আদিবাসী বান্ধব, পাহাড়, বন আর ছড়া বান্ধব ছিলেন, আছেন খুঁজে পাওয়া ও কঠিন হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জুঁড়ে শত শত আসবারপত্র দোকান রয়েছে যেখান থেকে প্রতিদিন শত শত পরিবারের নামে আসবাবপত্র চলে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে আসলেই সবার মনে পড়ে যায় ‘সেগুন গাছের আসবারপত্র বানাতে হবে, থাকতে হবে’। আর আপনি যদি পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন চাকরিজীবি হন অনায়াসে এক ট্র্যাক সেগুন ফার্নিচার নিয়ে যেতে পারবেন। এই সব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করিনা।
প্রশ্ন করি একটাই জুমচাষ। জুমই পাহাড় ধবংস করে দিচ্ছে। এমনিতেই পার্বত্য চট্টগ্রাম জুঁড়ে এখন জুমচাষ তেমন একটা হয়না। ভূমি সব নানা প্রভাবশালীদের নামে দখল হয়ে গিয়েছে। না হয়ে থাকলে হয়ে যাচ্ছে। যেটুকু জুমচাষ হয় তা প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে হয়। তারা বছরে সময়ে সময়ে খাদ্যাভাবে মানবেতর জীবন যাপন করে তা আমরা সকলে জানি। বান্দরবান জেলায় থানচি উপজেলা আর রাঙ্গামাটি জেলায় বাঘাইছড়ি উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকাবাসীদের জন্য নতুন কিছু নয়। জুমচাষ সর্ম্পকে না জেনে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীদেরকে আরো প্রান্তিকতায় নিয়ে যাচ্ছি। আমরা সবাই একটি সহজ সরল কথাটি ভুলে যাই যে,

“বনও পাহাড় কখনো এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হয় না। ক্ষতিগ্রস্থ হয় ‘শিক্ষিত’ এবং ক্ষমতাবান লোকজনদের দ্বারা। যাদের জীবনে বন পাহাড় ও জুম সংস্কৃতির অংশ তারা ক্ষতি করতে পারে না, ক্ষতি করে না।”


আমাদের প্রশ্ন করা উচিত, কেন এতগুলো আসবারপত্রের দোকান, কারা তৈরী করছে, কারা নিয়ে যাচ্ছে? কেন পাহাড় কাটা হচ্ছে? কেন পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে? কেন রাবার বাগান, কেন সেগুন বাগান? কেন এত তামাকের চাষ? কেন এতগুলো ইট ভাটা?
রাঙ্গামাটি শহরে পাহাড় কেটে নির্বিচারে ঘর বানাবেন আর সেই পাহাড়ের চাপায় লোকজন মারা গেলে দোষরোপ করবেন জুমচাষকে তা হয় না। আমাদের পাহাড়, বন আর আদিবাসীদের জীবন পদ্ধতি বুঝা, উপলব্ধি করা আর বৈচিত্র্যপূণ সংস্কৃতির প্রতি ভালবাসাবোধের মধ্য দিয়েই পাহাড় বন রক্ষার কার্যক্রম শুরু হতে পারে।
মুসা ইব্রাহীমের মতো মন মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি, নীতিমালা, উন্নয়ন কর্মসূচী দিয়ে পাহাড় রক্ষা করা যাবে না। মুসা ইব্রাহিম পাহাড়কে ভালবাসতে শেখেননি। পাহাড়ে বসবাসকারী লোকজনদের শ্রদ্ধা করতে শেখেননি কিন্তু পাহাড়ে উঠা তার শখ। তাই তার প্রায় প্রতিটি অভিযানই প্রশ্নবিদ্ধ। তার প্রত্যেকটি অভিযান নিয়ে অনেক গল্প শুনা যায়। কিন্তু দেশের অন্যান্য অভিযাত্রীদের বেলায় তেমনটি শুনা যায় না। তাই পাহাড় বন উন্নয়নে পরিবেশকে বুঝেন, জানেন, ভালবাসেন এমন কর্মকর্তাদের কেবল পার্বত্য অঞ্চলে বদলি করা হোক।

লেখক: ঞ্যোহলা মং, উন্নয়নকর্মী ও ইউএন ইনডিজেনাস ফেলো। ইমেইল:[email protected]

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। পাহাড়বার্তার -এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য পাহাড়বার্তা কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

আরও পড়ুন
3 মন্তব্য
  1. Mohammad Borhan Uddin Rabbani বলেছেন

    মুসার পাহাড় জয় নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। তাই মুসা কে পহাড় জয়ী বলা য়ায় না। সে বিশ্ববাসীর সাথে প্রথারনা করেছে।

  2. বিজয় বলেছেন

    সুন্দর হয়েছে লেখাটি। ধন্যবাদ এইরকম সুন্দর লেখনীর জন্য।

  3. মংসাইউ বলেছেন

    ১০০% ঠিক

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।