বান্দরবানের বোমাং রাজপূণ্যাহ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা

হ্যালো হ্যালো ‘আমি রাজপূণ্যাহ উৎসবের নিউজ দেবো, একটু লিখবেন ….. … এভাবে ২০-২৫ বার ডায়াল করে সৌভাগ্যক্রমে লাইন পাওয়া গেলে সংবাদ দেওয়া হতো, অর্থাৎ রাজপূণ্যাহ্র সংবাদের শুরুর দিকটা ছিল সে রকমই। তারও আগে যখন কিন্তু যখন টেলিফোনের সুযোগও ছিল না, তখন লিখে ডাক বিভাগে পাঠানো হতো।
রাজপূন্যাহ্ দিনে প্রকাশিত ‘আজ শুরু হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বোমাং রাজপূণ্যাহ’ শীর্ষক সংবাদ এক সপ্তাহ আগে পাঠানো হতো। আবার রাজপূণ্যাহর উদ্বোধনি সংবাদ একই কায়দায় পাঠিয়ে এক সপ্তাহ পরে ছাপা হতো ছোট আকারে ভেতরের পাতায়। উৎসব আয়োজনের মত Hard News (যে সংবাদ তাৎক্ষণিকভাবে না জানলে পাঠকের আগ্রহ থাকে না তা সাংবাদিকতার ভাষায় হার্ড নিউজ বলা হয়) পাঠকের আগ্রহ হারানো Soft Dateline-এ পরিবেশন করা হলে সমাজে খুব বেশি প্রভাব বিস্তার হতো না। টেলিফোনের সুযোগ এসেও সংক্ষিপ্ত আকারে সংবাদ পাঠানো হতো পরের দিন প্রকাশের জন্য। খুব প্রভাবশালী সাংবাদিক না হলে টেলিফোনে সংবাদ পাঠানো সম্ভব ছিল না। কারণ টেলিফোনের বিলও ছিল প্রতি মিনিট ২৫-৩০ টাকা এবং তাও সকলের জন্য সহজলভ্য নয়।
কোনো ঘটনা ও ঐতিহ্যে সংবাদমূল্য থাকলে সাংবাদিকরা সংবাদ সংগ্রহে কোনো বাধা মানেন না। রাজপূণ্যাহ সেই রকম একটি ঐতিহ্য হওয়ায় সাংবাদিকরা সময়ের প্রেক্ষাপটে অনেক প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে সংবাদ প্রচার ও পরিবেশন করে আসছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বোমাং রাজা বাহাদুরও সংবাদ সম্মেলন করে রাজপূণ্যাহ অনুষ্ঠান সম্পর্কে তুলে ধরেন। বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে সংবাদ পরিবেশন ও সরাসরি উৎসব দেখানো খুব সহজ হলেও এখনও রাজপূণ্যাহ সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরার ক্ষেত্রে দৃশ্য-অদৃশ্য অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।
১৯৯৬-৯৭ সালের দিকে ফ্যাক্স আসে। কয়েকটি সরকারি কার্যালয়ে এবং সাপ্তাহিক সচিত্র মৈত্রীর সম্পাদক অধ্যাপক ওসমান গণি একটি ফ্যাক্স নিয়ে এসেছেন। তারপর শুরু হলো ফ্যাক্সে লাইনে দাঁড়ানো। এনালক ফোন লাইনে ২০-২৫ বার ডায়াল করলে একবার লাইন পাওয়া যায়। তবে এ ফ্যাক্স আসার পর থেকে রাজপূণ্যাহ সংবাদ পরিবেশনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। তখন স্থানীয় পত্রিকাগুলো রাজপূণ্যাহ নিয়ে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করতে থাকে। জাতীয় পত্রিকায়গুলোতেও গুরুত্বসহকারে সংবাদ পরিবেশন শুরু করে। তখন থেকে মূলত সারা দেশের মানুষ শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বোমাং রাজপূন্যাহ উৎসব সম্পর্কে জানতে পারে।
২০০৮ সালের ২৭ মার্চ পার্বত্য চট্টগ্রামে মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক আসার পর রাজপূন্যাহ উৎসবের প্রচার আরও প্রসারিত হয়ে যায়। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি সরাসরি অনুষ্ঠানও প্রচার করতে থাকেন। এখন সারা বিশ্বের মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অন্যান্য গণমাধ্যমে রাজপূণ্যাহ উৎসব উপভোগ করে থাকেন।

রাজপূণ্যাহ উৎসবের ইতিকথা ও গণমাধ্যমে গুরুত্ব :
কবি গুরু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর শিলাইদহে পূণ্যাহ উৎসব করতেন। পূণ্যাহ উৎসবে নারী-পূরুষ সামর্থ্য অনুযায়ি জমিদারির সবাই অংশগ্রহন করতেন। বিশেষ করে পূণ্যাহ মেলার আকর্ষণ বেশি ছিল সাধারণ মানুষের। জমিদারির উত্তরাধিকারের সঙ্গে এ উৎসবেরও তিনি উত্তরাধিকারি হয়েছেন। অর্থাৎ উপমহাদেশে বিশেষ করে অবিভক্ত বাংলার সামাজিক বিবর্তন ধারা থেকে উৎসারিত এ পূণ্যাহ উৎসব বহু আগে থেকে হয়ে আসছে। সামন্তস্তরে বিকশিত সমাজের সামন্ত প্রভুরা সামাজিক কল্যাণমূলক ভাবণা থেকে এ পূণ্যাহ উৎসবের প্রবর্তন করেছেন। তাঁদের মতে পূণ্যাহ অর্থ- ‘পূণ্যকর্ম বা পূণ্যের কাজ’। রাজা হচ্ছেন সৃষ্টিকর্তা বা ঈশ্বরের প্রতিনিধি। সাধারণের তাঁকে দেখলে পূণ্য। একটি নির্দিষ্ট দিনে খাজনা আদায়ের আনুষ্ঠানিক আয়োজনে রাজা বা জমিদার স্বয়ং উপস্থিত হন।
রাজার খাজনা আদায় এবং প্রজার রাজদর্শনের পূণ্যকর্মের এ আনুষ্ঠানিকতাকে ‘রাজপূণ্যাহ’ উৎসব বলা হয়। তবে এখন শুধু খাজনা আদায়ের ঐতিহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা হচ্ছে- রাজপূণ্যাহ। সামন্ত প্রধানরা কোথাও জমিদার, কোথাও রাজা, কোথাও নবাব বা নওয়াব নামে পরিচিত ছিলেন বিধায় উৎসবে নামকরণেও কোথাও শুধু ‘পূণ্যাহ’ এবং কোথাও রাজপূণ্যাহ ইত্যাদি নামে হয়েছে। বান্দরবানের বর্তমান বোমাং রাজপূণ্যাহও উপমহাদেশের রাজা-জমিদার-নবাবদের সম্প্রসারিত উত্তরাধিকারের ক্ষয়িষ্ণু বর্ণচ্ছটা। পশ্চাৎপদতার অমোঘ নিয়মে এখানে রাজপূণ্যাহ বিলম্বে এসেছে এবং ‘শেষ হইয়াও হইলনা শেষ’ অবস্থায় ‘ছোট প্রাণ, ছোট ব্যথা/ছোট ছোট দুঃখ কথা’ নিয়ে এখনো টিকে রয়েছে। আগের জৌলুস ও পূণ্য অর্জনের ধারণার বদল হলেও এটি শত বছরের ঐতিহ্য হিসেবে ঐতিহ্যপ্রিয় মানুষের কাছে এখনও সমাদৃত।
বিলম্বে এসেছে বলার কারণ হচ্ছে-বোমাং রাজপরিবারের ইতিহাসের কিছুটা জানা, কিছুটা অজানা আলো-আঁধারিতে বহু শতাব্দির হলেও বান্দরবানের ইতিহাস দীর্ঘদিনের নয়। বান্দরবানের বয়সেরও কম বয়সি বোমাং রাজপূণ্যাহ। ফ্রান্সিস বুকানন ১৭৯৭ সালে দক্ষিণ পূর্ব বাংলা ভ্রমনে এসে বোমাং রাজার কংহ্লাপ্রুর সঙ্গে সুয়ালকে (ভ্রমন কাহিনীতে সুলোক বলা হয়েছে) দেখা করেছিলেন। তিনি কয়েকজন কুকির (বর্তমানে বম,লুসাই,পাংখুয়া) সঙ্গেও দেখা করিয়ে দিয়েছিলেন। তখনও বান্দরবান বা মিয়কসে নামে কোনো কিছু ছিল না। বোমাং রাজপরিবার ১৮০৪ সালে বান্দরবানে বসতি স্থাপন করেছিলেন। ১৮২২ সালে ব্রিটিশ সরকারের কাছে বোমাং পরিবারের প্রধান বোমাং রাজা বা চীফ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন। তারও প্রায় ৫৩ বছর পরে ১৮৭৫ সালে বোমাং রাজপরিবার বান্দরবানে প্রথম রাজপূণ্যাহ আয়োজন করেছিলেন। সেই বছর পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রথম আদম শুমারিও হয়েছিল।

সেই আদম শুমারিতে চারটি সার্কেলে বিভক্ত বান্দরবানের জনসংখ্যা ছিল নিন্মরুপ :

সূত্র : উপজাতীয় গবেষণা পত্রিকা, ১ম ও ২য় সংখ্যা পুনঃমুদ্রণ, স্থানীয় সরকার পরিষদ, উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনষ্টিটিউট, রাঙ্গমাটি পৃষ্ঠা-২১২-২১৩
রাজপূণ্যাহ ১৮৭৫ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ১৪১ বছরের ঐতিহ্য। তবে ১৪তম বোমাং রাজা মং শৈ প্রু চৌধুরীর মৃত্যুতে রাজপদে শূণ্যতা সৃষ্টি হওয়ায় দুই বছর রাজপূণ্যাহ হয়নি। সেই জন্য এবারের ১৩৯তম রাজপূণ্যাহ বলে ১৭তম বোমাং রাজা উ চ প্রু চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন। প্রায় দেড়শত বছরের বিবর্তন ও বিবর্তিত সময়ের অভিঘাতে বেদনাক্লিষ্ট এ রাজপূণ্যাহর গণমাধ্যমের প্রশমন বটিকা নিয়ে লেখার জন্য প্রেসক্লাবের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বাচ্চু অনুরোধ করেছেন। বিষয়টি আমার মত কম জানা মানুষের জন্য কঠিন।
সমাজ বিজ্ঞানিরা বলে থাকেন, সময়ের চাহিদায় অভিযোজিত না হলে যেকোনো উৎসব-ঐতিহ্য অনুৎপাদনশীল সামাজিক জীর্ণ লোকাচারে পরিণত হয়। সেই জন্য প্রবাহমান সময়ের স্রোতধারায় বোমাং রাজপূণ্যাহকে মানুষের প্রেরণা উৎসারি উৎপাদনশীল অবস্থানে রাখা জরুরি। চলমান সময়ের প্রাগ্রসর গণমাধ্যমের ভূমিকা হচ্ছে-মানুষকে জানানো এবং মানুষের অভিজ্ঞান সম্প্রসারণ। রাজপূণ্যাহ উৎসবে ঘুণে ধরলে পরিচ্ছন্নতার জন্য জল সিঞ্চনের অপ্রিয় দায়িত্বও গণমাধ্যমের। গতানুগতিকতার অচলায়তনের কপাট খোলার অনুসন্ধিৎসা জাগাতে হবে ঐতিহ্যের মধ্যেও।
সাংবাদিকরা রাজপূণ্যাহকে সময়ের আয়নায় তুলে ধরার চেষ্টা করে থাকেন। নানা দিক থেকে বিচার-বিশ্লেষন করে এ দেশের মাটিজাত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে এ উৎসবকে দেশের সীমানার বাইরে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন। এ জন্য প্রতি বছর দেশি পর্যটকের পাশাপাশি রাজপূণ্যাহয় বহু বিদেশি পর্যটকেরও আগমন ঘটে। তবে বর্তমান সময়ের Impact Journalism-এর আলোকে রাজপূণ্যাহর শিকড় সন্ধানের সঙ্গে শিকড়ের মানুষের ইতিবাচক-নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে আলোকপাত করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। ইতিবাচক প্রভাবকে সময়ের চাহিদায় সৃষ্টিশীল ও উদ্ভাবনশীলতায় নিয়ে আসা এবং নেতিবাচক প্রভাব যদি থাকে সেগুলোর লাঘব করার দিকনির্দেশনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরা সম্ভব হলে রাজপূণ্যাহ প্রেরণা উৎসারি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হিসেবে আরও দীর্ঘজীবি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবে।

✿ লেখক – বুদ্ধ জ্যোতি চাকমা,জেলা প্রতিনিধি,দৈনিক প্রথম আলো,বান্দরবান।

লেখকের অনুমতিক্রমে রাজপূণ্যাহ ম্যাগাজিন থেকে লেখাটি প্রকাশ করা হলো।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।