মাদকাসক্ত পুলিশ সদস্যদের ‘ডোপ টেস্ট’, ২৬ জন শনাক্ত!

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও বিভাগের সন্দেহভাজন পুলিশ সদস্যদের ‘ডোপ টেস্ট’ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত একশ’ জন পুলিশ সদস্যের ডোপ টেস্ট করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৬ জন পুলিশ সদস্য মাদকাসক্ত বলে প্রমাণ পেয়েছে ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্স। কনস্টেবল থেকে এসআই পদমর্যাদার এসব পুলিশ সদস্যদের চাকরিচ্যুত করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম।

শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর মিরপুরে ট্রাফিকের উপ-কমিশনারের নতুন কার্যালয় উদ্বোধন করতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘আমাদের বিশ্বাস এভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারলে বাকিদের জন্য সুস্পষ্ট মেসেজ যাবে যে আমরা কাউকে ছাড় দেবো না। আমাদের এই উদ্যোগের ফলে অনেকে ভালো হয়েছে এবং এ রাস্তা ফিরে এসেছে। পুলিশ সদস্য যারা মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে বা মাদক ব্যবসায়ীকে সহযোগিতা করছে সরাসরি তাদের বিরুদ্ধে মামলা নিয়ে গ্রেফতার করা হচ্ছে। এ বিষয়ে কোনও রকম শিথিলতা দেখানো হচ্ছে না।’

ডিএমপি সূত্র জানায়, সম্প্রতি ডিএমপির হেডকোয়ার্টার্স থেকে প্রত্যেকটি ইউনিট ও বিভাগের উপ-কমিশনারদের চিঠি দিয়ে সন্দেহভাজন মাদকাসক্ত সদস্যদের তালিকা করতে বলা হয়। বিভিন্ন ইউনিট ও বিভাগের উপ-কমিশনাররা তালিকা পাঠালে তা যাচই-বাছাই করে ১০০ জনের সন্দেহভাজন একটি তালিকা তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে সন্দেহভাজনদের ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্সে ডেকে এনে তারা সত্যিই মাদকাসক্ত কিনা তার জন্য ডোপ টেস্ট করানো হয় ।

যোগাযোগ করা হলে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ডিএমপি কমিশনার হিসেবে যোগদানের পর ডিএমপির প্রত্যেকটি ইউনিট ও বিভাগে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে সকল সদস্যদের বলেছি কেউ যদি মাদকাসক্ত হয় তারা যেন আমার কাছে আসে, তাদের মাদকাসক্ত থেকে ফিরিয়ে আনতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করবো। কিন্তু স্বেচ্ছায় কেউ সাড়া দিয়ে আসেনি। এজন্য ডিএমপি থেকে উদ্যোগ নিয়ে ডোপ টেস্ট করানো হচ্ছে।’

ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘প্রথম দফায় একশ’ জনের ডোপ টেস্ট করানো হয়েছে। এক মাস পর আবারও বড় আকারে এই প্রক্রিয়া চালানো হবে। প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কেউ সন্দেহভাজন হলে তাদেরও ডোপ টেস্ট করানো হবে। আমি এক মাস সময় নিচ্ছি। কারণ কেউ যদি মাদকাসক্ত হয়েও থাকে, সে যেন নিজে নিজে উদ্যোগ নিয়ে মাদক থেকে বের হয়ে আসে। কিন্তু ডোপ টেস্ট করে ধরা পড়লে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

ডিএমপি সূত্র জানায়, ডিএমপির বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের অনেকেই নিজেরা মাদকাসক্ত হওয়ার পাশাপাশি মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলে আর্থিক সুবিধা নিয়ে থাকে। ডিএমপি হেড কোয়ার্টার্সের পক্ষ থেকে তাদেরও তালিকা করা হচ্ছে। মাদক সংক্রান্ত অপরাধে কোনও পুলিশ সদস্য জড়িয়ে পড়লে তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে। পুলিশের মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদের নির্দেশনায় পুলিশকে মাদকমুক্ত করার এই কর্মকাণ্ড শুরু করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, ডিএমপি কমিশনারের এই উদ্যোগের ফলে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে যারা প্রাথমিক পর্যায়ের মাদকাসক্ত ছিল তাদের অনেকেই মাদক থেকে বেরিয়ে আসছে। কিন্তু এখনও অনেকেই গোপনে মাদক সেবন করে থাকে। ডিএমপি কমিশনারের নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টেলিজেন্স এনালাইসিস ডিভিশন-আইএডি’র মাধ্যমেও সেইসব মাদকাসক্ত পুলিশ সদস্যদের তালিকা করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে তাদের প্রত্যেকই ডোপ টেস্ট করা হবে বলে জানায় ওই সূত্র।

ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্স সূত্র জানায়, ডোপ টেস্টে মাদকাসক্ত ধরা পড়া পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। বিভাগীয় মামলার মাধ্যমে আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের চাকরীচ্যুত করা হবে। ডোপ টেস্টে ধরা পড়া পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বেশিরভাগই থানায় কর্মরত ছিল। তাদের প্রত্যেকেই প্রাথমিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শনাক্ত হওয়া ২৬ জনের মধ্যে সার্জেন্ট একজন, এসআই ৪ জন, এএসআই ৩ জন, নায়েক একজন, ও কনস্টেবল ১৭ জন।

ডিএমপির একটি ক্রাইম বিভাগের উপ-কমিশনার বলেন, ‘কমিশনারের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কয়েকজনের তালিকা পাঠিয়েছিলাম। তাদের ডোপ টেস্ট করা হয়েছিল। কিন্তু ফলাফল আমার জানা নেই। এটি গোপনীয়তার সঙ্গে ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্সের পক্ষ থেকে করা হচ্ছে। যোগাযোগ করা হলে ডিএমপির উপ-কমিশনার (মিডিয়া) ওয়ালিদ হোসেন বলেন, ‘ডিএমপি কমিশনারের নির্দেশনা অনুযায়ী ইউনিট প্রধানরা সন্দেহভাজন পুলিশ সদস্যদের ডোপ টেস্ট করতে পাঠিয়েছিল। আমি আমার বিভাগ থেকেও কয়েকজন পাঠিয়েছিলাম। পুলিশের সদস্য যারাই মাদকাসক্ত হবে তাদের বিষয়ে কোনও ছাড় দেওয়া হবে না।’

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।