রিপোর্টার : যেনো এক খন্ড সাদা কাপড়

123o-copyএকজন রিপোর্টার কর্মক্ষেত্রে থাকাকালীন জীবন বাজি রাখতেও দ্বিধা করেনা। তখন নিজেদের পরিবার বলতে কিছু থাকেনা। গণমাধ্যমের অন্য দশজন কর্মী থেকে রিপোর্টার বা চিত্র সাংবাদিকের হিসেব ও মান অবশ্যই আলাদা। ইনারা মাঠে থাকেন, রোদ, বৃষ্টি, আগুন, বন্যা, ঝড়,গুলি সকল বিপদ সংকুল অবস্থায়ও চেষ্টা করেন সংবাদটি দেয়ার জন্য। কোন একটা ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে শেষ না হওয়া পর্যন্ত থাকেন ঘটনাস্থলেই।
যারা গণমাধ্যমের অফিসগুলোতে অন্য পদে কাজ করেন, তাদের অনেকেরই সুযোগ থাকে আট ঘণ্টা অফিস করার কিন্তু রিপোর্টার কোন একটা ঘটনায় আটকে গেলে অফিস টাইমের কোন হিসেব থাকেনা। কাউকে ছোট করছিনা, অনেক কাজ আছে অফিসে এসির মধ্যে বসে করলেও মাথা ঘামতে থাকে। যারা সিদ্ধান্ত নেন তাদের ঘাম আরো বেশি ঝড়ে। রিপোর্টার যেই সংবাদটিই পাঠাননা কেনো সেটির পরিবেশন কিন্তু নির্ভর করে ওই অফিসের পলিসির উপর। তবে দর্শককে ফাঁকি দেয়ার সুযােগ কিন্তু নেই। কারণ এক গণমাধ্যম গোপন করলেও অন্যটি কিন্তু বলবেই, লিখবেই, দেখাবেই। কেউই যদি না প্রকাশ করে তবুও লুকানোর সুযোগ নেই। কারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদান্যতায় সবাই সংবাদকর্মী। আর তাই সহজে তথ্য গোপনের অপচেষ্টা করেনা গণমাধ্যম। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে হলেও খবর আপনি পাবেনই।
একজন সৎ সংবাদকর্মী যদি উত্তরাধিকার সূত্রে পারিবারিকভাবে বেশ সচ্ছল ও বিত্তশালী না হন, বা তার যদি আয়ের অন্য কোন পথ না থাকে তবে শীর্ষ কোন পদে না যাওয়া পর্যন্ত তার অবস্থা থাকবে নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা ( নিম্ন মধ্যবিত্ত- মধ্যবিত্ত)। এর ব্যাত্যয় হলে অবশ্যই সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। যদিও সাধারণ মানুষের ধারনাটা আমাদের সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশী।

রিপোর্টারের মূল ক্ষমতা হচ্ছে সততা

মনে করেন ট্রাফিক পুলিশ পরিচিত কাউকে ধরলো… অবস্থা কিন্তু কাগজ থাকলেও ধরছি যখন কিছু টাকাতো নিতেই হবে? বাইক ওয়ালা দিলো তার সাংবাদিক বন্ধুটাকে কল। পুলিশ মহোদয় জানেন তিনি হারাম খাচ্ছেন, তাই রিপোর্টার কোন বিষয়ে মাথা ঘামিয়ে কেঁচো খুঁড়ে না সাপ বের করে? তাই বাইকটি ছেড়ে দিলো। বাইকওয়ালার নানার বাড়ি পর্যন্ত ছড়ালো অমুক রিপোর্টার খুব পাওারফুল!!
উল্টোটাও হয়!!
অসৎ সম্বাদিক (সাংবাদিক) মিয়া পুলিশ মামুর সাথে মিলে ভুঁড়িভোজও করতে পারেন। পেশাগত কারণেই রিপোর্টার, থানা-পুলিশ, হামলা-মামলা, দুর্ঘটনা- হাসপাতাল- মর্গ, সুখবর- মিষ্টি খাওয়া,দেশ- বিদেশের বিভিন্ন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী,পর্যবেক্ষক হন।
এতে অনেকের সঙ্গে সুসম্পর্কও যেমন হয়, খারাপ সম্পর্কও হয়। অনেক সময় ওই রিপোর্টারের সুসম্পর্কটিকেও কাজে লাগান অনেকে । ধরুন অমুকের শালার বন্ধুর গাড়িটির বৈধ কাগজ নেই বা গাড়িটি দুর্ঘটনার স্বীকার। পুলিশ থানায় নিয়ে গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো রিপোর্টার আব্দুলের পরিচয় আছে ওই জোনের ডিসির সাথে। বলা হল আব্দুল দেখতো? ওকে বস দেখছি।
এইবার ডিসির কাছে রিপোর্টার মহোদয়ের ধরণা, ভাই একটা ঝামেলায় পড়ছি। কি ঝামেলা?
আমার বড় ভাইয়ের গাড়ি…। এইরকম এইরকম অবস্থা, কি করা যায় একটু দেখেননা ভাই? সমাধান হল। রিপোর্টার মিয়া কিন্তু মান ইজ্জতসহ ধুলোয় মিশে গেলেন।
এইবার আরেক টাইপের কাহিনী বলি, হরতাল ডিউটিতে কোন এক পক্ষের দ্বারা আক্রান্ত সাংবাদিক। এইবার সম্বাদিক (সাংবাদিক) মহোদয় তার বসকে জানালেন!! ভাই আমাদের অবস্থা ভালনা! হ্যা!! কি বল? ক্যামেরা? ভাই, ঠিক আছে।ওকে। আগে ডাক্তার দেখাও, আমরা দেখতেছি। পরে আর খবর নেই। কখনো কখনো এরকম বাজে অভিজ্ঞতারও মুখোমুখি হন রিপোর্টাররা।
এর বিপরীতও আছে অনেক বেশী। নিশ্চই মনে আছে সংবাদ উপস্থাপক গোলাম রাব্বি ও এসাই মাসুদের কথা? অতি সম্প্রতি শাকিল আহমেদ ও তার সহকর্মী চিত্র সাংবাদিককে পুড়িয়ে মারার যে চেষ্টা হয়েছে। পপুলার হাসপাতালে অনৈতিক কাজের খোঁজ নিতে যাওয়ার পর সাংবাদিককে আটকে রাখা। এসবের পর নিজ নিজ অফিসসহ গোটা গণমাধ্যম এই কর্মীদের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কয়েক লাখ টাকা মূল্যের সরাসরি সম্প্রচারযন্ত্র হারিয়ে ফেলার পরও রিপোর্টারকে সন্তান স্নেহে আগলে রেখেছে তার অফিস। ভুলিনি সাগর রুনির হত্যাকাণ্ডের পর সংবাদকর্মীদের এক হওয়া। দেখেছি তিক্ততায় ভরা সেই বিভক্তিও (এটিই এ পেশার সবচেয়ে শক্তিশালি নড়বড়ে স্থান)। তারপরও একটা অদ্ভুত অজানা নেশায় ছুটে চলা। যে নেশায় বুঁদ হয়েছেন অগ্রজগণ,পথ দেখাচ্ছেন আমাদের। মানুষের ভালবাসা পাওয়া।
হাতে বুম কাঁধে ট্রাইপড দেখে যখন ছয় দাঁত পড়ে যাওয়া ,পান খাওয়া অক্ষম মানুষটিও বলেন… এই যে সাংবাদিক আইয়া পরছে এইবার ঠিক বিচার হবে। তখন নেশাটা আরও চড়ে যায়। মানুষের কণ্ঠস্বর হয় যখন গণমাধ্যম।। তখন গর্ব হয়। আমিও এ দলের একজন। কতিপয় বদলোক সব পেশাতেই থাকে, কলুষিত করে পবিত্রতা, এদের সংখ্যা কম। চিনে রাখুন, বয়কট করুন।
এই যে সারাদিন ছুটে চলা, এই ঘটনা, ওই ঘটনার খবর দেয়া। খাওয়া,ঘুম – আরাম হারাম করে ঘটনার সঙ্গে থাকা। কোথায় সুখবর, দুঃসংবাদ, সমস্যা, সম্ভাবনা খুঁজে বের করা, জীবনের ঝুঁকি নেয়া। এই সবের পরও কিন্তু পরিবার বলে একটা স্থান আছে।

এইবার বলি একজনের কথা
একজন রিপোর্টার, ছুটে বেড়ান সংবাদের পেছনে। মানুষের বিপদে আপদে তিনি সর্বদাই পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন। যতটুকু জানি তার সামনে অনুচিত কোন কথা বলে, অন্যায় কিছু করে সহজেই পার পাননি কেউই। সিনিয়র রিপোর্টার ও সংবাদ উপস্থাপক ওই ভাইটি এখন কারাগারে। তিনিও সংসার পেতেছিলেন।
যতটুকু জানি অন্য ধর্মের ওই মেয়েটি মেডিক্যালে শেষ বর্ষে পড়ে। ভালোবেসে বিয়ে করে সাংবাদিক কে। ঘর বাঁধতেই পরিবারের অমতে আইনিভাবেই ধর্ম পরিবর্তন করে সে। মেয়ের বাবা খুব ই প্রভাবশালী। তাদের বিয়ে, বয়স অনুযায়ী আইনগতভাবেই সম্পুর্ণ বৈধ। ফেসবুকে বিয়ের বিভিন্ন ছবি, ঘুরতে যাওয়া, হোটেলে খাওয়া ইত্যাদির ছবি আপলোড করেন দুজনেই।
অভিনন্দন ও শুভকামনায় ভরে যায় তাদের প্রোফাইল। মাসখানেক সময় ঢাকায় সংসার করার পর মেয়েটি পরীক্ষা দিতে ঢাকার বাইরে তার ক্যাম্পাসে যায়। মেয়ের বাবা মেয়েকে আটকে রাখেন। ফেসবুকের ছবি দিয়ে আইসিটি এক্টে মামলা দিয়ে জামাই বাবুকে কারাগারে পাঠান।
মাঠের রিপোর্টার এখন জেলে। কেউ কথা বলছেনা। মুখবন্ধ সবার। মনে হচ্ছে রিপোর্টার যেনো এক খন্ড সাদা কাপড়, দাগ লাগা যাবেনা। ভাইরে কেউ দাগ লাগালে কি হবে? এখানে তার ওপর বড় অন্যায় হয়েছে। প্লীজ একটু খোঁজ খবর নিন কিছু একটা করুন। সাংবাদকর্মী হিসেবে একটু পেশাগত সাম্প্রদায়িক হওয়ার আবেদন জানাচ্ছি ।

লেখক – শেখ জায়েদ
প্রতিবেদক ও সংবাদ পাঠক
নিউজ ২৪।

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। পাহাড়বার্তার -এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য পাহাড়বার্তা কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।