রুমায় তামাক ছেড়ে চীনা বাদাম চাষাবাদের হিড়িক

রুমার সাঙ্গু নদীর চরে আদিবাসী নারীরা দল বেধে ক্ষেতে বাদাম বীজ বপন করছে
এক সময় বান্দরবানের রুমা উপজেলার সাঙ্গু নদীর দুই পাড়ের চরের পুরোটা ছিল তামাক আর তামাকের চাষাবাদ। তবে তামাকের জায়গায় চাষিরা এখন চাষাবাদ করছে বাদাম। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে সবকিছু বদলাচ্ছে, চাষাবাদও পাল্টিয়েছে। বাদাম চাষের ফলন ও দাম, দুটোই ভালো। এ অবস্থায় বাদাম চাষাবাদের ঝুঁকছেন চাষিরা।
বান্দরবানের রুমা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের সূত্রমতে, এবার ২১০হেক্টর জমিতে চীনা বাদাম ইতোমধ্যে বীজ বপন হয়েছে। সামনে এপ্রিল মাসের মধ্যে হেক্টর প্রতি আড়াই মেট্রিক টন করে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে মোট ৫২৫মেট্রক টন বাদাম ফলন। যা দুই বছর আগের তুলনায় দ্বিগুন উৎপাদন হবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী সাম্মাঝিরিঘাট, গংগা পাড়া, মংশৈপ্রূ পাড়া, সেগুন খামার, আবাসিক ঘাট, নামী পাড়া, পলি পাড়া, উপজেলা পরিষদঘাট, রুমা বাজারঘাট ও স‘মিল এলাকাসহ বিস্তীর্ণ এলাকা জুঁড়ে চীনা বাদাম চাষ চলছে। কেউবা বাদাম চাষের জমি নিরানী দিচ্ছে, আগাছা পরিস্কার করতে ব্যস্ত কেউ। ক্ষেতে দলবেধে বীজ বপন করতে দেখা যায়। তাছাড়া রুমা সদর থেকে সাঙ্গু নদীর উজানে নদীর তীরবর্তীর থানা পাড়া, রুমাচড় পাড়া, পলিকা পাড়া, পর্যটন স্পট রিঝুক এলাকায়, কোলাদি পাড়া, পান্তলা পাড়া, ক্রাউদাংঘাট, বাচারদেও পাড়া, গালেঙ্গা বাজার থেকে বলীবাজার সীমানা পর্যন্ত বস্তীর্ণ এলাকায় চোখ যতদুর যায়- বাদাম আর বাদাম।
খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে,সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী ছাড়াও রুমাখাল ও পাইন্দু খাল জুঁড়ে চলছে চীনা বাদাম চাষ। এসব জায়গায় কোথাও বীজ বপন আর কোথাও গাছের গোড়ায় মাটির তলে বাদাম বীজ উৎপন্ন শুরু হয়ে গেছে।
রুমা সদরঘাট এলাকায় বাদাম ক্ষেতে মই টেনে ক্ষেত লেভেল করছিলেন চাষি মংচিংখয় মারমা(৩৭)। তবে গরু দিয়ে নয়, মইয়ে বসেছিল তার মেয়ে।
তিনি জানান, স্ত্রীসহ এক ছেলে ও এক মেয়ে মোট পরিবারে সদস্য চারজন। সে এবার সাড়ে তিন একর জমিতে বাদাম লাগাচ্ছেন। এবার বীজ বাদাম প্রতিমণে সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা। যা গত বছর ছিল-চার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা।
বাদাম চাষি উক্যনু মারমা সদর ইউনিয়নের আমতলি পাড়ার বাসিন্দা। তিনি বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরে তামাক চাষ করে আসছিলাম, গত বছরও জমি অর্ধেক অংশ করেছি। প্রতিবারে ফলন তুলে কোম্পানির লোকজনের সঙ্গে হিসাবে গেলে কম বেশি লোকসান গুনতে হয়, তাই এবার তামাক ছেড়েছি। এক ফসলের জন্য ৩৫হাজার টাকায় তিন একর জমি বর্গা নিয়ে এবার চীনা বাদাম চাষ করছি।
এভাবে তামাক ছেড়ে বাদাম চাষে ঝুঁকছেন গংগা পাড়ার চাষিরা। স্থানীয় চথোয়াইপ্রূ মারমার ভাষ্যমতে, ওই এলাকায় আলাদা আলাদা মালিকানায় ২১একর সব ক্ষেত জমিতে ১৪ পরিবার বাদাম আবাদ করছেন। এখানে আর কেউ তামাক চাষ করছেন না।
পাইন্দু ইউপির সাবেক সদস্য চাষি চাইখ্যউ মারমা সাঙ্গু নদীর চড়ে বাদাম চাষাবাদের কথা বলতে গিয়ে বলেন, এলাকায় কোথাও কোনো তামাক ক্ষেত পাবেন না। আমতলি, বাগান পাড়া ও পাইন্দু খাল এলাকার জমিগুলোতে চাষিরা সবাই এ সময়ে চীনা বাদাম চাষাবাদ করছে।
পাড়া প্রধান মংশৈ প্রু কারবারী জানান, তামাক চাষে সবসময় লেগে থাকতে হয় আর পরিশ্রমও বেশি। তবে সে তুলনায় বাদাম চাষ সহজ, এর পাশাপাশি স্বাস্থ্য ঝুঁকিও নেই।
ব্যবসায়ীরা জানায়, মার্চ -এপ্রিল মাসে বাজারে বাদাম ফলন কেনা-বেচা হয়। তখন কেজি প্রতি ৬০ থেকে ১১০টাকায় কিনেন তারা। তবে মার্চে প্রথম সপ্তাহ যেসব বাদাম ফলন বেচা-কেনা করবে, তারা দাম পাবে- বেশি। এপ্রিলের শেষ দিকে বৃষ্টি পানি লাগলে ফলনে কালো দাগ হয়।
রুমা বাজারে কাচামাল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আউয়াল বলেন, এখন চাষিদের চড়া সুদে দাদন দেয়া হয় না। ২০জনকে কাঁচামালের অগ্রিম টাকা দেয়ার কথা জানিয়ে আউয়াল বলেন বাদাম ফলন তোলার সময় চলমান দর থেকে প্রতিমণে দেড় থেকে দুইশ টাকা কমে দেবে এ শর্তে কাচামাল পাইতে অগ্রিম টাকা দিয়ে রেখেছি।
উপজেলা সহকারি কৃষি উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইউসুফ মিয়া জানান, এবার ২৩১জন চাষি ২১০হেক্টর জমিতে চীনা বাদাম আবাদ করছে। যা লক্ষ্যমাত্রা প্রতি হেক্টরে দুই থেকে আড়াই মেট্রিক টন উৎপাদন হবে। বাদাম ফলন ভাল পেতে উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তারা চাষিদের পরামর্শ ও সার্বিক তত্ত¡বধানে রয়েছেন। এসব বাদাম ফলন বিক্রি করে চাষিরা আর্থিকভাবে লাভবান হবে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।