রেলের ‘রাজা’ সিরাজ

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সদর দপ্তর চট্টগ্রামের সিআরবিতে ঢুকলেই চোখে পড়ে সারি সারি রঙ-বেরঙের ব্যানার- পোস্টার। এসব ব্যানার-পোস্টারে শোভা পাচ্ছে একজনের ছবি। তিনি সিরাজুল ইসলাম, রেলওয়ে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক। সিরাজের দাপট যেমন ব্যানার-পোস্টারে, তেমনি কাজেকর্মেও স্পষ্ট। নিয়োগবাণিজ্য, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি, কথায় কথায় কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করাসহ এমন কোনো কাজ নেই, যা তিনি করছেন না। অফিস চলাকালে দলবল নিয়ে ঘুরে বেড়ান, আতঙ্ক ছড়ান। এরই মধ্যে বনে গেছেন কোটিপতি। তার আছে ছয়তলা আলিশান বাড়িও।

সর্বশেষ গত ৬ জানুয়ারি বান্দরবানের পর্যটনকেন্দ্র মেঘলায় বেড়াতে গিয়ে মদ পান করে সেখানকার জেলা প্রশাসক, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের লাঞ্ছিত ও নাজেহাল করে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন সিরাজুল ইসলাম। সিরাজ ও তার অনুসারী রেল শ্রমিকরা দিনে সরকারি কর্মকর্তাদের নাজেহাল করে রাতে বান্দরবান থেকে চট্টগ্রামে ফিরে রেলস্টেশনে ব্যাপক ভাংচুর করেন। এতকিছুর পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে প্রভাবশালী এই শ্রমিক নেতা।

রেলের তহবিল শাখার হিসাব নিরীক্ষক হলেও শ্রমিক নেতা হওয়ায় কোনো কাজ করেন না সিরাজুল ইসলাম। শুধু তিনি নন, তার ‘সাঙ্গপাঙ্গ’ অনেক শ্রমিক-কর্মচারীও কাজ করেন না।

অফিস সময়ে দলবল নিয়ে সিআরবিতে এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ঘুরে বেড়ান। তার ভয়ে তটস্থ থাকেন সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ২০১৫ সালে রেলের সিনিয়র ওয়েলফেয়ার অফিসার লুৎফর রহমানকে অফিসে ঢুকে প্রকাশ্যে মারধর করেন সিরাজ। অনুসারী এক কর্মচারীকে বদলি করায় ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটান তিনি। এর কিছুদিন পর সিআরবির চিফ কন্ট্রোলার অব স্টোর থাকাকালে ফের ওই কর্মকর্তাকে মারধর করেন তিনি। গত বছর রেলের পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে রমজান আলী নামে এক কর্মকর্তাকে বিলবোর্ড উচ্ছেদ নিয়ে হত্যার হুমকি দেন সিরাজ। মনোরঞ্জন নামে এক কর্মচারীকে বদলি করায় রেলের উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) জোবেদা আকতারকে অবরুদ্ধ করে রাখেন তিনি। এভাবে বিভিন্ন সময় তার হাতে লাঞ্ছিত হন অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী।

সিরাজের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। ১৯৭৮ সালে রেলের চাকরিতে যোগ দেন। ১৯৮০ সালের দিকে জাতীয় শ্রমিক লীগের আওতাধীন বাংলাদেশ রেলওয়ে শ্রমিক লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। গত কয়েক বছরে সরকারি দলের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ নিয়ে রেলের নিয়োগবাণিজ্য, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি করে কোটিপতি বনে গেছেন। বিশেষ করে নিয়োগ কেলেঙ্কারির হোতা হিসেবে পরিচিত পূর্বাঞ্চল রেলের সাবেক জিএম ইউসুফ আলী মৃধার সঙ্গে সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে ‘দুষ্কর্মে’ নিরঙ্কুশ আধিপত্য গড়ে তোলেন। নগরীর আকবর শাহ রেলওয়ে হাউজিং সোসাইটি এলাকায় (সড়ক নম্বর- ৩, বাড়ি নম্বর- ১১) সিরাজের রয়েছে একটি আলিশান ছয়তলা ভবন। নিজ এলাকা লক্ষ্মীপুরেও নামে-বেনামে আছে বিপুল সম্পত্তি।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রমিক লীগ নেতা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘রেলের জায়গা ভাগে পেয়ে সেখানে অনেক আগে বাড়ি করেছি। যেহেতু সংগঠন করি, তাই অনেক লোকজন চাকরিসহ বিভিন্ন কাজের জন্য আসেন। তাদের সহযোগিতার চেষ্টা করি। কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার বিষয়টি সত্য নয়।’

সিআরবি এলাকায় বেশ কিছু শ্রমিক-কর্মচারী নিয়ে চলাফেরা করেন সিরাজ। রেলের সিসিএম অফিসের সহকারী অলিউল্লাহ সুমন, সিসিএম অফিস সহকারী সুজন, সিওপিএস অফিস সহকারী সাহেল, পাহাড়তলী ওয়ার্কশপের খালাসি রিয়াজ, পাহাড়তলী ওয়ার্কশপ ফিটার (ক্যারেজ) আরিফুর রহমান, শফিক, টিএ ব্রাঞ্চের কর্মচারী রাইসুল ইসলাম, আরএনবির হাবিলদার হাফিজ, সিআরবির ডিএসটি শাখার কর্মচারী জামাল উদ্দিন, সিআরবি হাসপাতালের স্টুয়ার্ট (ইনডোর) মিজানুর রহমান, পাহাড়তলী ওয়ার্কশপের পেইন্টার রিয়াজ তালুকদার, ইলেকট্রিক বিভাগের কর্মচারী শাহজাহানকে কাজ না করে প্রায় সময় সিরাজের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।

সম্প্রতি বান্দরবানের পর্যটনকেন্দ্র মেঘলায় পিকনিকে যান সিরাজসহ রেলওয়ে শ্রমিক লীগের নেতাকর্মীরা। তখন মেঘলায় পর্যটনের দুটি স্থাপনা উদ্বোধন করা হচ্ছিল। অনুষ্ঠানে ছিলেন বান্দরবানের জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক, বান্দরবান সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুজন চৌধুরী ও পাঁচজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ কয়েকজন সংবাদকর্মী। এ সময় সিরাজসহ উচ্ছৃঙ্খল কিছু শ্রমিক মদ্যপ অবস্থায় নারীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন। তাদের নিবৃত্ত করতে জেলা প্রশাসকসহ কর্মকর্তারা এগিয়ে এলে তাদের নাজেহাল করা হয়। এ সময় ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) শামীম আহমেদ আহত হন। এ ঘটনার জের ধরে ওই দিন রাতেই তারা চট্টগ্রামে ফিরে রেলস্টেশনে ব্যাপক ভাংচুর করেন। ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করেন।

বান্দরবানের জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক বলেন, ‘পিকনিকে এসে রেল শ্রমিকরা মদ পান করে মাতলামি করছিলেন। নারীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করছিলেন। এমনকি ম্যাজিস্ট্রেটদের ওপরও চড়াও হন তারা। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের শাস্তি দিতে পারতাম। কিন্তু তা না করে তাদের গাড়িতে তুলে দিয়েছি।’

এ ব্যাপারে সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বান্দরবানে পিকনিকে গিয়েছিলাম। সেখানে জেলা প্রশাসনের লোকজন ও পুলিশ আমাদের মারধর করেছে। মদপান ও মাতলামি করার বিষয়টি ভিত্তিহীন। তাছাড়া ঘটনাটি ভুল বোঝাবুঝি থেকে হয়েছে। তার পরও তারা সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় বিষয়টি মিটমাট করে ফেলেছি।’ সূত্র : সমকাল

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।