লামায় তীব্র শীতে কষ্টে আছে মানুষ

শীতবস্ত্রের বরাদ্দ কম

NewsDetails_01

বান্দরবান জেলার লামা উপজেলায় জেঁকে বসেছে হীম হীম শীত। গত কয়েক দিন ধরে সন্ধ্যার পর থেকে ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায় উপজেলার প্রত্যন্ত পাহাড়ি পল্লীগুলো। আর সেটি অব্যাহত থাকে সকাল ১১টা থেকে দুপুর পর্যন্ত। কোন কোন সময় সারা দিনেও সূর্যের দেখা মেলে না। শীতের এ তীব্রতায় উপজেলার দুস্থ ও শ্রমজীবী মানুষের জবুথবু অবস্থা বিরাজ করছে। আবার শীতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শীতজনিত রোগের প্রাদুর্ভাবও। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা।

দরিদ্র সীমার নিচে বসবাসকারী এখানকার অধিকাংশ অধিবাসীরা প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্রের অভাবে রয়েছেন অতিকষ্টে। শীত নিবারণের জন্য দুর্গম পাহাড়ে বসবাসরতরা খড়কুটো দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করে যাচ্ছেন বয়োবৃদ্ধ ও শিশুরা। আবার কেউ কেউ গরম কাপড়ের দোকানে দিকে ভিড় জমাচ্ছেন।

এদিকে উপজেলার ১টি পৌরসভা ও ৭টি ইউনিয়নে শীতার্তদের জন্য সরকারীভাবে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৭০টি কম্বল। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগন্য। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বেসরকারী সংস্থা মেজিকেল লাইট ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ১৮০জন ও পার্বত্য নাগরিক পরিষদের পক্ষ থেকে ৩হাজার ৭০০জনকে শীত বস্ত্র দেয়া হয়। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর বাহাদুর ঊশৈসিং এমপি’র সহ ধর্মীনি মেহ্লাপ্রু মার্মা ও পৌরসভা মেয়র মো. জহিরুল ইসলাম নিজ উদ্যোগে মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করেন। দুস্থ ও শ্রমজীবী মানুষ জনের শীতের কষ্ট লাঘবে গরম কাপড় নিয়ে এগিয়ে আসতে বিভিন্ন সংস্থা ও সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহল।

সূত্র জানায়,লামা উপজেলার জনসংখ্যা প্রায় দুই লাখ। এদের মধ্যে প্রায় ১৫-২০হাজার মানুষ দারিদ্র। গত মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে উপজেলায় শীতের তীব্রতা শুরু হয়। আস্তে আস্তে এ তীব্রতা বেড়ে চলেছে। সমতলের চেয়ে পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এখানে শীতের তীব্রতা একটু বেশি অনুভুত হয়। সারা দিন শীত ও কুয়াশা অব্যাহত থাকার কারণে নিম্ন আয়ের পাথর শ্রমিকরা কাজে বের হতে পারেন না। এছাড়া বাগান এলাকায় কর্মরত শ্রমিকরাও দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। ঠান্ডা বাতাসের কারণে ছোট ছোট শিশু ও বৃদ্ধরা নিউমোনিয়া ও কাশিসহ ঠান্ডাজনিত রোগে ভুগছে। শীত নিবারনে এ পর্যন্ত সরকারীভাবে পৌরসভা এলাকার জন্য ৮৭০টি ও ৭টি ইউনিয়নের জন্য ৬ হাজার ২০০টি কম্বল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট জানিয়েছে।

এদিকে কুয়াশার কারণে বিশেষ করে রাতের বেলা ও ভোর বেলায় লামা-চকরিয়া সড়কে যান চলাচল ব্যহত হচ্ছে। ঘন কুয়াশায় আচ্ছাদিত সড়কে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে যানবাহন। জীপ চালক ওসমান গনি শিমুল, সামছুল আলম সহ আরো অনেকে জানায়, সকাল ১১টা পর্যন্ত লামা-চকরিয়া সড়কের কয়েকটি এলাকা কুয়াশায় ঢেকে থাকে। অনেক সময় গাড়ির সামনে হেড লাইট জ্বালিয়েও ১৫-১৬ ফুটের বেশি দেখা যায় না।

এখানকার খেটে খাওয়া মানুষগুলো জানান, প্রচন্ড শীতের তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। পাহাড় থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করে জ্বালিয়ে আগুনে শরীর ছেঁকে শীত নিবারণের চেষ্টা করেন তারা।

NewsDetails_03

লামা সদর ইউনিয়নের ছোট বমু হেডম্যান পাড়া ও গজালিয়া ইউনিয়নের কুলাইক্লাপাড়ার নারীরা বলেন, আমাদের পাড়ার সবাই গরিব। চাহিদামতো শীতের কাপড় কেনা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সরকারিভাবে যদি আমাদেরকে কম্বল দিয়ে সহায়তা করা হয় তাহলে ভালো হতো।

পাহাড়ি নারী মাসাছিং মার্মা, হ্লামাউ মারমা, উমে মারমা বলেন, অন্যবারের চেয়ে এ বছরে বেশি শীত পড়ছে। শীত থেকে রক্ষা পেতে আমরা আগুন জ্বালিয়ে তাপ নিচ্ছি। আমাদের গরম কাপড় যা আছে, তা দিয়ে শীত ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। তীব্র শীতের কারণে দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হওয়ায় পরিবার-পরিজনের খাদ্য যোগান দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে দুস্থ ও শ্রমজীবী মানুষদের।

সরেজমিন উপজেলা শহরসহ বিভিন্ন বাজারঘুরে দেখা যায়, পুরানো কাপড় নিয়ে ব্যবসায়ীরা পসরা সাজিয়ে বসেছে। খোলা আকাশের নিচে প্রায় অর্ধ-শতাধিক শীতবস্ত্রের দোকান আছে। এসব দোকানে খুচরা মূল্যে পুরানো শীতবস্ত্র কাপড় বিক্রিতে ধুম পড়েছে।

বাজারের কাপড় ব্যবসায়ীরা জানায়, গত কয়েকদিন ধরে হাড়ভাঙ্গা শীত পড়ছে। অনুভূত হচ্ছে হিমেল হাওয়া ও ঘন কুয়াশা। গত বছরের চেয়ে এ বছর পুরনো কাপড় বেচাবিক্রি ভালো।

রুপসীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ছাচিংপ্রু মার্মা বলেন, আমার ইউনিয়নের জন্য ৮০০পিস কম্বল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বরাদ্দকৃত কম্বলের চেয়ে ইউনিয়নে দু:স্থ ও গরীব মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। তাই ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে কিছু মানুষের মাঝে শীত বস্ত্র বিতরণ করেছি।

এ বিষয়ে লামা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মজনুর রহমান বলেন, চলতি শীত মৌসুমে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভান্ডার থেকে ৭ হাজার ৭০০টি কম্বল বরাদ্দ দেয়া হয়। ইতিমধ্যে এসব কম্বল ইউনিয়ন ও পৌরসভা কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তরও করা হয়েছে।

এদিকে লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক মোহাম্মদ রোবীন বলেন, শীতজনিত কারণে বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা ডায়রিয়া, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হচ্ছে। গত এক সপ্তাহে দুইশ’র বেশি শিশু ও বয়স্ক মানুষ ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন বলেও জানান এ চিকিৎসক।

আরও পড়ুন