লামা-আলীকদমে তামাক চাষে অতিরিক্ত কীটনাশক : বিলুপ্ত হচ্ছে কীটপতঙ্গ

লামা-আলীকদমে তামাক চাষে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করছে কৃষক।
বান্দরবানের লামা, আলীকদম এবং কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বমুবিলছড়ি এলাকার প্রতি বছরের মতো এবছরও প্রায় দশ হাজার একর ফসলি জমিতে চলতি মৌসুমে ক্ষতিকর তামাক চাষ করা হয়েছে। আর এ তামাক ক্ষেতে রোগবালাই দমনের জন্য ব্যবহার হচ্ছে মাত্রাঅতিরিক্ত সার ও উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন নানা প্রকার কীটনাশক। এর ফলে একদিকে যেমন জমির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে তামাক চাষীসহ জমির উপকারী কীটপতঙ্গ ও নদীতে মাছের প্রজনন বিলুপ্ত হতে চলছে।
সূত্র জানায়, অধিক তামাক ফলনের আশায় চাষীরা বীজতলা তৈরি থেকে শুরু করে তামাক পাতা তোলার সময় পর্যন্ত মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে থাকে। খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত জমির চেয়ে তামাকের জমিতে আট গুণ বেশি সার ও কীটনাশক ব্যবহার করে চাষীরা। ব্যবহৃত সারের মধ্যে ইউরিয়া, ফসফেট, বোরণ, দস্তা, ম্যাঙ্গানিজ ও পটাসিয়াম সালফেট অন্যতম। স¤প্রতি তামাকের জমিতে আগাছা না জন্মানোর জন্য ব্যবহারিত বিশেষ কীটনাশক মাটির ব্যাপক ক্ষতি করে চলেছে। এসব ব্যবহারের ফলে মাটির উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো মরে গিয়ে মাটি ক্রমশ শক্ত হয়ে মাটির পানির ধারণ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, মাত্রাতিরিক্ত সার প্রয়োগের পাশাপশি কৃষকেরা তামাকের ক্ষেতে অতিরিক্ত ম্যাগনেশিয়াম, জিংক এবং অতিরিক্ত সালফার প্রয়োগ করছে। এছাড়া এম.ও পির পরিবর্তে এসওপি (সালফেট অব ফটাশ) মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগ করছে। এর ফলে ফসলী জমির মাটির মুখ্য এবং গৌন বিভিন্ন উপাদান নষ্ট হয়ে প্রকৃত শক্তি হারাচ্ছে।
এ বিষযে লামা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. নুরে আলম বলেন, আগাছা দমনে ব্যবহৃত কীটনাশকের কারনে তামাক পরবর্তী ফসলে স্বাভাবিক গ্রোথ হয় না। এ ধরনের কীটনাশক ব্যবহার না করার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেয়া হলেও কৃষকেরা শুধুমাত্র লেবার খরচ কমানোর জন্য কীটনাশক ব্যবহার করে থাকেন। তিনি আরও বলেন, তামাক ক্ষেতে জৈব সার ব্যবহার না করে শুধুমাত্র রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারনে জমির প্রকৃত শক্তি নষ্ট হয়ে দিন দিন জমি উর্বরতা হারাচ্ছে।
সরজমিন আলীকদমের চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের ফুটেরঝিরির একটি তামাক ক্ষেতে গিয়ে দেখা গেছে, তামাক চাষী জাহাঙ্গীর খলি শরীরে ক্ষেতে কীটনাশক স্প্রে করছে। শুধু কৃষক জাহাঙ্গীর নয়, উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কীটনাশকের বেশির ভাগই কৃষকেরা ঝুঁকিপূর্ণভাবে জমিতে স্প্রে করে। স্প্রে ম্যানকে কীটনাশক প্রয়োগের সময় নোজ, মাস্ক, ফেইস মাস্ক, চশমা, ও ক্যাপ ব্যবহার করা এবং শরীরে মোটা কাপড় পরিধান করার নিয়ম থাকলেও এখানে তা করা হচ্ছে না। বরং অনেকে অনাবৃত শরীরে আবার কোথাও কোথাও শিশুরা পর্যন্ত অসচেতনভাবে কীটনাশক স্প্রে করছে। অপরিকল্পিতভাবে কীটনাশক স্প্রে করার কারণে এসকল কীটনাশক কৃষকের শ্বাস-প্রশাসের সাথে শরীরে প্রবেশ করে কৃষকেরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
এ বিষয়ে লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক মো. শফিউর রহমান মজুমদার জানিয়েছেন, খালি শরীরে স্প্রের কারণে কীটনাশক মানব দেহে প্রবেশ করলে তার ক্ষুধা মন্দা, চোখের ক্ষতি, এবং শ্বাস-কষ্ট, বমি বমি ভাব হতে পারে। এছাড়া এর ফলে য²া এবং ফুসফুস ক্যান্সার, হাঁপানিসহ জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার শতভাগ সম্ভবাবনা রয়েছে।
একটি বেসরকারি সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, তামাক চাষে ব্যবহৃত অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের ফলে শুধুমাত্র মানুূষ ও মাটির ক্ষতি হচ্ছে না। পাশাপাশি পশু, পাখি ও জলাশয়ের মৎস্য সম্পদও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। ব্যাপক তামাক চাষের কারণে বর্তমানে এলাকায় গো খাদ্যেরও তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়েছে। জমিগুলোতে প্রয়োগকৃত মাত্রাতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের পুরাটাই মাটি অল্প সময়ে গ্রহণ করতে পারে না। এছাড়া উৎপাদিত তামাকের মূল গাছ এবং এর আংশিক পাতাসহ কৃষকেরা মাটির সাথে মিশিয়ে ফেলে। পরবর্তীতে বিষাক্ত কীটনাশক মিশ্রিত জমির এসকল ঘাস খেয়ে গরু, ছাগলসহ বিভিন্ন গবাদি পশু পেটের পীড়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে।
এছাড়া তামাক খেতে প্রচুর পরিমাণে উচ্চ মতাক্ষসম্পন্ন কীটনাশক ব্যবহারের ফলে নানা ধরনের কীটপতঙ্গ, পশু পাখি বিলুপ্ত হচ্ছে। তামাকের জমিগুলোতে অতিরিক্ত বিষ প্রয়োগের ফলে শস্য পরাগায়নকর্মী হিসেবে খ্যাত প্রজাপতির বংশধর, মৌমাছি, ঘাস ফড়িং, ব্যাঙ ও কেঁচোরমত হাজার উপকারী প্রাণী এতদাঞ্চল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে তামাকের জমির বর্জ্য বৃষ্টিতে ধুয়ে উপজেলা দুটির ওপর দিযে বয়ে চলা মাতামুহুরী নদীতে গিয়ে পড়ে। এতে নদীর পানি বিষাক্ত হয়ে পানি ব্যবহারকারী এবং নদীতে গোসলকারী স্থানীয় বাসিন্ধারা চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
এ বিষযে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জিয়া উদ্দিন জানান, বৃষ্টির পানির সাথে তামাক ক্ষেতে প্রয়োগকৃত বিষাক্ত কীটনাশক নদীর পানিতে মিশ্রিত হওয়ার কারণে নদীর মাছের প্রজনন কমে যাচ্ছে।
লামা ও আলীকদমের আবাদী ফসলী জমিগুলোতে ক্ষতিকর তামাক চাষে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের পরিবর্তে জৈব সার ব্যবহার এবং স্বাস্থ্য সম্মতভাবে কীটনাশক স্প্রে করণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর হস্তক্ষেপ দাবী করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।