শতবর্ষী এক মহীরুহের দীর্ঘজীবন প্রার্থনা

mohiruhoশতবছরের হাসি-আনন্দ, কষ্ট-বেদনা সহ্য করেও বিশাল অবয়ব নিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রয়েছে নিশ্চল-নিঃসঙ্গ এক কোণে। আকাশের মত বিশাল মন নিয়ে নিয়ত সহ্য করছে দৈহিক নিপীড়ন। কতকালের সাক্ষি হয়ে রয়েছে; তা জানারও কেউ নেই। একমাত্র সেই জানে। কাপ্তাই হ্রদে নিমগ্ন পুরাতন রাজবাড়ি ও পুরাতন রাঙামাটি শহর, তার চোখের সামনে যখন ডুবতে শুরু করে তখন তারও বুক কেঁপেছিল যৌবনের আকাশচুম্বী সে অহংকার চূর্ণ হয় কি-না। পুরাতন শহরের কর্মব্যস্ত দিনগুলো তার চোখে এখনো ভাসে। সে সময়ের বালকেরা, যারা খেলতো তার ছায়ায় এখন তারা বার্ধক্যে। তাদের সেই নিষ্পাপ মুখগুলো কষ্টজাগানিয়া স্মৃতিতে ভেসে বেড়ায়। কিন্তু একদিন হুহু করে পানি বাড়তে থাকে। ঘরবাড়ি থেকে শুরু করে ক্ষেতের ফসল সবকিছু তলিযে যায় অতলে। দেখতে দেখতে অন্যসব আকাশচুম্বী বৃক্ষসারিগুলো ডুবে যায়। কম্পিত বুকে শুনল, পায়ের কাছে এসে কর্ণফুলীর খরস্রোতে বাঁধ দেওয়া কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদের পানি বুক ভরা আকুতি নিয়ে বলছে, “তোমার বিশাল হৃদয়ের নিচে ঠাঁই দাও আমাকে”। জীর্ণ শরীর ও বিদীর্ণ বুক নিয়ে এখনো মানুষকে সুশীতল ছায়া, নিবিড় প্রশান্তি দিয়ে যাচ্ছে আজো শতবর্ষী এ মহীরুহ, তার সাক্ষি এই কর্ণফুলী। ঢেউয়ের পর ঢেউ ভেঙ্গে সশব্দে তীরে আচঁড়ে পড়ে সমাজÑসভ্যাতাকে সেই সাক্ষ্য ঘোষণা করে যাচ্ছে যেন। কত কিছুই তার বলার ছিল, কিন্তু কান পেতে শোনার কেউ নেই এই স্বার্থান্ধ শহুরে জীবনে। শুধুই চেয়ে চেয়ে দেখে থাকা ছাড়া যে তার আর কোনো উপায় নেই। তার আরো নীরব সাক্ষি হলো ডিসি বাংলো এলাকায় তিনশ বছরের পুরনো চাপালিশ গাছটি। তার চোখের সামনে ডুবতে দেখেছে পুরান রাঙামাটি শহর। কত বন্ধুর নিথর অবয়ব ডুবে রয়েছে এই হ্রদের নিচে। এদের কেউ কেউ পানি প্রাগৈতিহাসিক ফসিলের মত জেগে উঠে। ওদের শুষ্ক রুক্ষ অবয়ব দেখে নিজেকে সে ভাগ্যবান ভেবে শান্তনা খোঁজে। কিন্তু, এত বিপর্যয়ের পরও যৌবনের সেই অহংকার নিয়ে এখনো সে নিয়ত দিয়ে যায় ভালবাসার সুবাতাস। মনে নেই কোনো ক্লেদ, প্রতিশোধস্পৃহা, অকৃত্রিম ভালবাসায় ধরে রেখেছে তার ছায়ার নিচে সকল জীবনকে। যে শেকড়ের টানে এই বিশাল অবয়ব তিনশ বছরেরও বেশি দাঁড়িয়ে আছে, সে শেকড় এখন মানুষের হীনমন্মতার শিকার। নিজের ছায়ায় যাদের দিনের পর দিন প্রশান্তি দিয়েছে তাদের অচেতন মনের বিভিন্ন কর্মকান্ডে তার শেকড় আজ ক্ষয়িষ্ণু। দেহের এক অংশ ক্ষয় হওয়ার মত তার শরীরেরও এক অংশ ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। এভাবে ক্ষয় হতে হতে একসময় আকাশচুম্বী এই অবয়বটি মাটিতে লুটে পড়বে। এ সত্য তার কাছে যতই নির্মম হোক না কেন কিন্তু এই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি আজ শতবর্ষী মহীরুহটি।
সচেতন পাঠক অথবা বৃক্ষপ্রেমী, এ গাছটি পর্যটকদের কাছে একটি আকর্ষণীয় গাছ। সবাই গাছটির বিশালতা দেখে অভিভুত। তার বয়স শুনে রীতিমত চোখ কপালে ওঠে অনেকের। কিন্তু, আমরা রোজ প্রতিদিন যারা তার নিচে গিয়ে বসি তাদের একটু সচেতনতাই গাছটি আরো দীর্ঘজীবি হবে। মাটি ফেটে বের হওয়া শেকড়গুলোর উপর যদি কোনো রকম পরিবেশ বিধ্বংসী পরিস্থিতির সৃষ্টি করা না হয়, তবে এটি আরো দীর্ঘদিন সবার মাঝে সুশীতল বাতাস বিলিয়ে যাবে। গর্বিত রাঙামাটিবাসীও চান গাছটি আরো দীর্ঘজীবি হোক।

আরও পড়ুন
1 মন্তব্য
  1. uzzal বলেছেন

    পর্যটন বিষয়টা এই ইলেকট্রিক প্রকাশনার জনপ্রিয়তার জন্য বিশাল সাপোর্ট রাখবে আশা করি।
    আরো ভাল লেখা পাবো আশা করি।
    সবার জন্য শুভ কামনা।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।