সোনালি আমনের ঘ্রাণে মাতোয়ারা লামার প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদ

লামায় রুপসীপাড়া ইউনিয়নের ভদ্রসেন পাড়ার চাষী জয়সেন বড়ুয়ার ধান কাটা উদ্বোধন করছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নূরে আলমসহ অন্যরা
সোনালি আমন ধানের মম ঘ্রাণে মাতোয়ারা বান্দরবানের লামা উপজেলার প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদ। মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে এ সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে।
সোনালি ধানের দোলায় দুলছে হাজারো কৃষকের স্বপ্ন। এখন ধান কাটা, পরিবহন এবং মাড়াই করে ধান ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার কৃষক পরিবারের সদস্যরা। প্রাকৃতিক দূর্যোগে কিছুটা ক্ষতি কাটিয়ে বাম্পার ফলন হয়েছে আমনের। ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকের মুখেও হাসি ফুটেছে। উপজেলাটি পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় ঠান্ডার প্রকোপটা একটু বেশি থাকে। আর শীতের প্রধান উৎসব হল ‘নবান্ন’। স্বপ্নে বিভোর কৃষক-কৃষানীরা এখন নবান্ন উৎসবে মেতে উঠেছে। এ শীতের সকালে বা সন্ধ্যায় প্রতিটি কৃষক পরিবারের ঘরে এখন পিঠা তৈরি করে এক সঙ্গে ধুমধাম করে খাওয়ার উৎসব চলছে। তবে ধানের ভালো দাম নিয়ে শংকায় রয়েছে কৃষকরা। কারন, গেল মৌসুমে বাম্পার ফলন হলেও ধানের ভালো মূল্য না পাওয়ায় তেমন লাভবান হতে পারেননি তারা।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, লামা উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এলাকায় আমন চাষযোগ্য মোট জমি রয়েছে ৩ হাজার ২০৫ হেক্টর। আমনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ১৫০ হেক্টর। আবাদ হয়েছে ৩ হাজার ১৫০ হেক্টর। তম্মধ্যে ২ হাজার ৪২০ হেক্টর জমিতে উপশী জাতের, ৭০০ হেক্টর হাইব্রীড ও ৩০ হেক্টর জমিতে স্থানীয় জাতের ধান চাষ করা হয়। উপশী জাতে রয়েছে বিআর-১০, ১১, ১৬, ২২, ব্রি-৩০, ৩২, ৩৩, ৩৯, ৪৪, ৪৯, ৫১, ৫২, বিনা-৭, হাইব্রীড জাতে ধানী গোল্ড, পাইওনিয়ার, এসিআই ও স্থানীয় জাতের মধ্যে রয়েছে হরিধান। বছরের জুন মাসের শেষের দিকে বীজতলা, জুলাই-আগস্ট মাসে জমিতে আমন ধান রোপন করা হয়। দীর্ঘ তিন মাস পরিচর্যার পর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে এ ধান পাকার পর কাটা শুরু করেন কৃষকরা।
উপজেলার ১২ হাজার ৩০০ কার্ডধারী ও কার্ড বিহীন আরো ১ হাজার চাষীর মধ্যে ১২ হাজার চাষী আমন ধানের চাষ করেছেন। রুপসীপাড়া ইউনিয়নের ভদ্রসেন পাড়ার কৃষক জয়সেন বড়ুয়ার জমির ধান কাটার মাধ্যমে অনুষ্ঠানিকভাবে আমন কাটার উদ্ভোধন করেন- উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নূর আলম। এ সময় সহকারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা স্বপন কুমার দাশ ও উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রতন কুমার দেব, গোপন চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
গত বছর এ চাষের আবাদ হয়েছে ৩ হাজার ২০৩ হেক্টর জমিতে। লামা পৌর এলাকার কলিঙ্গাবিল, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের কুমারী চাককাটা, নীচপাড়া, রুপসীপাড়ার বৈক্ষমঝিরি, দরদরী, গজালিয়ার বাইশপাড়ী, মোহাম্মদ পাড়া ও লামা সদর ইউনিয়নের মেরাখোলাসহ বেশ কয়েকটি বিল ঘুরে দেখা গেছে, পুরোদমে ধান কাটছে কৃষকরা। ধম ফেলার সময় নেই তাদের। কাক ডাকা ভোর থেকে সূর্য ডোবার আগ পর্যন্ত ধান কাটায় মত্ত তারা। কেউ আবার কাটা ধান আঁড়ি বেঁধে মাথায় কিংবা ভারে করে নিয়ে যাচ্ছেন বাড়ীর আঙ্গিনায়। আবার কেউ জমিতেই ধান মাড়াই করে নিচ্ছেন গরু কিংবা আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে। মোট কথা কৃষকরা কষ্টের ফসল ঘরে তোলার আনন্দে মাতোয়ারা যে যার মতে।
রুপসীপাড়া ইউনিয়নের বৈক্ষমঝিরির কৃষক মো. ইব্রাহীম বলেন, এক হেক্টর জমিতে আমন চাষ করেছি। সার, সেচ, বীজ, জমির খাজনা, কীটনাশক, শ্রমিক খরচসহ সর্বমোট ৬৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। মাড়াই শেষে ১৭৫ মন ধান পাওয়ার আশা করছি। তবে সার বীজ কীটনাশক ও জমির লাগিয়ত বাবদ খরচ বেশি হওয়ায় বাম্পার ফলনেও আশানুরুপ লাভ না পাওয়ার আশঙ্কায় আছি। চলতি মৌসুমে ধানের মূল্য ভালো পাওয়া গেলে আগামীতে ধানের আবাদ বেশি করার আশা আছে।
লাইনঝিরির কৃষানী আনোয়ারা বেগম বলেন, শীতের শুরুতে নতুন ধানের চালের গুড়োয় কুলি ও চিতই পিঠা তৈরি করেছি। এসব পিঠা স্বাদ ও গন্ধ অন্যরকম। এছাড়া প্রায় বাড়ীতেই এখন ভাপা পিঠাসহ চিড়া ও মুড়ি ভাজা চলছে।
ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই ধান পুরোপুরি ঘরে উঠবে বলে জানিয়েছেন রুপসীপাড়া ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা অংচি মার্মা। তিনি বলেন, আমন চাষে কৃষকদের সব রকম পরামর্শ ও সহযোগিতা দেয়া হয়েছে। ফলে কৃষকরা আশানুরুপ ফসল ঘরে তুলতে পারছেন।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রতন কুমার দেব জানান, এ বছর প্রতি হেক্টর জমিতে ১৭৫মন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলে, সে মতে উপজেলায় ৩ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে সর্বমোট ৫ লাখ ৫১ হাজার ২৫০ মন ধান উৎপাদন হবে। প্রতিমন ধান স্থানীয় বাজারে ৬৮০ টাকা মূল্যে বিক্রি হলে উৎপাদিত খাদ্য শস্যের মূল্য দাঁড়াবে ৩৮ কোটি ৫৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
এদিকে, উপজেলা সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. নূরে আলম বলেন, কৃষি বিভাগের সঠিক নির্দেশনায় কৃষকরা যথা সময়ে জমিতে সার, বীজ, কীটনাশক ব্যবহারের পাশাপাশি নিবিড় পরিচর্যা করায় এবং ক্ষেতে পোকামাকড়ের আক্রমন কম থাকার কারনে আমন চাষে আশাতীত সাফল্য পাচ্ছে কৃষকরা। এছাড়া আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অনেকাংশে বেড়েছে। এবারে আমন আবাদে লক্ষ্যমাত্রার চাইতে অর্জিত হয়েছে।
কৃষি খাতে এ অভাবনীয় সাফল্য অর্জনের কারনে খাদ্য উদ্বৃত্ত এ উপজেলায় খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা। ইতিমধ্যে প্রায় ৭০-৭৫ শতাংশ জমির আমন ঘরে তুলেছেন কৃষকরা। সপ্তাহের মধ্যে সম্পুর্ণ ধান ঘরে ওঠবে। তবে গতবারের চেয়ে এবার ১০০হেক্টর বেশি জমিতে আমন চাষাবাদ হয়েছে বলেও জানান তিনি।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।