রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের মিতিঙ্গাছড়ি গ্রামকে ‘এসডিজি ভিলেজ’ হিসেবে উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে দেশের আরও দুটি গ্রাম—খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী ও দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার নাফানগর—এসডিজি ভিলেজ হিসেবে উদ্বোধন করা হয়।
সোমবার (১০ আগস্ট) দুপুর ১২টায় রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনটি গ্রামের এসডিজি ভিলেজ পাইলট প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্য দিয়ে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সবার আগে বাংলাদেশ। দেশের প্রত্যন্ত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করাই এসডিজি বাস্তবায়নের অন্যতম লক্ষ্য। টেকসই উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপদ পানি, কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ—সবকিছুকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কাউকে পিছিয়ে না রেখে জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। স্থানীয় সম্পদ, কৃষি, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে গ্রামগুলোকে স্বনির্ভর করে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর ভার্চুয়াল উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে কাপ্তাই উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, হেডম্যান, কার্বারি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সাংবাদিক এবং মিতিঙ্গাছড়ি গ্রামের বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে রাঙামাটি জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী ছাড়াও মিতিঙ্গাছড়ি গ্রামের বাসিন্দা স্বপ্না মারমা ও সুইহ্লা প্রু মারমা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। তাঁরা গ্রামের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে বলেন, মিতিঙ্গাছড়িতে কোনো স্কুল নেই। নিরাপদ পানির সংকট রয়েছে এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয়। শুষ্ক মৌসুমে ছড়ার পানি শুকিয়ে যাওয়ায় চাষাবাদেও সমস্যা হয়। এ কারণে গ্রামে টিউবওয়েলসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানান তাঁরা। একই সঙ্গে তাঁরা প্রধানমন্ত্রীকে মিতিঙ্গাছড়ি গ্রামে আসার আমন্ত্রণ জানান।
মিতিঙ্গাছড়ি গ্রামকে এসডিজি ভিলেজ হিসেবে নির্বাচিত করায় স্থানীয়দের মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, প্রকল্পটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে গ্রামের দীর্ঘদিনের আর্থ-সামাজিক সমস্যা কমার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য সরকারের অতিরিক্ত সচিব সুমন বড়ুয়া, রাঙামাটি জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী, পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুল রকিব পিপিএম, কাপ্তাই জোন কমান্ডার লে. কর্নেল মো. নাজমুল কাদির শুভ পিএসসি, রাঙামাটি সিভিল সার্জন ডা. নূয়েন খীসা, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম, জেলা প্রশাসনের উপপরিচালক (স্থানীয় সরকার) মো. মোবারক হোসেন, কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রায়হানুল ইসলাম, কাপ্তাই শহীদ মোয়াজ্জেম ঘাঁটির কমান্ডার ফরহাদ খান, কাপ্তাই সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম, রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপেন তালুকদার দীপু, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মামুনুর রশীদ, কাপ্তাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন, কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান, কাপ্তাই ৩৫ আনসার ব্যাটালিয়নের পরিচালক সঞ্চয় সাহা, রাঙামাটি জেলা বিএনপির সহ সভাপতি ডা. রহমত উল্লাহ, কাপ্তাই উপজেলা বিএনপির সভাপতি লোকমান আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক ইয়াছিন মামুন সহ বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের রাঙামাটি জেলা ও উপজেলা নেতাকর্মী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রায়হানুল ইসলাম জানান, মিতিঙ্গাছড়িতে এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যের আলোকে সমন্বিত উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে দারিদ্র্য হ্রাস, জলাবদ্ধতা নিরসন, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমানো, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন, নারীর ক্ষমতায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশ সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণ, কৃষি ও জীবিকার উন্নয়ন এবং ডিজিটাল সেবা ও প্রযুক্তির ব্যবহারকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এসডিজি ভিলেজ প্রকল্পের মাধ্যমে মিতিঙ্গাছড়ির শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও অন্যান্য জীবিকাভিত্তিক কার্যক্রম সম্প্রসারিত হবে। এতে দুর্গম এই পাহাড়ি গ্রামের মানুষের জীবনমানের পরিবর্তনের পাশাপাশি তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।



