মাটিরাঙ্গায় আমন ধানের সোনালী স্বপ্ন : বাম্পার ফলনের আশা

সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ও দুঃস্বপ্ন কাটিয়ে পার্বত্য খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্নে বিভোর কৃষকেরা। উপজেলার মাঠের পর মাঠ জুড়ে এখন শোভা পাচ্ছে রোপা আমন ধানের সবুজ চারা। সবুজ পাতার ডগায় সকালের শিশির প্রকৃতির অপূর্ব এক মায়াবী দৃশ্য। এই সৌন্দর্যেই যেন কৃষকের ক্লান্ত মনে জেগে ওঠে নতুন আশার আলো বাতাসের তালে দোলা খাওয়া সতেজ চারা দেখে যেমন প্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে চাষিদের, তেমনি মনে জাগছে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবল আশা। কৃষি বিভাগের জোর তৎপরতা ও সরকারি প্রণোদনায় বন্যাজনিত ক্ষতি কাটিয়ে এবার বাম্পার ফলনের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে সীমান্ত ঘেঁষা এই উপজেলা।

ভোরের স্নিগ্ধ নরম আলো ফুটে উঠতেই উপজেলার চড়পাড়ার দিগন্তবিস্তৃত মাঠ যেন এক সবুজ সমুদ্রে পরিণত হয়। যত দূর চোখ যায়, কেবল কচি ধানগাছের দোলা আর সবুজের উচ্ছ্বাস। শিশিরভেজা সেই সবুজ গালিচায় দাঁড়িয়ে এক কৃষক পরম মমতায় তাঁর স্বপ্নের ধানগাছগুলোর যত্ন নিচ্ছেন, নিবিড় ভালোবাসায় আলতো হাতে উপড়ে ফেলছেন অনাকাঙ্ক্ষিত আগাছা।

কাছেই দেখা মেলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর এক তরুণীর; হাতে বিশেষ কাপড় জড়িয়ে পরম মমতায় তিনিও মেতেছেন ফসলের পরিচর্যায়। ভোরের স্নিগ্ধতায় প্রকৃতি আর মানুষের এই নিবিড় মেলবন্ধন যেন এ বাংলারই এক চিরন্তন কাব্য।

​উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মাটিরাঙ্গায় মোট ৫ হাজার ৫১ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ করা হয়েছে।

​এক নজরে মাটিরাঙ্গার আমন আবাদের চিত্র:মাটিরাঙ্গায় চলতি আমন মৌসুমে মোট ৫ হাজার ৫১ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাষ হয়েছে উচ্চ ফলনশীল (উফশী) জাতের ধান, যার পরিমাণ ৪ হাজার ৫৪০ হেক্টর। উফশী জাতগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো; বিআর-১১, বিআর-১২, ব্রি ধান-৩৯, ৪০, ৪১, ৪৯, ৭০, ৭১, ৭২, ৭৫, ৭৬, ৮৭, ৯৩, ৯৪, ১০৩ ও ১০৬ এবং বিনা ধান-৭, ১২ ও ১৭, বিনা- ২৬।
​এছাড়া ২৯০ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড এবং ২২১ হেক্টর জমিতে স্থানীয় জাতের ধান আবাদ করা হয়েছে।

হাইব্রিড ও স্থানীয় জাতের আবাদের বিস্তারিত:
​হাইব্রিড জাত (মোট ২৯০ হেক্টর): ধানীগোল্ড ৮৫ হেক্টর, হীরা-২ ৮০ হেক্টর, হীরা-৬ ৫০ হেক্টর, হীরা-৮ ৪০ হেক্টর এবং তেজগোল ৩৫ হেক্টর।
​স্থানীয় জাত (মোট ২২১ হেক্টর): কালিজিরা ৮৫ হেক্টর, বিন্নি ৭০ হেক্টর, চিনিগুড়া ৩৬ হেক্টর এবং পাইজাম ৩০ হেক্টর।

NewsDetails_03

বন্যাজনিত ক্ষতি সামলে নিতে এবং আমন উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছে সরকার। সম্প্রতি কৃষি প্রণোদনা ও পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় ১ হাজার ১০০ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে ৫ কেজি উফশী আমন বীজ, ১০ কেজি ডিএপি এবং ১০ কেজি এমওপি সার বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে বিশেষ পুনর্বাসন সহায়তার অংশ হিসেবে আরও ৫০০ জন কৃষককে ৫ কেজি করে আমন বীজ দেওয়া হয়েছে।

​খেদাছড়া এলাকার কৃষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “বন্যায় আমাদের যে ক্ষতি হয়েছিল, তাতে আমরা প্রায় আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। তবে সরকারি সার ও বীজ পাওয়ার পর নতুন করে চারা রোপণ করেছি। এখন মাঠের সবুজ চারা দেখে মন ভরে যায়।”

​একই আশাবাদ ব্যক্ত করে কৃষক আলমগীর হোসেন বলেন, “কৃষি অফিসের সঠিক পরামর্শ আর ভালো বীজ পাওয়ায় ক্ষেত বেশ চমৎকার রূপ নিয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আশা করছি বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে ভালো ফলন পাব।”

​মাঠ পর্যায়ের তদারকি নিয়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা দেবাশীষ চাকমা বলেন, “বন্যা পরবর্তী সময়ে কৃষকদের ঘুরে দাঁড় করাতে আমরা মাঠে নিরবচ্ছিন্ন পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। সার প্রয়োগ ও রোগবালাই দমনে কৃষকদের সরাসরি নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।”

​সার্বিক বিষয়ে মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, “বন্যার পর কৃষকরা যেন ভেঙে না পড়েন, সেজন্য আমরা দ্রুত পুনর্বাসন ও প্রণোদনা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছি। বিআর, ব্রিধান, বিনাধান ও জনপ্রিয় হাইব্রিড জাতগুলোর সুষম ব্যবহারের কারণে জমিতে এবার বেশ ভালো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। আবহাওয়া শেষ পর্যন্ত অনুকূলে থাকলে মাটিরাঙ্গায় আমনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে বাম্পার ফলন নিশ্চিত হবে বলে আমরা আশাবাদী।”

কৃষকেরা বিশ্বাস করেন, এবারের আমন মৌসুম তাদের জীবনে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আসবে। মাঠে দুলতে থাকা ধানের শীষ শুধু খাদ্য নিরাপত্তার প্রতীক নয়, বরং কৃষকের অদম্য মনোবল ও সংগ্রামের গল্প।

আরও পড়ুন