কুসংস্কারচ্ছন্ন সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে একজন কুছয় খুমী

দীর্ঘ ১১বছর ধরে সমাজ সংস্কারে লড়েছেন এক নারী। নানা বাধা-বিপত্তির মধ্যেও কষ্ট, দুঃখ দুর্দশার উপেক্ষা করে কুসংস্কারের রীতি নীতি ও সামাজিক কু-প্রথাগুলো সংস্কারের কাজ করে যাচ্ছে। এ লড়াইয়ে স্বীকৃতি স্বরূপ এর মধ্যে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পেয়েছেন সন্মাননা। তাঁর নাম কুছয় খুমী(৩৮), পেশায় শিক্ষক।

গত সোমবার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকালে বান্দরবানের রুমা উপজেলা সদরে গীর্জা পাড়ায় তাঁর বাসায় বারান্দায় বসে এক আলাপচারিতায় কথা বলেছেন তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রামে ১১টি জাতিসত্তা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পিছিয়ে পড়া খুমি সম্প্রদায়ের একজন প্রতিবাদী নারী- কুছয় খুমি। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাওয়া খুছয় খুমী পাহাড়বার্তা’কে বলেছেন, বাবা মা পাহাড়ে জুম চাষি ছিলেন। মা-বাবার ৮ সন্তানের মধ্যে চার বোন ও চার ভাই। তার মধ্যে আমি চতুর্থ। তবে পরিবারে অভাব অনটনের মধ্যেও বাবা আমাদের পড়ালেখা করানোর প্রবল ইচ্ছে ছিল।

জুম চাষ ও দিন মজুরির আয় নিয়ে প্রচুর চাপ ছিল বাবার উপর। তাই আমরা বেশিদূর পড়া লেখা করা সম্ভব হয়নি। বাবার উৎসাহে আমার বড় িভাই স্নাতকোত্তর, দুইভাই এইচএসসি পাস। আমিসহ সবার ছোট এক ভাই ও এক বোনসহ তিনজন এসএসসি পাসের পর পড়ালেখায় আগানো সম্ভব হয়নি। প্রথম বড় দুইবোন পড়ালেখা করতে পারেনি। যখন আমি এসএসসি পাস করি, তখন বাবা-মা’র আর্থিক অবস্থা আরো দুর্বল হয়ে পড়ে। মা বাবার সিদ্ধান্তে সামাজিক রীতি নীতি অনুযায়ী ২০০২ সালে আমার বিয়ে হয়-রোয়াংছড়ি উপজেলার তাড়াছা ইউনিয়নের লিংনাং খুমীর সঙ্গে।

পাহাড়বার্তা’কে কুছয় খুমী বলেন বিয়ে দুই বছরের মাথায় আমার প্রথম কন্যা সন্তান জন্ম হয়।২০০৪ সাল, আমি পুত্র সন্তান জন্ম না দেয়ার কারণে পরিবারে শ্বশুর-শ্বাশুড়ী ও আমার স্বামীর প্রচন্ড মন খারাপ হয়ে গেল। ২০০৬সালে ও ২০০৯ সালেও জন্ম নেয়া দু‘টিও কন্যা সন্তান। তিন সন্তান কন্যা হওয়ার কারণে আমার স্বামী প্রায় সময় অকথ্য ভাষায় গালি-গালাজ ও মানসিকভাবে নির্যাতন চালাত। স্বামীর আত্মীয়-স্বজনরাও কথায় কথায় বিভিন্ন ভাবে দোষারোপ করে আমাকে অপমান করত। কিন্তু সমাজে কুসংস্কার নিয়ে পরিবারে অসলগ্ন কথাবার্তা ও অযাচিত ব্যবহারকে রীতিমত প্রতিবাদ করায় পাড়া প্রতিবেশি কোনো কিছুই বলত না, বরংচ আমাকে প্রচন্ড ভালবাসত তারা। সংসারে চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্যে পাড়া প্রতিবেশিদের সমর্থনে ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সংরক্ষিত মহিলা আসনে বিপুল ভোটে জয় লাভ করি।

এদিকে পুত্র সন্তানের জন্য আমার স্বামী পুরোপুরি অসস্তুষ্ট। স্বামীর কথায় এক শিশু ছেলেকে দত্তক নিতে বাধ্য হয় কিন্তু এক-দুই মাসের মধ্যে দত্তক ছেলে তাঁর রক্তের সন্তান নয় বলে হঠাৎ একদিন এক অসহায় নাবালিকাকে ঘরে আনলো। তার বয়স ছিল ১৪বছর। সেটি মা-বাবার বিরোধিতার কারণে তাকে তালাক দিতে বাধ্য হয়। তখন থেকেই প্রায় সময় মদ্যপান করে ঘরে অশান্তি সৃষ্টি করতো। বাড়ির পাশের লোকজনও খুব বিরক্তিকর হয়ে ওঠতো তথা সমাজেও নিন্দার ঝড় বয়ে যেতো।

পাহাড়বার্তা’কে কুছয় খুমি বলেন, তখনোই সংসারে টিকতে পারবো কিনা, মনে সন্দেহের দানা বাঁধে। তবে এর মধ্যে জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুবাদে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন বিষয়ে জনসচেতনতা মূলক প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হয়। এসময় স্বামীর নির্যাতনের প্রতিবাদ করতে থাকি। সমাজে সামাজিক নিয়মকানুনে কুসংস্কার প্রথাগুলোও তুলে ধরতে চেষ্টা করছি। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য সরকারি চাকুরি নিয়ে চিন্তা করতে থাকি। সোনার হরিণ- সরকারি চাকুরিও পেয়ে যায় আমি।

পাহাড়বার্তা’কে কুছয় খমী বলেন, ২০১৫ সালে ১৫ জুন প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। আবার চতুর্থবারে কন্যা সন্তান জন্ম হয় আমার। সংসার টিকিয়ে রাখতে আমার স্বামীকে নানাভাবে বুঝাতে লাগলাম। পুত্র সন্তান না হওয়ার ব্যাখ্যা স্বামীকে বুঝিয়েছি বহুবার। তাতে কোনোভাবে তার মন গলাতে পারিনি আমি। সামাজিকভাবে বিবাহ বিচ্ছেদ করতে বাধ্য হয়।

পাহাড়বার্তা’কে কুছয় খুমী বলেন, বিয়ে বিচ্ছেদের পর দ্বিতীয়বারের মতো আবারো দু:খ-দুর্দশা নেমে আসে। তখন সমাজপতিরা কুছয় খুমীকে বলেছেন, পাড়ায় ঘরে একা থাকা যাবেনা। হয় বাবা-মায়ের বাড়িতে, নাহয় কোনো ভাই কিংবা বোনের বাড়িতে থাকতে হবে। তবে তিনি তা মানেননি। পাড়াবাসীদের ব্যক্তিক কেন্দ্রিক কনসেলিংয়ের মাধ্যমে সমাজে কুসংস্কারগুলো তুলে ধরে সবাইকে বুঝিয়ে একাই থেকে যান কুছয় খুমী।

তিনি বলেন, খুমী সম্প্রদায়ের সমাজে নিয়মনীতি ও প্রথাগুলো কুসংস্কার সবচেয়ে বেশি। তাঁর ভাষ্যমতে, গর্ভাবস্থায় জালে ধরা মাছ চিংড়ি খেলে প্রসবে বাচ্চা আটকে যাবে, আনারস খেলে বাচ্চার চোখ বড় হবে। পেটে যখন বাচ্চা এসব কুসংস্কারের কথা আমি একটাও মানছিলাম না।

পাহাড়বার্তা’কে কুছয় খুমী বলেন, সমাজের জন্য কাজ করার কারণে নারীরা কেউ বিপদে পড়লে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করে। কোথাও দেখা হলে সৌজন্য মূলক সম্মান জানায়। এটি আমাকে সমাজে কাজ করার উৎসাহ যুগিয়েছে।

উপজেলা মহিলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সুপন চাকমা বলেন, মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সারা দেশে পরিচালিত “জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ” শীর্ষক কার্যক্রমের আওতায় সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ২০২০ সালে ৯ ডিসেম্বর শ্রেষ্ঠ ‘জয়িতা’ র সম্মানে কুছয় খুমীকে সনদ ও ক্রেস্ট দেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র নৃ- গোষ্ঠী খুমী সম্প্রদায় থেকে সমাজ উন্নয়নে লড়াকু এ নারী কুছয় খুমীর উদ্যোগ ও সাহজ অন্যদের অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।

আরও পড়ুন
1 মন্তব্য
  1. প্রশান্ত বাহাদুর ত্রিপুরা বলেছেন

    অত্যন্ত উৎসাহবঞ্জক একটি প্রতিবেদন তাও আবার একজন শিক্ষক তিনি। আমাদের পরিবারেরই সদস্য। অভিনন্দন ম্যাডাম আপনাকে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।