বান্দরবানকে নিয়ে আমার যত ভাবনা

মং মং সো
লেখার শুরুতেই বলে নেই, আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন সময়গুলো পার করেছি এই ছোট্ট সুন্দর বান্দরবান শহরটায়। আজকে আমি আমার নামের পাশে যেই শিল্পী পরিচয় দিতে পারছি, বলতে দ্বিধা নেই এই শিল্পসত্ত্বার বীজটা বপণ হয়েছিলো এই শহরেই। এই শহরই আমার কৈশর মনকে শিখিয়েছিল সৌন্দর্য্যের সংজ্ঞা কী? কালচারাল জার্নি কাকে বলে? জাতী, ধর্ম,গোত্রের উর্ধে এসে মানুষকে মানুষ হিসেবে কিভাবে দেখতে হয় সেই চোখটা তৈরী হয়েছিলো এখানেই। তাই স্বাভাবিকভাবেই বান্দরবানকে নিয়েও আমার অনেকগুলো স্বপ্ন জমা হয়ে গেছে। সেই স্বপ্নগুলো দেখতে আমার বরাবরই ভালো লাগে, এসব ভেবে ভেবে আমি আপ্লুত হই।
ভুমিকা অংশ শেষ করে আমি চলে এসেছি মূল লেখায়। এই অংশে একটু আমি আমার স্বপ্ন খোলাসা করার চেষ্টা করি। বান্দরবান শহরটা ছোট এবং জনসংখ্যার দিক দিয়ে অল্প হলেও আমি স্বপ্ন দেখি এই শহর থেকেই একদিন শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা, রাজনীতিতে বিশ্বের প্রতিনিধিরা উঠে আসবে এবং পাশাপাশি পৃথিবীর জন্য আদর্শ একটি শহর গড়ে তুলবে। আমি বিশ্বাস করি এটুকু স্বপ্ন পূরন করা চাঁদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখার মতো কঠিন বিষয় না,এটুকু পূরন করাই যায়। এইজন্য প্রয়োজন কিছু সম্মিলিতো সহযোগী হাত, কিছু স্বপ্নবান পুরুষ, কিছু স্বপ্ন ছড়ানো লোক। আমি জানি এমন পুরুষের অভাব কখনোই ছিলোনা বান্দরবানে। প্রয়োজন শুধু তারা একটু একত্রিত হওয়া। ছড়ানো ছিটানো মেধাগুলোকে একত্রিত করে পরিকল্পনা মাফিক এগুনো।
বাংলাদেশ ছেড়ে চীন দেশে এসেছি প্রায় সাত বছর হতে চললো। এর ভেতর আমার আর্ট এক্সিভিশন এবং পুরষ্কারের খাতিরে ভ্রমন করা হয়েছে চায়নার বিভিন্ন প্রদেশ এবং বেশকিছু দেশ। যেখানেই গিয়েছি পরিকল্পিত কোন শহর বা স্থান দেখলেই আমার বারবার মনে পরেছে আমার শহরটার কথা। আমি হঠাৎ মনে মনে তুলনায় চলে যাই, ঠিক এমন একটা সুন্দর কিছু বান্দরবানে হলে কেমন হতো। কল্পনায় আমি ফলাফল দেখি। ভাবতেই ভালো লাগে। একজন চিত্রশিল্পী হিসেবে কোন কিছুর এই আগ্রিম ইমেজ দাঁড় করানোটা আমাদের অভ্যাসগত। কোন ছবি আঁকার আগেই আমরা কল্পনা করে ফেলি আঁকার শেষে ছবিটা কেমন দাঁড়াবে। ব্যাপারটা ঠিক তেমনই।

বান্দরবান শহরটা খুব ছোট। পরিকল্পিত নগরী তৈরীর জন্য এটাই মুখ্য সময় বলে আমার মনে হয়। এক্ষেত্রে প্রথম প্রাধান্য পেতে পারে শিক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান। তারপরের ধাপে আসে পর্যটন নগরী হিসেবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ডেকোরেশন বা সাজসজ্জ্বা ও অন্যান্য।

বান্দরবানকে একটা সভ্য ও শিক্ষিত জনপদ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষাখাত নিয়ে নতুন করে ভাবতে বসার কোন বিকল্প আছে বলে আমার মনে হয়না। একদল সত্যিকার অর্থেই শিক্ষিত মানুষ ব্যথিত একটা পরিকল্পিত নগরী কখনোই গড়ে তোলা সম্ভব না। এই ধারনাটা পরিষ্কার যে, জনগণের বোধের জায়গাটা সুন্দর বা পরিচ্ছন্ন হলে শহর আপনা থেকেই সুন্দর হয়ে উঠবে, পরিচ্ছন্ন হয়ে উঠবে। তখন জনগণই হয়ে উঠবে শহরের প্রধান রক্ষক। পৃথিবীর উন্নত শহরগুলোর দিকে তাকালে এই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যায় । এখন এই শিক্ষিত নাগরিক গড়ে তুলতে কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে।

১। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অভিবাবকদের যোগাযোগ বা যাতায়াত নিয়মিত করা। শিক্ষার্থীদেরকে আরো বেশি এক্টিভ করে তোলার জন্য এটা একটা কার্যকরি পদ্ধতি।
২। সনাতন শিক্ষাদান পদ্ধতির বাইরে এসে শিক্ষকদেরকে শিক্ষার্থী ও অভিবাবকদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ন আচরনে অভস্থ করে তোলা।
৩। “নিজের শহরটাকে নিয়ে তোমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?” এই বিষয়ক আলোচনা, মতামত, রচনা প্রতিযোগিতা ও বিতর্কের আয়োজনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে নিজের জেলাটাকে নিয়ে স্বপ্ন বুনে দেয়া।
৪। একই সাথে ঠিক একই প্রতিযোগিতাটা অভিভাবকদের সাথেও করা যেতে পারে। এটা অভিবাবকদের মাঝেও নিজ শহরের প্রতি দায়িত্ববোধের বিষয়টা দ্বিতীয়বার ভাবাতে সাহায্য করবে। ইত্যাদি ……
মূল কথা, শিক্ষিত নাগরিক গড়ে তোলার জন্য শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের দিকে নজরবন্দি করে না রেখে অভিবাবক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক এই তিন প্রজন্মের মানুষগুলোকে একত্রিত করেই পরিকল্পনা আঁটতে হবে। আমি বিশ্বাস করি একদল একটিভ সিটিজেন তৈরি করার জন্য এটি একটি দ্রুততম প্রক্রিয়া।
উন্নয়ন বলতে সবসময় অবকাঠামোগত উন্নয়নকেই বোঝায় না। প্রকৃত উন্নয়ন হলো মানুষের মেধা ও মননের উন্নয়ন, আচার আচরনের উন্নয়ন। আর এই উন্নয়ন সম্ভব একমাত্র শিল্পচর্চার মধ্য দিয়ে। ‘শিল্প- সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক বন্ধুত্বপূর্ন সহাবস্থান’ এই প্রসঙ্গটা বান্দরবানের পেক্ষাপটে বেশ গুরুত্বপূর্ন । কারন এটাই হতে পারে বান্দরবানের ‘ব্রেন্ডিং’ এর মূল বিষয়। ‘ব্রেন্ডিং’ শব্দটা বাণিজ্যিক শোনাতে পারে। কিন্তু একটি আদর্শ নগরের বিকাশের খাতিরে এরচেয়ে জুতসই বিকল্প শব্দ আছে বলে মনে হয়না।

সতন্ত্র সম্প্রদায় ও সাংস্কৃতিক দিক বিবেচনা করলে বাংলাদেশে সবচেয়ে বৈচিত্রময় ও রঙ্গিন শহরটাই হলো বান্দরবান। তেরোটা ভিন্ন ভিন্ন জাতিস্বত্ত্বার বসবাস এই জেলায়। এই সম্প্রদায়গুলোর রয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়, আচার আচরণ, ভাষা ও উৎসব রীতি। এগুলোই হতে পারে আন্তর্জাতিকভাবে বান্দরবানকে ব্রেন্ডিং এর মূল উপাদান। পর্যটন শিল্প বলে যেই শিল্পটা আছে সহজ কথায় এইটা একটা প্রোডাক্ট বা পণ্যই। এই পন্যের ব্রেন্ডিং এর প্রয়োজন আছে। পর্যটকেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি পাহাড়ের শিল্প ও সাংস্কৃতি চর্চার প্রতি আকৃষ্ট হয়েই বান্দরবানে আসুক।

আমাদের ছোট বেলায় বান্দরবানের সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রে সম্ভবত আমরা সবচেয়ে সুন্দর সোনালি সময়টা পার করে এসেছি। সে সময় শিশু একাডেমি, শিল্পকলা, উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনিষ্টিটিউট,খেলাঘরসহ প্রতিটা স্কুল ও সামাজিক সংগঠনগুলো ছিলো পুরোদমে এ্যাকটিভ। প্রতি মাসেই কোন না কোন প্রতিযোগিতায় আমরা অংশগ্রহন করতে পারতাম। পরিবর্তন আনতে হলে সে সময়টা ফিরিয়ে আনা জরুরী। শিল্প ও সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়ে বান্দরবান শহরটাকে উৎসবের শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে তুলতে পারলেই বন্ধুত্বপূর্ন একটা পরিবেশ ও সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব।
পর্যটন শহর হিসেবে শহর অলংকরন বা সাজসজ্জার দিকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সত্যি বলতে বাংলাদেশের অন্যান্য শহরের তুলনায় বান্দরবান অবশ্যই সুন্দর এবং সাজানো কিন্তু আদর্শ না। আমার এই শহরটাকে আদর্শ শহর হিসেবে দেখতেই ভালো লাগে। আমি স্বপ্ন দেখি একদিন এটা আদর্শ শহর হিসেবেই দেখতে পাবো।

শহর সাজাতে গেলে পরিকল্পনায় শিল্পী ও অভিজ্ঞ মানুষদের পরামর্শ অনুযায়ি সাজানোটাই অধিকতর শ্রেয়। নয়তো বাচ্চাদের হাতে রঙ তুলি ধরিয়ে দিয়ে তাদের কাছ থেকে মাস্টারপিস আশা করার মতো হবে।

রাস্তার দুধারে ফুলগাছ , কিছু লাল নীল বাতি, যত্রতত্র স্কাল্পচার বানিয়ে বসিয়ে রাখাটাকেই সাজানো মনে হয়। এইটুকু সাজস্বজ্জা জ্ঞান আজকাল সবারই আছে। রুচিশীলতার ছোঁয়া আসবে শুধুমাত্র পরিকল্পনা করার সময় অভিজ্ঞ শিল্পীদের পরামর্শ অনুযায়ি করতে পারলে। বান্দরবান শহর জুঁড়ে যেসব স্কাল্পচার বসানো আছে সেসবের গঠন এবং প্লেসমেন্টে খুব ভালো রকমেরই গলদ চোখে পড়ে। সম্ভবত শিল্পী বলেই পরে।

►শহরের পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে কিছু কার্যকরি উদ্যোগ নেয়া জরুরি, আমার কিছু ধারনা তুলে ধরলাম।
১। প্রথমত নাগরিকদের সচেতন করে তোলার ব্যাপারটায় নজর দেয়া। এক্ষেত্রে প্রচারনার ভাষাটাকে একটু ব্যাতিক্রম করে দেয়া। কারন সচেতনতা বাড়ানোর জন্য দেশে কিছু পুরনো টেপ এখনো বাজানো হয়। এটার ধার কমে গেছে, নতুনত্ব দরকার।
২। প্রতি মাসে ‘সবচেয়ে পরিছন্ন এলাকা’ ঘোষণা করা যেতে পারে এবং পুরস্কার হিসেবে সে এলাকায় কিছু ছোটখাটো সমস্যার সমাধান করে দেয়া যায়।
৩।পঞ্চাশ থেকে একশো মিটার অন্তর অন্তর ডাস্টবিন নিশ্চত করা উচিৎ।
৪। সরকারি বা বেসরকারি উদ্দ্যোগে এলাকার প্রতিটি বাড়িতে ডাস্টবিন ও পলিথিন সরবরাহ করে নাগরিকদের চর্চায় ফেলে দেয়া যেতে পারে এবং পাশাপাশি নির্দিষ্ট স্থানে সেসব ময়লা ফেলার জন্য উদ্ভুদ্ধ করাও জরুরি।
৫। শহরের পরিচ্ছন্নতার জন্য পর্যাপ্ত পরিচন্নতাকর্মী নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে বয়স্ক মহিলাদেরকে এ কাজে নিয়োগ দেয়াটায় উপকারি এবং তাদেরকে নির্দিষ্ট উজ্জ্বল পোষাকে শহর জুঁড়ে ভাগ করে ছড়িয়ে রাখা যায়।
৬। দেয়ালে দেয়ালে ‘এখানে পস্রাব করা ও চিকামারা নিষেধ’ এগুলো লেখার চেয়ে পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট ও পোস্টার বা প্রচারনার জন্য নির্দিষ্ট স্থান ঠিক করে দেয়া অধিক কার্যকরি বলে মনে হয়।
লেখাটা বড় হয়ে যাচ্ছে কিন্তু কথা ফুরোচ্ছেনা। এসব কথা অবশ্য ফুরোয়না। এলাকা নিয়ে আমাদের এত এত স্বপ্ন। আরো একগুচ্ছ পরিকল্পপনা মাথায় ঘুরছে, সেসব এই ছোট্ট পরিসরে লিখে শেষ করা বেশ কঠিন। আমার বিশ্বাস, একটা নগরের ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য দরকার শুধু এলাকার অভিবাবকদের সম্মিলিত ইতিবাচক মনোভাব ও পদক্ষেপ। সারাদেশের অন্যান্য বড় শহরগুলোর সাথে তুলনায় না গিয়ে বান্দরবানের মতো অল্প জনসংখ্যার এই ছোট শহরটাকে নিয়ে ভাবতে হবে একেবারে ভিন্নভাবে। এলাকার প্লান মেকার ও নেতৃত্বস্থানীয় অভিবাবকদের একটু সু-দৃষ্টিই পালটে দিতে পারে আমাদের পুরো শহরটাকে। গড়ে উঠতে পারে পৃথিবীর জন্য আদর্শ ও অতুলনীয় একটি শহর। বিশ্বাস করি সে দিনটা আসবে। ভালো থেকো প্রিয় বান্দরবান।

►লেখক: মং মং সো,চীন থেকে।

আরও পড়ুন
Loading...