রাঙামাটির বাঘাইছড়ি ও বিলাইছড়ি হত্যাকান্ড : নির্বাচনী উৎসব আতঙ্কে পরিনত

মন্তব্য প্রতিবেদন

নির্বাচন নিয়ে পাহাড় থাকে সবসময় উদ্বেগ-উৎকন্ঠা আর আতঙ্কে। কখন কি হয়? কি ঘটে? পাহাড়ের নির্বাচন নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে একেবারে শীর্ষ পর্যায়ের প্রশাসনকে আলাদাভাবে ছক কষতে হয়। থাকতে হয় সর্বোচ্চ সতর্কতায়।

পাহাড় বলে প্রতিটি জনপদেই শংকার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। উপজেলা পরিষদের সবশেষ নির্বাচনটাও বাদ যায়নি সে শঙ্কা থেকে। ভোট গ্রহণের কয়েক ঘন্টার মধ্যে নানিয়রচর, কাউখালী, বাঘাইছড়ি নির্বাচনে প্রার্থীদের ভোট বর্জনের খবর আসছিল। তখন আমাদের একটি টিম বরকলে অবস্থান করছি। সারাদিন কেন্দ্র দখল, ভোট বর্জন, পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্য দিয়ে এবং কোনরকম রক্তপাত না ঘটিয়ে মোটামুটি ভোট গ্রহনের পর্বটা শেষ। স্বস্তির একটি নিঃশ্বাস বেরিয়ে গেল বুক ছিড়ে।

নির্বাচনের আগে আমাদের মিডিয়া কর্মীদের কাছে রিপোর্ট ভাল ছিল না। রক্তপাতের আভাসও ছিল, সে পুর্বাভাসে। কোনকিছুই যখন হয়নি, তাই স্বস্তি। তবে পাহাড় বলে শতভাগ স্বস্তিটা পাচ্ছিলাম না। দিন তো গেল, রাতটা ভালই ভালই গেলে হয়।

জেলা কন্ট্রোল রুমে নির্বাচনের রেজাল্টের জন্য সবাই বসে আছি। একে একে দশ উপজেলার রেজাল্ট আসতে লাগল। সবই ঠিকঠাক। বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিদের চোখে মুখে জয়-পরাজয়ের ছাপ দীর্ঘ হচ্ছে। মুখগুলোকে দেখে দেখেই আমাদের রিপোর্টগুলো তৈরি করছিলাম। কন্ট্রোলরুমে পুরো আবহ অন্যরকম এক আনন্দে ভাসছিল। কিন্তু সেটি দীর্ঘ হলো না একটি মাত্র ফোন কলে! বাঘাইছড়িতে নির্বাচন কর্মকর্তার গাড়িবহরে ব্রাশফায়ার, বহুজন হতাহত। সময় ঠিক সাতটার আশেপাশে হবে। নির্বাচনী ফল সংগ্রহ চাপা পড়ে গেল, এমন অনাকাঙ্খিত ঘটনায়। আমাদের ব্যস্ততা-ত্রস্ততা বেড়ে গেল বাঘাইছড়িকে নিয়ে।

স্থানীয় প্রশাসন, সোর্স, মিডিয়া সহকর্মীদের সাথে প্রতিমুহুর্তে যোগাযোগ চলছে, ঘটনার আপডেট পেতে। যদিওবা তাদের ব্যস্ততা অনেক বেশি। মিডিয়ার কল্যাণে বাঘাইছড়ি তখন, টক অব দা বাংলাদেশ ইভেন ওয়ার্ল্ড। বাঘাইছড়ি থেকে হত্যাকান্ডের নিউজ পেতে কষ্ট হচ্ছিল, একে তো সবাই ব্যস্ত, দুর্গম এলাকা মোবাইল নেটওয়ার্ক খুব বেশি স্ট্রং না, তার উপর পুরো এলাকা থমথমে। সারাদিনের নির্বাচনের উৎসবটা এমনভাবে আতঙ্কে পরিনত হবে কেউ কি জানত?

কি হয়েছিল হঠাৎ করে? ১৮ মার্চ,২০১৯ উপজেলা পরিষদের নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শেষে উপজেলার কংলাক থেকে ব্যালট পেপার বহনকারী গাড়ি নিয়ে প্রিজাইডিং অফিসার আব্দুল হান্নান আরবের নেতৃত্বে আনসার-ভিডিপি সদস্যরা বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে ফেরার পথে নয়কিলো এলাকায় একদল দুর্বৃত্ত ছিনতাইয়ের উদ্দেশে ব্যালট বহনকারী গাড়িটিকে লক্ষ্য করে ব্রাশ ফায়ার করলে ঘটনাস্থলে প্রিজাইডিং অফিসারসহ ৬ জন নিহত হন।

পরে খবর পেয়ে স্থানীয় বিজিবি ও সেনাবাহিনী ও পুলিশের সদস্যরা তাদের উদ্ধার করে বাঘাইছড়ি সদর হাসপাতালে নিয়ে নিয়ে আসে। এরপরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো একজনের মৃত্যু হয়। অবশ্য, এর আগে রাতে ভোট গ্রহণ ও দিনে ভোটারদের কেন্দ্রমুখী হতে না দেওয়ার অভিযোগ এনে বাঘাইছড়ি উপজেলায় ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) চেয়ারম্যান প্রার্থী বড়ঋষি চাকমাসহ তিন ভাইস চেয়ারম্যান পদপার্থী। পরে, হত্যাকান্ডের ঘটনার জন্য বড়ঋষিকেই দায়ি করছে তার প্রতিপক্ষরা।

এমন ঘটনায় কে কোন উপজেলার চেয়ারম্যান হল, কে হারল তা চাপা পড়ে গেল, হত্যাকান্ডের ভারে। পুরো জেলায় তখন থমথমে পরিস্থিতি। স্বস্তিতে নেই খাগড়াছড়িও। শহরের রাস্তাগুলোতে লোকজনের আনাগোনা কমে গেছে। সেনা, বিজিবি ও পুলিশের টহল বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। লোকজন বারবার ফোন দিয়ে জানতে চাইছে, বাঘাইছড়ির সবশেষ আডডেট কি? সবাই ঘন ঘন ঢু মারছে অনলাইন পত্রিকাগুলোতে। ওখানে ঘটনার আপডেট যাচ্ছে।

পাহাড় বার্তায় ক্রল যাচ্ছে..বাঘাইছড়িতে নির্বাচনী কর্মকর্তাসহ নিহত ৬, আহত অনেক..। পাঠকরা বারবার ক্লিক করছে, আমার ইনবক্সে জানতে চাইছে, আপডেট আছে কিনা? এমন এক পরিস্থিতিতে ল্যাপটপ, মোবাইলের মত ডিভাইসগুলোতে চার্জ শেষ হয়ে আসছিল। তারপরও সবশেষ আপডেট দিয়েই পরের দিনের প্রস্তুতি নিয়ে রাত একটায় ঘরে ফেরা। ঘুমাতে গিয়েও চোখে ঘুম আসেনি। জানি না, বাঘাইছড়িতে এখন কি অবস্থা? ইচ্ছে করছিল, সহকর্মীকে ফোন দিই। পরক্ষনে ভাবলাম, থাক, ওদের ওপর দিয়েই তো ঝড়টা গেল। বিরক্ত না করি।

পরদিন নিউজের আপডেট এর জন্য বাসা থেকে বের হতে না হতেই আরো একটি মৃত্যুর খবর। বিলাইছড়ির আওয়ামী লীগ সভাপতিতে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। কনফার্ম হয়েই পাহাড়বার্তা’য় ইনবক্সে দুকলম লিখে দিয়ে লিখলাম বিস্তারিত আসছে..। এই নিউজটায় সর্বপ্রথম পাহাড়বার্তা হয়ে মিডিয়া কর্মীদের গোচরে এল। সবার দৌঁড়ঝাপ শুরু হয়ে গেল। আবারো ব্যস্ততা-ত্রস্ততা। বিলাইছড়ি থেকে লাশ নিয়ে আসা হল। মিছিল হল, ময়নাতদন্ত হল। নিউজের পর নিউজ করতে লাগলাম। আপডেট জানাচ্ছিলাম। লাশ ফিরে গেল বিলাইছড়ি আর আমরা নিউজ করা শেষে যে যার ঘরে। স্বস্থি নিয়ে নয়, উদ্বেগ আর উৎকন্ঠা নিয়ে…না জানি কি ভয়াবহ দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য! তবে, আর কিছুই ঘটেনি..দিন কয়েক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ ছিল, পরে সব ঠিক হয়ে গিয়েছিল। দুদিনের অনাকাঙ্খিত ঝড়ে বিধ্বস্ত পাখির মত আমরাও ক্লান্ত শরীর নিয়ে আরাম খুঁজে নিতে ব্যস্ত হয়ে গেলাম।

দীপ্ত হান্নান: রাঙামাটি জেলা প্রতিনিধি,পাহাড়বার্তা।

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। পাহাড়বার্তার -এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য পাহাড়বার্তা কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।