লামায় পাঁকা ঘরে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেন ১৫ দরিদ্র পরিবার

বান্দরবানের লামা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি দুর্যোধন ত্রিপুরা পাড়ার বাসিন্দা হাতিরাং ত্রিপুরার মেয়ে উনেরুং ত্রিপুরা। বয়স ৬০ ছুঁইছুঁই। তার দুই ছেলে দুই মেয়ে। এর মধ্যে ছোট ছেলে শারীরিক প্রতিবন্ধী। শেষ বয়সেও স্বামী গিলা চন্দ্র ত্রিপুরা অন্যর জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করে কোনো মতে সংসার চালান। কিন্তু অর্থাভাবে ভালো একটি ঘর করতে পারেননি কখনো। তাই একটি মাছাং ঝুপড়ি ঘরে কেটে যায় গত দিনগুলো। কখনো কল্পনা করেননি, বৃদ্ধ বয়সে স্বামীকে নিয়ে পাকা ঘরে শুয়ে বাকি সময় পার করবেন তিনি। ইচ্ছে থাকলেও অভাবের কারণে তা সম্ভব হয়নি। কিন্তু যৌবনের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে আজ। শেখ হাসিনার বিশেষ প্রকল্প ‘সবার জন্য বাসগৃহ’ এ কর্মসূচীর আওতায় দুর্যোগ সহনীয় ঘর পেয়ে তার এ স্বপ্ন পুরণ হলো। শেষ বয়সে পাকা ঘরে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়ে খুশি তিনি। সরকারি ঘরে স্বামীকে নিয়ে নিশ্চিন্তে বাকি সময়টা পার করবেন। নিজের পাকা ঘর পেয়ে আনন্দিত তার স্বামী গিলা চন্দ্র ত্রিপুরাও।

শুধু উনেরুং-গিলা চন্দ্র ত্রিপুরা দম্পতি নয়, উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা নুর জাহান, রুপসীপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা প্রিয়তোষ বড়ুয়া, সরই ইউনিয়নের গিরিশ চন্দ্র ত্রিপুরা, লামা সদর ইউনিয়নের গোপাল কৃষ্ণ দাশ, ফাসিয়াখালী ইউনিয়নের জুবায়ের আজম, আজিজনগর ইউপির মৃদুল কান্তি দাশ ও ফাইতং ইউনিয়নের বাসিন্দা মো: ইসমাইলের পরিবারসহ ১৫ হত দরিদ্র পরিবার পেলেন দুর্যোগ সহনীয় ঘর। আর সরকারের দেয়া এসব ঘর পেয়ে স্বপ্নের মতো ভাবছেন সবাই।

তারা বলেছেন, ভিটে ছিল কিন্তু মাথার ওপর কোনো চাল ছিল না। বৃষ্টিতে ভিজেছেন, রোদে শুকিয়েছেন তারা। মানুষ হয়েও পশু-পাখির চেয়ে খারাপ অবস্থায় দিন কাটালেও দেখার মতো কেউ ছিল না। এখন দিরভর পরিশ্রম করে রাতে কিংবা ঝড়তুফানের সময় এ পরিবারগুলোকে আর কোন বিপদাশংকায় সময় পোহাতে হবেনা।

জানা গেছে, গ্রামীণ এলাকায় যে সকল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সামান্য জমি বা ভিটা আছে, কিন্তু টেকসই ঘর নেই; তাদেরকে ৮০০ বর্গফুট জায়গায় (২শতাংশ) রান্নাঘর ও টয়লেটসহ একটি সেমিপাকা টিনশেড গৃহ (দুই কক্ষবিশিষ্ট) নির্মাণ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরই ধারাবাহিকতায় বরাদ্দ সাপেক্ষে উপজেলার ১টি পৌরসভা ও ৭টি ইউনিয়নে প্রথম পর্যায়ে ১৫টি দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দুর্যোগ সহনীয় গৃহনির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় এ উদ্যোগ নেয়। প্রতিটি দুই লাখ ৫৮ হাজার পাঁচশ ৩১ টাকা করে ঘর নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩৮ লাখ ৭৭ হাজার ৯৬৫ টাকা। আর প্রতিটি ঘরই একটি প্রকল্প হিসেবে ধরা হয়। ইতিমধ্যে নির্মিত ঘরগুলো সুফলভোগীদের মাঝে হস্তান্তর করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার।

ঘর পাওয়া উপজেলার রুপসীপাড়া ইউনিয়নের প্রিয়তোষ বড়ুয়া বসতভিটার মাত্র আড়াই শতক জমিই তার সম্বল। মাটির তৈরি একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করতেন। এরপর সরকারি লোকজন এসে তার ঘরের দৈন্যদশা দেখে নাম লিখে নিয়ে যান। এরপর সরকারি খরচেই পাকা ঘর করে দিয়েছে। তার মতো অভাবী মানুষ বিনা খরচে পাকা ঘরের মালিক হবেনÑ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে বলে জানান ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ছাচিং প্রু মার্মা।

এদিকে সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমরা প্রকৃত সুবিধাভোগী বেছে নিয়েছি। তাই অসহায় ও দুস্থদের মাঝেবা কেবল এ ঘর বিতরণ করা হয়। তবে কাজের বরাদ্দ কম থাকায় কিছু বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে বলে জানান, গজালিয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান বাথোয়াইচিং মার্মা ও ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. জাকের হোসেন মজুমদারসহ সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মজনুর রহমান জানায়, যেসব পরিবারের ভিটেবাড়ি সর্বনিম্ন ৩ থেকে ১০ শতাংশ জমি আছে, কিন্তু মাটি কিংবা বেড়ার ঘর তাদের এ প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রতিটি পরিবারের জন্য যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সেখানে টিনের বেড়ার কথা উল্লেখ থাকলেও ওই টাকায় পাকা দেওয়াল দিয়ে ঘর করা হয়েছে। তিনি জানান, সঠিক তদারকির কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে।

দুর্যোগ সহনীয় ঘর নির্মাণের সত্যতা নিশ্চিত করে প্রকল্প কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার নূর-এ-জান্নাত রুমি বলেন, ঘরগুলোর মেঝে পাকা, উপরে টিন এবং এর সঙ্গে করা হয়েছে একটি পাকা রান্না ঘর ও টয়লেট। এগুলো করতে প্রতিটি পরিবারের জন্য দুই লাখ ৫৮ হাজার ৫৩১ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। ঘর পেয়ে সত্যিই অসহায় মানুষগুলো দারুণ খুশি।

এ বিষয়ে লামা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. মোস্তফা জামাল বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই মহৎ উদ্দেশ্য যাতে সফল হয়; বিশেষ করে উপকারভোগী বাছাই, ঘর নির্মাণ ও কাজের গুণগতমান যাতে বজায় থাকে, সেজন্য উপজেলা পরিষদ ও প্রশাসন সার্বিক মনিটরিং করেছে।

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।