লামায় পাহাড়ীদের জুমের বাগান আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ

বান্দরবানের লামা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি লাংকম পাড়া, জয় চন্দ্র কারবারী পাড়া ও রেংয়েন কারবারী পাড়াবাসীর সৃজিত জুমের বাগান পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি রাবার কোম্পানির বিরুদ্ধে।

এই আগুনে প্রায় ১শ একর জুমের ধান, বাঁশ, আম, কলা, আনারসসহ বিভিন্ন ফলদ বনজ বাগান পুড়ে ক্ষতিসাধিত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত পাড়াগুলোর বাসিন্দাদের অভিযোগ, জমি দখলের জন্য লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের লোকজন বাগানে আগুন লাগিয়ে ক্ষতি সাধন করেন। তবে কোম্পানিটির কর্মকর্তারা আগুন দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তারা শুধু পাহাড় পরিষ্কার করেছেন। কিন্তু কে বা কাহারা আগুন লাগিয়ে এখন তাদের কোম্পানিকে দোষছেন। তিন পাড়ার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিরা ওই জায়গা তাদের দাবী করে অবিলম্বে জুমের বাগান আগুনে পোড়ানো ও ভূমি দখলের ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত করে ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি দখলসত্ব নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কাছে দাবি জানান।

জানা যায়, উপজেলার সরই ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি লুলাইং সড়কের পাশে লাংকম কারবারী পাড়া, জয় চন্দ্র ত্রিপুরা কারবারী পাড়া ও রেংয়েন ম্রো কারবারী পাড়ার অবস্থান। এ তিন পাড়ার ৩৯টি পবিারের প্রায় প্রায় ২০০ নারী পুরুষ ও শিশুর বসবাস। এ পাড়ার লোকজন বংশ পরস্পরায় পাড়াগুলোর আশপাশের প্রায় ৪০০ একর পাহাড়ি জায়গায় জুষ চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কিন্তু ২০১৯ সালে এসে লামা রবার ইন্ড্রাস্টিজ নামের একটি কোম্পানী রাবার প্লটের নামে জোর করে জুমের জায়গা দখলে নিতে অপচেষ্টা শুরু করেন। দখলে বাঁধা দিলে মামলা, হামলা, খুন ও পুলিশের ভয়ও দেখানো হচ্ছে তাদের। ওইসব ভূমি তাদের বংশ পরম্পরায় চাষ করা জুমভূমি এবং বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন বলে দাবি করেন তিন গ্রামবাসীরা।

ম্রো পাড়ার কারবারি লাংকম ম্রো ও বাসিন্দা জন ত্রিপুরা অভিযোগ করে বলেন, ‘লামা রাবার কোম্পানির পরিচালক মো. কামাল উদ্দিনের নির্দেশে গত মঙ্গলবার আমাদের অনেক কষ্টের জুমের বাগান পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তারা আমাদের নিঃস্ব করে দিয়েছে। আমরা কি এই দেশের নাগরিক নই? কেন আমাদের উপর এভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে?’

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তারা আরও বলেন, জুমের বাগের আগুন এক পর্যায়ে আমাদের পাড়ার খুব কাছে চলে আসে। চালে উঠে খাবার পানি ছিটিয়ে আগুনের হাত থেকে ঘরবাড়ি রক্ষা করেছি।’ ঘটনার সময় ধোয়াই ঢেকে যায় পুরো এলাকা। ‘গত ২০ মার্চ এই রাবার কোম্পানির হাত থেকে রক্ষা পেতে জেলা প্রশাসনের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছিলাম। এতেও কাজ হয়নি। এই কোম্পানি আমাদের প্রায় ৩০০ একর জুমের জায়গা দখল করে নিয়েছে। প্রতিবাদ করলে তারা আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করে।’

ওই পাড়ার আরেক বাসিন্দা মটি ত্রিপুরা বলেন, পাড়ার লোকজন ঘটনার দিন কিছু খায়নি। সবাই খুব আতঙ্কে ছিলেন। পাড়ার লোকজনের এখনো আতংক বিরাজ করছে।

এ বিষয়ে ডলুছড়ি মৌজা হেডম্যান যোহন ত্রিপুরা জানান, লামা রাবার ইন্ড্রাস্ট্রিজের লোকজন যে জায়গাগুলো পরিস্কার করছেন কিংবা আগুন দিয়েছেন, মূলত সে জায়গাগুলো লাংকম কারবারী পাড়া, জয় চন্দ্র ত্রিপুরা কারবারী পাড়া ও রেংয়েন ম্রো কারবারী পাড়াবাসীর। তারা বংশ পরস্পরায় ওই জায়গায় জুম চাষের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন।

এদিকে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের পরিচালক কামাল উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা কারো জুমের জায়গায় আগুন লাগাইনি। আগুনের কারণে আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। তাছাড়া বান্দরবান জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে আমরা ৬৪ জন রাবার প্রকল্পের জন্য ১৬০০ একর জায়গা লিজ নিয়েছিলাম। এতে করে ওইসব জায়গা আমাদের। সেখানে আমাদের রাবার বাগান ছিল।

এ ব্যাপারে লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোস্তফা জাবেদ কায়সার জানায়, ‘জুমের বাগানে আগুন লাগানোর ঘটনা শুনে ঘটনাস্থলে সহকারী কমিশনার (ভূমি), ফায়ার সার্ভিস এবং পুলিশ পাঠানো হয়। পাড়ার আশপাশে পানির কোনো উৎস না থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কিছুটা বিঘ্ন ঘটে।’

তিনি জানান,’ঘটনার পরপরই আমি লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সঙ্গে কথা বলি। তারা আগুন লাগানোর অভিযোগ অস্বীকার করেন। এ ঘটনায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিরা থানায় মামলা করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে শুনেছি।

এদিকে লামা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. মোস্তফা জামাল বলেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি ও লামা রাবার ইন্ড্রাষ্টিজের মধ্যে জায়গা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ মিমাংশায় একাধিকবার বৈঠকে হয়েছে। বৈঠকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি পরিবারগুলোর দাবীর প্রেক্ষিতে কোম্পানী কর্তৃক ১৫০ একর জায়গা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। উভয় পক্ষ এ সিদ্ধান্ত মেনেও নিয়েছেন। কিন্তু বৈঠক থেকে বের হলে উভয় পক্ষ আবার উল্টে যান।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।