লামায় ভূমি জালিয়াত চক্র সক্রিয়

২০০৪ সালের মৃত ব্যক্তি জায়গা বিক্রি করলেন ২০১৮ সালে !

বার্ধক্যের ভারে নুয়ে পড়েছেন ৮৫ বছর বয়সী মোমেনা বেগম নামের এক বৃদ্ধ নারী। লাঠিতে ভর করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলেন তিনি। মৃত স্বামীর রেখে যাওয়া এ জায়গায় ৪ মেয়ে ও ১ ছেলেসহ পরিবার পরিজন মিলে বসবাস করছেন। কৃষিকাজ ও দিনমজুরি করে চলে তাদের সংসার। দারিদ্র্যতার সংকটে জর্জরিত ও নিঃস্ব পরিবারটি যখন কোনমতে সংগ্রাম করে চলছিল, ঠিক তখনিই এ পরিবারের উপর পড়ে ভূমি জালিয়াতি চক্রের কুদৃষ্টি। চক্রটি মৃত স্বামীর রেখে যাওয়া বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নের পুলাং পাড়ায় ৩০১নং সরই মৌজার আর/২৩০নং হোল্ডিংয়ের ৪ একর ৫০ শতক জমি জাল বায়নানামা মূলে নামজারী করে নেয়।

জালিয়াতির বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর মানববন্ধন চলাকালীন বৃদ্ধ মোমেনা বেগম কান্না জড়িত কন্ঠে জানায়, তার স্বামী মৃত আব্দুল বারি গাজি ১৯৮২-৮৩ সনে ৪ একর ৫০ শতক জায়গা সরকার থেকে বন্দোবস্তি পায়। দীর্ঘ প্রায় ৪০-৪৫ বছরের অধিক সময় ধরে তারা এ জায়গায় ৭টি বসতবাড়ি, জমিতে চাষাবাদ ও পাহাড়ে গাছ লাগিয়ে ভোগদখল করে আসছেন। এ জমি ছাড়া তাদের আর কোন জায়গা নেই। মাস দুয়েক আগে মোমেনা বেগমের বড় ছেলে আব্দুল হান্নান পিতার নামে জায়গার জবানবন্দি তুললে দেখতে পায় রেকর্ডপত্রে তার বাবার নামে শুধুমাত্র ২০ শতক জায়গা রয়েছে, বাকী ৪ একর ৩০ শতক জায়গা একই ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের মৃত আবুল বশরের ছেলে শাহ আলমের নামে নামজারী হয়ে গেছে। তিনি আরো বলেন, আমার স্বামী মৃত আব্দুল বারি গাজি ২০০৪ সালে মৃত্যুবরণ করে। ২০১৮ সালে কিভাবে আমার মৃত স্বামী শাহ আলমকে জায়গা বিক্রি করলো। কিভাবে আমাদের দখলীয় জায়গা শাহ আলমের নামে হয়ে গেছে আমরা জানিনা। আমি ও আমার সন্তানরা কাউকে জায়গা বিক্রি করিনি। এ জায়গা থেকে উচ্ছেদ হলে আমাদেরকে রাস্তায় থাকতে হবে।

এদিকে বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হলে নিন্দার ঝড় ওঠে। প্রতিকার চেয়ে এমন জালিয়াতির ঘটনা প্রশাসনকে অবহিত করতে এবং দোষীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য পুলাং পাড়াবাসী এক হয়ে মানববন্ধনের ডাক দেয়। তারা গত সোমবার (১৪ ফেব্রুয়ারী) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মৃত আব্দুল বারেক গাজি ওয়ারিশদের বসতবাড়ি ও ৪০-৪৫ বছরের ভোগদখলীয় জায়গা পূণরায় তাদের নামে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবী তুলে পুলাং পাড়াস্থ মসজিদের পাশে শতাধিক নারী পুরুষ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। মানববন্ধনে নেতৃত্ব দেন- মৃত আব্দুল বারি গাজির ছেলে আব্দুল হান্নান (৫৫)। তিনি বলেন, আমাদের মাথা গুঁজার শেষ আশ্রয়টুকু শাহ আলম সহ জালিয়াতি চক্র কেড়ে নেওয়ার পায়তারা করছে। আমাদেরকে বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করতে চাচ্ছে। আমরা এর বিচার চাই।

এ বিষয়ে পুলাং পাড়ার সর্দার মো. আবু দাউদ ও সেক্রেটারি আব্দুল বারেক বলেন, এমন ঘটনায় আমরা হতভম্ব। দীর্ঘ ৪০-৪৫ বছরের অধিক সময় ধরে মোমেনা বেগমরা জায়গায় বসবাস করে আসছে। তারা কাউকে জায়গা বিক্রি না করলেও কিভাবে এই জায়গা অন্যের নামে হয়ে গেল। ভূমি অফিস, রেজিষ্ট্রেশন অফিসের কিছু অসাধু কর্মচারী এবং দলিল লেখক সহ বড় একটি চক্র এই জালিয়াতিতে জড়িত।

এদিকে অভিযুক্ত অভিযুক্ত শাহ আলম বলেন, আমি আব্দুল বারি থেকে ৪ একর ৩০ শতক জায়গা ক্রয় করেছি।

সরই ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইদ্রিস কোম্পানি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, শাহ আলম সহ জালিয়াতি চক্রের সবাইকে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। মোমেনা বেগমের পরিবারটি অসহায়।

লামা থানা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ শহীদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, পুলাং পাড়া বাজারে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। মোমেনা বেগমের পরিবারকে আইনের আশ্রয় নিতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

এবিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কাজী আতিকুর রহমান বলেন, জালিয়াতির ঘটনা শুনার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে আসতে বলেছি। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিব ও দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।