বান্দরবানের আলীকদমে টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে মৎস্য খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আকস্মিক বন্যার পানিতে ভেসে গেছে মাছ চাষের পুকুর ও বাণিজ্যিক মৎস্য প্রকল্পের বিপুল পরিমাণ মাছ। উপজেলা মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৫২ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উপজেলায় নিবন্ধিত মোট ৪৭৮ জন মৎস্যচাষীর মধ্যে অন্তত ৭৯ জন চাষি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
উপজেলার ১ নং আলীকদম সদর, ২ নং চৈক্ষ্যং, ৩নং নয়াপাড়া ও ৪ নম্বর কুরুকপাতা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানি প্রবেশ করে অসংখ্য পুকুর ও মৎস্য প্রকল্প প্লাবিত হয়। কোথাও পুকুরের পাড় ভেঙে গেছে, আবার কোথাও পানির প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে রুই, কাতলা, মৃগেল, তেলাপিয়া, পাঙাশসহ বিভিন্ন প্রজাতির বাজারজাতকরণের উপযোগী মাছ। কয়েক বছরের পরিশ্রমে গড়ে তোলা অনেক চাষির স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেস্তে গেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, অধিকাংশ মৎস্যচাষি ব্যাংক ঋণ, এনজিও ঋণ কিংবা ধারদেনা করে মাছ চাষে বিনিয়োগ করেছিলেন। মাছ বিক্রির উপযুক্ত সময়ের ঠিক আগ মুহূর্তে বন্যার পানিতে সব হারিয়ে তারা এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। নতুন করে মাছ চাষ শুরু করার মতো পুঁজি অনেকেরই হাতে নেই।
ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষি বিধু মল্লিক বলেন, তিন খণ্ড জমির ওপর মাছের পুকুর করেছি। পোনা, খাবার ও পরিচর্যায় অনেক টাকা ব্যয় করেছি। আর কিছুদিন পর মাছ বিক্রি করার কথা ছিল। কিন্তু পাহাড়ি ঢলে পুকুর ডুবে সব মাছ ভেসে গেছে। আমার প্রায় ৬ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখন কীভাবে ঋণ পরিশোধ করব, বুঝতে পারছি না।

আরেক মৎস্যচাষি দিপু তঞ্চঙ্গা বলেন, মাছ চাষই ছিল আমাদের পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। নিজের সঞ্চয় ও ধারদেনা করে পুকুরে মাছ ছেড়েছিলাম। বন্যার পানিতে সব শেষ হয়ে গেছে। সরকারি সহায়তা ছাড়া আবার ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আমেনা বেগম জানান, “আমি মাছের প্রকল্পটি দেখাশোনা করি। বন্যার পানি উঠে পুকুরের সব মাছ চলে গেছে। এতে প্রায় ৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
এ বিষয়ে আলীকদম উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো আসাদুজ্জামান বলেন, উপজেলায় মোট ৪৭৮ জন মৎস্যচাষী রয়েছেন। এর মধ্যে ৭৯ জন চাষির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে মৎস্য খাতে প্রায় ৫২ লাখ টাকার ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে। মৎস্য বিভাগ, পার্বত্য জেলা পরিষদ, বিভিন্ন এনজিওসহ অন্যান্য খাত থেকে চাষিদের জন্য কোনো প্রণোদনা বরাদ্দ দেওয়া হলে ক্ষতির পরিমাণ অনুযায়ী তা বিতরণ করা হবে।
তিনি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের তথ্য সংরক্ষণ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হচ্ছে, যাতে দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা যায়।
ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের দাবি, ক্ষয়ক্ষতির সঠিক মূল্যায়ন করে দ্রুত সরকারি প্রণোদনা, আর্থিক সহায়তা, মাছের পোনা, খাদ্য এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হোক। অন্যথায় পুঁজি হারানো অনেক চাষির পক্ষে নতুন করে মাছ চাষে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়বে। এতে স্থানীয় মাছ উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


