খাগড়াছড়ি-২৯৮ : পাহাড়ি ভোটের চ্যালেঞ্জ ও রাজনৈতিক সমীকরণ

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে খাগড়াছড়ি-২৯৮ আসনের রাজনৈতিক চিত্র নজর কাড়ছে। প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে এখানকার পাহাড়ি জনগোষ্ঠী চায় নিজেদের প্রার্থী—যিনি সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবেন। তবে বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। ইতিহাস বলে এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী কখনও সংসদ সদস্য হতে পারেনি। সবসময় বিজয়ী হয়েছে জাতীয় দলের মনোনীত প্রার্থী।

এবারও পরিস্থিতি কম জটিল নয়। ১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে চারজন মাঠে সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে দেখা করছেন। তবে শুধু প্রচারণা নয়, মোবাইল ফোন ও স্থানীয় সমর্থক ব্যবস্থার মাধ্যমে ভোটারদের প্রত্যাশা পূরণে যথাসাধ্য চেষ্টা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা।

দু’জন স্বতন্ত্র প্রার্থী বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছেন। ধর্ম জ্যোতি চাকমা ঘোড়া মার্কায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং পাহাড়ি অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। অন্যদিকে সমীরণ দেওয়ান ফুটবল মার্কায়, দলীয় মনোয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে উঠেছেন। এই দুই প্রার্থীর কারণে পাহাড়ি ভোটারদের মধ্যে তুমুল আলোচনা চলছে—কাকে ভোট দিলে তাদের প্রত্যাশা পূরণ হবে।

এদিকে জাতীয় দলগুলো—বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামি—ও পিছিয়ে নেই। পাহাড়ি-বাঙালি ভোটারদের কাছে তারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। স্থানীয় পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পাহাড়ি ভোটারদের প্রায় ২০ শতাংশ জাতীয় দলের দখলে, যার মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ৫ শতাংশ বা তার কম ভোট পেতে পারে। বাকিরা প্রধানত বিএনপির দিকে। বাকী ৮০ শতাংশ পাহাড়ি ভোটারদের মধ্যে ঘোড়া মার্কা ৪৫–৫০ শতাংশ ভোট এবং ফুটবল ৩০–৩৫ শতাংশ ভোট পেতে পারে। তবে ঘোড়া মার্কা জয়ী হতে হলে ফুটবল মার্কার কিছু ভোট প্রয়োজন।

এখানেই সমস্যার মূল। নির্বাচনী সময়ে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি ও পক্ষপাতিত্বের কারণে পাহাড়ি ভোট একত্রিত হয় না। স্বতন্ত্র প্রার্থী কাদা ছুড়াছুড়িতে মগ্ন হলে শেষ পর্যন্ত জাতীয় দল সুবিধা পায়। ইতিহাস ও এই নির্বাচনের পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, বিএনপি এই আসনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। জামায়াত ইসলামী তাদের কাছাকাছি যেতে চেষ্টা করবে, কিন্তু স্বতন্ত্র দুই প্রার্থী শেষ পর্যন্ত ভোট বিভাজনে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

ফলে, খাগড়াছড়ি-২৯৮ আসনের নির্বাচনের চাবিকাঠি হলো পাহাড়ি ভোটের ঐক্য। নির্বাচনের দিন—১২ ফেব্রুয়ারি—এই চূড়ান্ত সমীকরণ দেখাবে, কার রাজনৈতিক কৌশল ও জনপ্রিয়তা জয়ী হতে পারবে। তবে যে সত্যি চোখে পড়ে, তা হলো—পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভোট বিভাজন এখনও জাতীয় দলকে সুবিধা দিতে যথেষ্ট।

শেষ কথাঃ এই আসনের রাজনীতি কেবল দলীয় নয়; এটি পরিচয়, ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং স্থানীয় স্বার্থের সংমিশ্রণ। তাই খাগড়াছড়ির ভোট মানে কেবল কাগজে ভোট দেওয়া নয়, বরং পাহাড়ি মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে জাতীয় রাজনীতির কৌশল মিলিয়ে একটি জটিল সমীকরণ তৈরি হয়।

আরও পড়ুন