দারিদ্র্যের কাছে হার মানতে বসেছে তানিয়ার জীবন

অভাবের সংসারে বাবার বোঝা কিছুটা কমবে এবং মেয়েটারও একটি ভালো ভবিষ্যৎ হবে এমনই আশায় দেড় বছর আগে সাড়ে ৯ বছর বয়সী মেয়ে তানিয়াকে গৃহকর্মীর কাজে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন দিনমজুর বাবা বেলাল হোসেন। কিন্তু সেই আশার পথ ধরে যে মেয়েটি বাড়ি ছেড়েছিল, তার স্বপ্ন তো পূরণ হয়নি, বরং দেড় বছর পর সে ফিরে এসেছে ক্ষত-বিক্ষত, পোড়া ও পচনধরা শরীর নিয়ে। এখন খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছে ১১ বছর বয়সী এই শিশু গৃহকর্মী।

​খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের বারান্দায় বিছানা করে শুয়ে আছে তানিয়া। শিশুটির শরীরজুড়ে রয়েছে নির্মম নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন। ফাটা মাথায় একাধিক সেলাই, পিঠে গভীর ক্ষত হয়ে পচন ধরেছে। এমনকি দুই পায়েও পচন ধরেছে তানিয়ার। দীর্ঘদিনের অপুষ্টিতে ভুগে পুরো শরীর এখন হাড্ডিসারে পরিণত হয়েছে।

​জানা যায়, তানিয়ার বাড়ি খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার আমতলী ইউনিয়নের করল্যাছড়ি গ্রামে। প্রায় পাঁচ বছর আগে তার মা মারা যান। মা মারা যাওয়ার পর দুই মেয়েকে নিয়ে বেলালের সংসারে চরম অভাব নেমে আসে। তখন স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছিল তানিয়া। একপর্যায়ে প্রতিবেশী তোফাজ্জল হোসেনের মাধ্যমে তাকে গৃহকর্মীর কাজে ঢাকায় পাঠাতে রাজি হন বাবা বেলাল। তবে মেয়েকে ঢাকার কোন ঠিকানায় কিংবা কার কাছে নেওয়া হচ্ছে, তার কিছুই জানতেন না তিনি। তোফাজ্জল প্রথমে ফেনী শহরের ট্রাঙ্ক রোডের বড় মসজিদ সংলগ্ন একটি বাসায় তানিয়াকে কাজে দেন। পরবর্তীকালে সেখান থেকে ওই বাড়ির গৃহকত্রী ঢাকায় তাঁর বোনের বাসায় তানিয়াকে পাঠিয়ে দেন।

​তানিয়া জানায়, ঢাকার মিরপুরের একটি বাড়িতে তাকে রাখা হয়েছিল। সে জানায়, বাড়ির গৃহকর্তার নাম রাসেল এবং গৃহকর্ত্রীর নাম ছোটন। রাসেলের মিরপুরে ল্যাপটপের দোকান রয়েছে এবং তাঁর স্ত্রী একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তানিয়া অভিযোগ করে বলে, ওই বাড়িতে তার প্রতিটি দিন কাটত চরম ভয় আর অমানুষিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে। তাকে ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না। সামান্য ভুলেই শরীরের বিভিন্ন স্থানে গরম খুন্তি দিয়ে আগুনের ছ্যাঁকা দেওয়া হতো। দিনের অধিকাংশ সময় তাকে টয়লেটে আটকে রাখা হতো। দেড় বছর ধরে বাবার সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগও করতে দেওয়া হয়নি বলে জানায় শিশুটি।

প্রতিবেশী তোফাজ্জল হোসেন বলেন,তার কথা বেলাল হোসেন মেয়েকে দেড় বছর আগে গৃহকর্মীর কাজে ঢাকায় পাঠাতে রাজি হন।

বেলাল হোসেন জানান,মা হারা মেয়েকে ভালো ভবিষ্যতের আশায় প্রমিবেশি ৪েতাফাজ্জল হোসেন মাধ্যমে তানিয়াকে পাঠানো হয়। যা কাছে পাঠানো হচ্ছে তার ঠিকানাটিও জানতেন না অসহায় তিনি। প্রতিবেশী তোফাজ্জলের মাধ্যমে প্রথমে ফেনী শহরের ট্রাংক রোড বড় মসজিদ-সংলগ্ন একটি বাসায় তানিয়াকে দিয়ে আসেন বেলাল। পরে তাকে পাঠানো হয় ঢাকায়। তানিয়া ঠিকানা বলতে না পারলেও জানিয়েছে, তাকে মিরপুরের একটি বাড়িতে রাখা হয়। ওই বাড়ির গৃহকর্তার নাম রাসেল, গৃহকর্ত্রীর নাম ছোটন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গৃহকত্রীর নাম মোর্শেদা আক্তার শেওড়াপাড়া ঢাকা(এনআইডি) মতে।

​খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. রিপল বাপ্পী চাকমা জানান, শিশুটির শরীরে দীর্ঘ সময় ধরে চলা নির্যাতনের তীব্র চিহ্ন রয়েছে। তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। শিশুটিকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

​এদিকে নির্মম এই ঘটনার পরও এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিসবাহ উদ্দিন জানান, অঘটনটি ঢাকায় সংঘটিত হওয়ায় স্থানীয় থানায় সরাসরি মামলা গ্রহণ বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই, তবে সংশ্লিষ্ট থানাকে বিষয়টি অবহিত করার প্রক্রিয়া চলছে।

আরও পড়ুন