মিজোরাম থেকে থানচি ফিরলেন ১৮ বম সদস্য
দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ভারতের মিজোরামে আশ্রয়ের বান্দরবানের থানচি উপজেলার মাতৃভূমিতে ফিরেছেন বম সম্প্রদায়ের তিন পরিবারের ১৮ সদস্য। স্বদেশে পৌছে কোমল মতি শিশুদের হাতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তুলে দেওয়া হলে তাদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে স্বস্তি, আনন্দ ও আবেগ।
গত রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় সেনাবাহিনীর বাকলাই সাব-জোন ক্যাম্পের সহায়তায় তাদের নিজ গ্রামে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন, থানচি সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের শেরকর পাড়ায় দুই পরিবারের ১৫ সদস্য, একই ওয়ার্ডের প্রাতা পাড়ায় ১ পরিবারের তিন সদস্য রয়েছেন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শিশু ও কিশোরও রয়েছে।
বাকলাই সাব-জোন ক্যাম্পের কমান্ডার ক্যাপ্টেন সাফকাত মুবাররাত চৌধুরী প্রতিটি পরিবারকে নগদ ১৫ হাজার টাকা, ৫০ কেজি চাল, ১০ কেজি ডাল, ৫ লিটার তেল, ৫ কেজি পেঁয়াজ, ৫ কেজি আলু, ৫ কেজি লবণ, একটি সোলার প্যানেল, একটি ব্যাটারি, বালতি-মগ, পাতিল, প্লেট ও গ্লাসসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী দেওয়া হয়। এ সময় তিনি শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন ও তাদের আদর করেন। শেরকর পাড়ার কারবারি তুমথন বম ও প্রাতা পাড়ার কারবারি পার্কেল বম উপস্থিত ছিলেন।
পরিবারের প্রধান ভানরৌখম বম ও লালচম বম জানান, ২০২৪ সালে থানচি ও রুমা উপজেলায় সংঘটিত ব্যাংক ডাকাতির ঘটনার নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতিতে তারা পরিবার নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের মিজোরামে আশ্রয় নেন। দীর্ঘদিন অবস্থানের স্বদেশ ও মাতৃভূমিতে ফিরে এসে স্বস্তি প্রকাশ করেন।
ভানরৌখম বম বলেন, মাতৃভূমি ও স্বদেশ ছেড়ে অন্য দেশের কখনো নিজের বাড়ির মতো লাগে না। মাতৃভূমি গ্রামে ফিরতে পেরে ভালো লাগছে। নিজের মাটি ও মানুষের কাছে ফিরে এসেছি—এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ।”
রুয়াতখুপ বম বলেন, বাড়িঘর, আত্মীয়-স্বজন ও নিজের পাড়ার কথা সবসময় মনে পড়ত। মিজোরামে থাকলেও মন পড়ে থাকত স্বদেশে। অনেক দিন পর আবার নিজের জায়গায় ফিরেছি।”
লালচম বম বলেন,স্বদেশ ও মাতৃভূমি ছেড়ে সুখে ছিলাম না। নানা কষ্টের মধ্যে সময় পার করেছি। এখন নিজের পাড়ায় ফিরে এসেছি। পরিবার নিয়ে শান্তিতে থাকতে চাই।
জানা যায়, ২০২২-২৩ সালের দিকে এলাকায় নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির কারণে তারা বিভিন্ন সময় জঙ্গলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। পরে ২০২৪ সালে থানচি ও রুমা উপজেলায় ব্যাংক ডাকাতির ঘটনার পর নিরাপত্তার কারণে সীমান্ত পেরিয়ে মিজোরামে চলে যান।
তারা জানান, চলতি বছর বম সোশ্যাল কাউন্সিলের নেতৃবৃন্দ ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে মিজোরামে অবস্থানরত পরিবারগুলোর কাছে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং নিরাপদে ফিরে আসার বিষয়ে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। বম সমাজের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে দেশে ফেরার বিষয়ে আস্থা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত তারা স্বদেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন।
সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১২ সেপ্টেম্বর মিজোরাম হয়ে হরিণা ও রাঙামাটি দিয়ে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। পরদিন ১৩ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রাঙামাটি থেকে তাদের বাকলাই পাড়া সাব-জোন ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়। সেখানে সেনাসদস্যরা তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। পরে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে পরিবারগুলোকে নিজ নিজ পাড়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়।
বাকলাই সাব-জোন ক্যাম্পের কমান্ডার ক্যাপ্টেন সাফকাত মুবাররাত চৌধুরী বলেন, দীর্ঘ দুই বছর পর পরিবারগুলো স্বদেশে ফিরে স্বস্তি প্রকাশ করেছে। শিশুদের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দেওয়ার মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। তাদের নিরাপদ বসবাস ও পুনর্বাসনে সেনাবাহিনী প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
তিনি বলেন, তিন পরিবারের এই প্রত্যাবর্তন শুধু ঘরে ফেরার ঘটনা নয়; এটি শেকড়ের টান, স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রত্যয়ের প্রতীক।


