পাহাড়ের কোলে এক চিলতে স্বর্গ : পিটুনিয়ায় রঙিন শীতের হর্টিকালচার

​সবুজের পটভূমিতে ক্যানভাসে আঁকা কোনো ছবি নয়, এ যেন মাটির বুকে হাজারো তুলির আঁচড়। প্রবেশপথ থেকে যতদূর চোখ যায়, ততদূর শুধুই রঙের বন্যা। বেগুনি, সাদা, গোলাপি, লাল যেন প্রকৃতির বর্ণিল উৎসব। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা হর্টিকালচার সেন্টারে এখন চলছে মনমাতানো পিটুনিয়া ফুলের বাহার। পাহাড়ের কোলে এক টুকরো স্বর্গের খোঁজে ভিড় করছেন স্থানীয় পর্যটক ও ফুলপ্রেমীরা।

​মাটিরাঙ্গা উপজেলা সদর থেকে সামান্য দূরেই হর্টিকালচার সেন্টারের অবস্থান। সাধারণত ফুল আর ফলের চারা উৎপাদন আর কৃষি গবেষণার জন্য পরিচিত এই কেন্দ্রটি শীতের শুরু থেকেই নিজেকে এক অন্য রূপে সাজিয়ে তুলেছে। ভিন্ন ভিন্ন শেডের পিটুনিয়ার সারি সারি টবে তৈরি হয়েছে এক দৃষ্টিনন্দন বাগান।

​বিদেশি এই ফুলটি শীতপ্রধান অঞ্চলের হলেও এখানকার নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া যেন একে আপন করে নিয়েছে। টবে টবে থোকা থোকা পিটুনিয়াগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, দেখলে মনে হবে কোনো দক্ষ শিল্পী রং ছিটিয়ে দিয়েছেন। ফুলের বিন্যাস এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে প্রতিটি রঙের বৈপরীত্য আর সতেজতা সহজেই চোখ টানে। হালকা বাতাসে পিটুনিয়ার পাপড়িগুলোর মৃদু দোলানি সৃষ্টি করছে এক প্রাণ জুড়ানো দৃশ্য।

হর্টিকালচার সেন্টার থেকে জানা যায়, পিটুনিয়া সাধারণত ২০–২৫ রঙের হয়ে থাকে। এখানে বর্তমানে ৭টি রঙের ফুল রয়েছে। একই সঙ্গে ১২০টি টবে মোট ৪০০টি চারা রয়েছে। ইতিমধ্যে কিছু টবে ফুল ফুটেছে, আর কয়েক দিনের মধ্যেই সব টবেই ফুল ফুটবে।

মাটিরাঙ্গা হর্টিকালচার সেন্টারের ভেতরে ঢুকতেই যেন এক টুকরো রামধনুর ঝলক এসে লাগে চোখে। বাহারি রঙের পিটুনিয়ার সারি কোথাও গাঢ় লালের সঙ্গে তুষার-সাদা মিশে ডাবল পিটুনিয়া ফুটে আছে রাজকীয় ভঙ্গিতে, আবার কোথাও গোলাপি-সাদা মিশ্রণে মনকাড়া একরাশ ফুল ঝুঁকে পড়েছে পথের দু’পাশে।

একটু দূরে ছোট ছোট চারাগাছের সারি লাল, হলুদ, বেগুনি, সাদা যেন কোনো শিল্পীর প্যালেট থেকে সবে রং ছিটকে এসেছে মাটিতে। মাঝখানে ছিমছাম সরু পথটা বয়ে গেছে সাপের মতো, দু’পাশে ফুলের দেওয়াল। হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, কোনো স্বপ্নিল ইউরোপীয় গার্ডেনে হারিয়ে গেছি। পিটুনিয়ার এই রঙিন জগতের বাইরেও চোখ জুড়িয়ে যায়। এখানে ওখানে ছড়িয়ে আছে উন্নত জাতের শাক সবজি, ফুল এবং সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে বিভিন্ন ফলের গাছে। এরা সবাই যেন ভবিষ্যতের ফলের বাগানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। চোখ যেদিকে যায়, সেদিকেই শুধু রং আর সৌন্দর্যের অবিরাম ঢেউ।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মানুষের ভিড় লেগেই থাকে। কেউ পরিবার নিয়ে এসেছে, কেউ বা বন্ধুবান্ধব। বাচ্চারা ছুটোছুটি করে ফুলের পাপড়ি ছোঁয়, বুড়ো-বুড়িরা বেঞ্চে বসে হারানো যৌবনের গল্প করে। তরুণ-তরুণীরা সেলফির জন্য সবচেয়ে রঙিন কোণ খুঁজে বেড়ায়, কখনো পিটুনিয়ার সামনে ঝুঁকে পড়ে, কখনো গোলাপি ফুলের গালিচায় শুয়ে পড়ে। ক্যামেরার শাটারের শব্দ আর হাসি-ঠাট্টায় বাগানটা যেন আরো জ্যান্ত হয়ে ওঠে।

NewsDetails_03

আর সবচেয়ে সুন্দর কথা এই বাগানটা শুধু দেখার জন্য নয়, নিয়ে যাওয়ার জন্যও। যে কেউ পছন্দের চারা কিনে নিয়ে যেতে পারে নিজের বারান্দায়, ছাঁদে, উঠোনে। ফলে এই রঙিন সৌন্দর্য শুধু এখানেই থেমে থাকে না হাজারো বাড়ির জানলায়, গ্রামের উঠোনে, শহরের ব্যালকনিতে ছড়িয়ে পড়ে। যেন একটা বাগান থেকে আরেকটা বাগান জন্ম নেয়, একটা হাসি থেকে হাজারো হাসি।

সারাদিনের ক্লান্তি মুছে যায় এখানে আসলেই। আর ফেরার পথে মনে হয়, এক টুকরো শরৎকাল পকেটে ভরে নিয়ে যাচ্ছি বাড়ি।

চৌধুরী পাড়া থেকে পরিবার নিয়ে এসেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী ফাহিম । মুগ্ধতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “পাহাড়ের রুক্ষতার মাঝে এমন নরম আর প্রাণবন্ত ফুলের মেলা সত্যিই অভাবনীয়। ছবি তোলার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর হয় না। পিটুনিয়ার এমন সতেজতা সাধারণত শহরে খুব একটা দেখা যায় না।”

উপ-সহকারী উদ্যান কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির জানান, পিটুনিয়া চাষে খরচ কম, পরিচর্যাও সহজ। একবার চারা রোপণ করলে তিন-চার মাস ফুল পাওয়া যায়। এ ছাড়া ফুল শুকিয়ে গেলেও নতুন কুঁড়ি গজায়। ফলে বাণিজ্যিকভাবেও এর চাহিদা বাড়ছে।

মাটিরাঙ্গা উপজেলা উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুম বলেন, শীতের সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর ফুলগুলোর তালিকায় এই ফুলটির নাম সবার আগে আসে। টবেই যেন এর আসল রূপ ফুটে ওঠে। রঙ, গন্ধ আর কোমল পাপড়ির সমাহার চোখ জুড়িয়ে দেয়। তবে যতটা সুন্দর, ততটাই সংবেদনশীল এই গাছ। গাছের গোড়ায় সামান্য বৃষ্টির পানি জমলেই নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

বর্তমানে প্রতিটি টবসহ ফুল ১০০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। আর যারা ঘরে-বারান্দায় শখের চাষ করতে চান, তাদের জন্য প্যাকেটের চারা মিলছে মাত্র ২০ টাকায়।

পিটুনিয়া চাষের জন্য মাটিরাঙ্গার পরিবেশকে অত্যন্ত উপযোগী জানিয়ে তিনি আরো বলেন,“শীতকালে মাটিরাঙ্গায় যে ফুলচাষ সম্ভব, এই প্রদর্শনীই তার প্রমাণ। ভবিষ্যতে পিটুনিয়া স্থানীয় অর্থনীতিতেও অবদান রাখতে পারে।”

আরও পড়ুন