প্রথাগত নেতৃত্বে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি : ইখিন চৌধুরীর স্বপ্ন, সংগ্রাম ও প্রত্যয়
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি ও বাজার ব্যবস্থাপনার রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। ১৮৬০ সালের ২০ জুন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা গঠনের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে প্রথম ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আইন ও বিধির ধারাবাহিকতায় ১৯০০ সালে প্রণীত হয় ‘চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশন’, যা পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৯০০ সালের শাসনবিধি নামে পরিচিত। এই বিধির অধীনেই ১৯৩৭ সালে প্রণীত হয় ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম বাজার ফান্ড বিধিমালা’। ভূমি ব্যবস্থাপনার জন্য হেডম্যান এবং বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য বাজার চৌধুরী পদ সৃষ্টি করা হয়।
দীর্ঘদিনের এই প্রথাগত ব্যবস্থার মধ্যেই ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন খাগড়াছড়ির উচ্চশিক্ষিত তরুণী ইখিন চৌধুরী। খাগড়াছড়ি জেলার সর্বকনিষ্ঠ নারী হেডম্যান ও বাজার চৌধুরী হিসেবে একই সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। বাবা সুইলাপ্রু চৌধুরী ২০২০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মারা গেলে পদ দুটো শূন্য হয়। তাই বাবার অবর্তমানে অল্প বয়সেই তাঁর কাঁধে এসে পড়ে এই দায়িত্ব। ২০২২ সালের ১ ডিসেম্বর দাদা প্রয়াত চাইথোয়াইঅং চৌধুরীর নাতনি হিসেবে তৃতীয় প্রজন্মের উত্তরসূরি হয়ে তিনি এই দায়িত্ব লাভ করেন।
খাগড়াছড়ি শহরে বেড়ে ওঠা ও বসবাস হলেও তাঁর দায়িত্বাধীন মৌজা পানছড়ি উপজেলার সীমান্তবর্তী ২৪২ নম্বর পুজগাং মৌজা। অন্যদিকে, বাজার চৌধুরী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পানছড়ি উপজেলা সদরের পানছড়ি বাজারে।
কৃষি ও জুমচাষনির্ভর পুজগাং মৌজায় চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাঁওতাল ও বাঙালি—মুসলিম, হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। ছোট-বড় মিলিয়ে এখানে রয়েছে প্রায় ৫০টি পাড়া। হেডম্যান হিসেবে মৌজার ভূমি ব্যবস্থাপনা, জমি বণ্টন, কৃষি ও জুমচাষের জমি নির্ধারণ, ভূমিসংক্রান্ত নথিপত্র সংরক্ষণ এবং সরকারি রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পালন করতে হয় তাঁকে। পাশাপাশি প্রথাগত আইনের আওতায় স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তি, বিচার-সালিশ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে হয়। মৌজার বনজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণেও হেডম্যানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকাল থেকেই এসব দায়িত্ব পালন করে আসছেন ইখিন। একই সঙ্গে পানছড়ি বাজারের বাজার চৌধুরী হিসেবে বাজারের প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রম সমন্বয়, বাণিজ্যিক প্লটের কর আদায়সহ বিভিন্ন দায়িত্ব সামলাতে হয় তাঁকে।
দুটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে ইখিন মনে করেন, হেডম্যানের কাজ কেবল রাজস্ব আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভূমি ব্যবস্থাপনা, সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তি, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয়। অথচ এসব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।
তিনি জানান, তিন বছরের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করলেও সরকারি পর্যায়ে এখনো কোনো প্রশিক্ষণ পাননি। বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে কিছু প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ হয়েছে। এ ছাড়া বাবার সহকারী মেমং চৌধুরীর সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা থেকেও অনেক কিছু শিখেছেন। তবে তাঁর মতে, শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কিংবা পূর্বসূরিদের সহযোগিতার ওপর নির্ভর না করে হেডম্যানদের জন্য নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কারণ, সবার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ সহকারীর সহযোগিতা পাওয়ার সুযোগ থাকে না।
বাজার ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে ইখিন বলেন, বাজার এলাকার প্লটের মূল্য তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সেখানে জমি ও প্লটসংক্রান্ত বিরোধও বেশি। এসব এলাকায় অপেক্ষাকৃত বিত্তশালী ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীদের বসবাস। ফলে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নানা ধরনের চাপ ও জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়।
খাগড়াছড়ি শহরের সানফ্লাওয়ার ও নতুন কুঁড়ি ক্যান্টনমেন্ট হাইস্কুলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন ইখিন। পরে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) থেকে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
শৈশব থেকেই সমাজে প্রচলিত কিছু নেতিবাচক প্রথা ও ধারণার বাইরে গিয়ে কাজ করার আগ্রহ ছিল তাঁর। বর্তমানে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা, পাহাড়িদের প্রথাগত আইন, সম্পত্তিতে নারীর অধিকার এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর টেকসই জীবনযাপন নিয়ে ভাবছেন তিনি। সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে সমাজ ও মানুষের জীবনকে কাছ থেকে বোঝার সুযোগ পেয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই উপলব্ধি করেছেন, পাহাড়ের প্রথাগত আইন ও সামাজিক কাঠামোয় ভূমি ও সম্পত্তিতে নারীর উত্তরাধিকারের প্রশ্নটি এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।
নিজের হেডম্যান হওয়ার পথটিও সহজ ছিল না। বাবা সুইলাপ্রু চৌধুরীর মৃত্যুর পর আইনগতভাবে হেডম্যান পদে নিয়োগের আবেদন করেন তিনি। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। ইখিন বলেন, নিজের আত্মীয়স্বজনের মধ্যেও অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘এটা তো হেডম্যান, হেডওমেন নয়।’ অর্থাৎ তাঁদের ধারণা ছিল, হেডম্যান পদটি কেবল পুরুষদের জন্যই নির্ধারিত।
ইখিনের ভাষ্য, তিন পার্বত্য জেলায় নারী হেডম্যানের সংখ্যা এখনো খুবই সীমিত। সেখানে একজন নারীর বাজার চৌধুরী হিসেবে দায়িত্ব পালন আরও বিরল ঘটনা। প্রচলিত ধারণা ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করেই তিনি দুটি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে মৌজা ও বাজারের অংশীজন, জনপ্রতিনিধি, জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসন, মৌজাবাসী ও কারবারিদের সহযোগিতা তাঁর পথচলাকে সহজ করেছে।
নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ভূমি ও সম্পত্তির উত্তরাধিকারে নারীর অবস্থান সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ আরও গভীর হয়েছে। সিএইচটি নারী হেডম্যান-কার্বারী নেটওয়ার্ক, জেলা হেডম্যান অ্যাসোসিয়েশন’র সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে পাহাড়ি সমাজে নারীর অধিকার ও বাস্তবতা সম্পর্কে বিশদ ধারণা পেয়েছেন তিনি।
তরুণ বয়সে নারী হিসেবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে যেমন চ্যালেঞ্জের, তেমনি সম্ভাবনারও। ইখিন বলেন, প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর বয়স ও দায়িত্বের কারণে অনেকেই আগ্রহ নিয়ে তাঁর কাজ সম্পর্কে জানতে চান এবং উৎসাহ দেন। তবে কখনো কখনো মৌজায় কাজ করতে গিয়ে বয়স কম হওয়া এবং নারী হওয়ার কারণে তাঁকে যথাযথ গুরুত্ব না পাওয়ার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তাঁর সক্ষমতাকে খাটো করে দেখার প্রবণতা লক্ষ করেছেন তিনি।
এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও দায়িত্বশীল ও পরিণত নেতৃত্বের দিকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর বিশ্বাস, নেতৃত্বের অবস্থানে থেকে সমাজের বিদ্যমান বৈষম্য ও প্রতিবন্ধকতা নিয়ে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়। হেডম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি একটি নারীবান্ধব, সমতাভিত্তিক ও মানবিক সমাজের স্বপ্ন দেখেন।
নারীর অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতা সম্পর্কে ইখিনের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট। তাঁর মতে, নারীর শরীর, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, মতপ্রকাশ, বিয়ে, সন্তান ধারণ কিংবা সাজসজ্জা—প্রতিটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নারীর নিজের। তাঁর বিশ্বাস, ‘শরীর আমার, সিদ্ধান্তও আমার।’ এগুলো কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; বরং ব্যক্তি হিসেবে প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকার। সমাজে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত যেসব রীতি ও প্রথা নারীর স্বাধীনতাকে সীমিত করে রেখেছে, সেগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। প্রচলিত সব জ্ঞান, সংস্কার ও সামাজিক বিশ্বাসকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা যায় না। নারীর অভিজ্ঞতা, অবস্থান ও অধিকারকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে সমাজকে নতুনভাবে ভাবার বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয়ী হেডম্যান ইখিন।
একজন নারী হেডম্যান এবং নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে ইখিন মনে করেন, পাহাড়ের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ, প্রথাগত আইনের প্রতি সম্মান, স্বজনপ্রীতির পরিবর্তে নিরপেক্ষতা এবং যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি।
নারীর অধিকার, সামাজিক বৈষম্য ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে নিজের ভাবনা ও উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে কাজ করে যেতে চান ইখিন। তাঁর কাছে নেতৃত্ব কেবল একটি পদ বা দায়িত্বের নাম নয়; বরং সমাজের মানুষের পাশে দাঁড়ানো, প্রচলিত বৈষম্যকে প্রশ্ন করা এবং পরিবর্তনের পথ তৈরি করার একটি সুযোগ।
তিনি এমন একটি দেশের স্বপ্ন দেখেন, যেখানে নারীকে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হবে না; যেখানে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার সম্মানিত হবে এবং জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ কিংবা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে প্রত্যেকে মর্যাদা ও সমান অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারবে। তাঁর স্বপ্ন একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন, মানবিক ও নারীবান্ধব দেশ—যেখানে নেতৃত্বের পরিচয় নির্ধারিত হবে লিঙ্গ দিয়ে নয়, বরং যোগ্যতা, সততা, দায়িত্ববোধ ও কাজের মাধ্যমে।


