ভোরে শিউলির সুবাসে হেমন্তের ডাক

ছয় ঋতুর বাংলাদেশে প্রকৃতি সাজে নানা রঙে, নানা রূপে। বর্ষার অবিরাম বৃষ্টি আর শরতের সাদা কাশফুলের সৌন্দর্য পেরিয়ে প্রকৃতির দুয়ারে এখন হেমন্ত। শিশিরভেজা ঘাস, ভোরের হালকা কুয়াশা, সোনালি ধানের শিষ আর মাঠজুড়ে কৃষকের ব্যস্ততা জানান দিচ্ছে, হেমন্ত এসেছে নিঃশব্দে।

কার্তিক ও অগ্রহায়ণ, এই দুই মাস নিয়ে হেমন্ত ঋতু। শরতের বিদায় আর শীতের আগমনের মধ্যবর্তী এই সময় প্রকৃতিতে আনে ভিন্ন আবহ। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু, নরম রোদ আর বিকেলের স্নিগ্ধ বাতাসে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে চারপাশের চেনা দৃশ্যপট। হিমুর মতো খালি পায়ে শিশিরভেজা ঘাসে হেঁটে এ সময় হেমন্তকে বুকে ধারণ করা যায়। কুয়াশার চাদর, ঝরা পাতা আর সোনালি ধানের মাঠ মিলিয়ে হেমন্ত যেন প্রকৃতির লেখা এক নীরব কবিতা।

কবিরাও হেমন্তকে দেখেছেন নিজের মতো করে। কবি সুফিয়া কামাল তাঁর ‘হেমন্ত’ কবিতায় সবুজ পাতার খামে হলুদ গাঁদার চিঠি লেখার কল্পনায় ঋতুটির আগমনী বার্তা দিয়েছেন। দূর কোন পাথারের ওপার থেকে কে ডেকে আনে এই ঋতুকে, সেই প্রশ্নই যেন ধ্বনিত হয়েছে তাঁর পঙ্ক্তিতে।

হেমন্তের সকালে মাটিরাঙ্গা সদরের বিভিন্ন স্থানের একঝাঁক বয়স্ক মানুষ দুরন্ত গতিতে হেঁটে চলেছেন শিশিরভেজা পথ ধরে। হাঁটার ফাঁকে চলে গল্প-কাহিনি, স্মৃতিচারণ আর সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে জমজমাট আলোচনা। বয়সের ভার তাদের গতিকে থামাতে পারেনি। বরং প্রাত্যহিক এই হাঁটাচলায় শরীরচর্চার পাশাপাশি প্রাণ ফিরে পাচ্ছে বন্ধুত্ব, আড্ডা আর জীবনের চেনা ছন্দ।

পথ চলতে চলতে জাকির মাস্টারের বাড়ির পাশের সড়কে চোখে পড়ে শত শত শিউলি ফুলের সমারোহ। গাছ থেকে ঝরে পড়া সাদা পাপড়ি আর কমলা বোঁটায় পথজুড়ে বিছানো যেন এক অপূর্ব আল্পনা। প্রকৃতির বুকে নীরবে ফুটে থাকা এই ফুলগুলো যেন আগাম বার্তা দিচ্ছে হেমন্তের আগমনের।

শিশিরভেজা সকালে শিউলির মিষ্টি ঘ্রাণ আর কোমল সৌন্দর্যে চারপাশ হয়ে উঠেছে স্নিগ্ধ ও মায়াময়। ভোরের নরম আলোয় পাপড়িগুলো ঝলমল করছে, আর পথচলতি মানুষ থমকে দাঁড়িয়ে উপভোগ করছেন এই নীরব উৎসব।

হেমন্ত এলেই খেজুরের রস সংগ্রহের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন গাছিরা। ধারালো দা শান দিয়ে তৈরি করেন রস আহরণের সরঞ্জাম। গৃহস্থের সঙ্গে আগাম কথা বলে ঠিক করে নেন, এবার কোন কোন খেজুরগাছ কাটবেন। শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে শুরু হয় তাঁদের কর্মব্যস্ততা। খেজুরের রস আর সেই রস থেকে তৈরি সুস্বাদু গুড়ের আশায় গাছিদের মনে তখন নতুন স্বপ্নের বুনন।

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার গ্রামাঞ্চলেও ফুটে উঠতে শুরু করেছে হেমন্তের আগমনী বার্তা। পাহাড়ের ঢালে সবুজের সমারোহ, উপত্যকার ফসলি জমি আর গ্রামীণ জনপদে প্রকৃতি যেন নতুন করে মেলে ধরছে তার সৌন্দর্য। কোথাও ধানখেতে পেকে উঠছে সোনালি ধান, কোথাও ফসল ঘরে তোলার প্রস্তুতিতে বাড়ছে কৃষকের ব্যস্ততা। মাঠে মাঠে ধানের শিষ দোলার দৃশ্য গ্রামবাংলার চিরচেনা সৌন্দর্যকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলছে।

NewsDetails_03

তবে জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ওঠানামায় ঋতুর চিরচেনা বৈশিষ্ট্য অনেক সময় আগের মতো স্পষ্ট থাকে না। তবু প্রকৃতি নিজস্ব ছন্দে হেমন্তের উপস্থিতি জানান দেয়, কখনো শিশিরের কোমল স্পর্শে, কখনো পাকা ধানের সোনালি আভায়, আবার কখনো শীতের আগমনী হাওয়ায়।

চড়পাড়ার কৃষক আবুল কালাম বলেন, “হেমন্ত এলেই আমাদের মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়। নতুন ধান ঘরে তোলার প্রস্তুতি হিসেবে কৃষিকাজের সরঞ্জাম গুছিয়ে নিতে শুরু করি। ফলন ভালো হলে সারা বছরের পরিশ্রম কিছুটা হলেও সার্থক হয়। তবে সময়মতো ধান পাকা, অনুকূল আবহাওয়া এবং নির্বিঘ্নে ফসল ঘরে তুলতে পারা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”

আরেক কৃষক জামাল উদ্দিনের কণ্ঠে অবশ্য ভিন্ন সুর। তিনি বলেন, “হেমন্তের সৌন্দর্য নিয়ে ভাবার চেয়ে এখন ফসল ঘরে তোলার খরচ নিয়েই বেশি দুশ্চিন্তায় আছি। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে ধান মাড়াই ও প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচ বাড়বে। পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় এবার ধান কাটা থেকে শুরু করে ঘরে তোলা পর্যন্ত বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলাতে হবে। ফলে ভালো ফলন হলেও উৎপাদন খরচ মিটিয়ে কতটুকু লাভ থাকবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।”

মাটিরাঙ্গার উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুম বলেন, “হেমন্তের সৌন্দর্য শান্ত, স্নিগ্ধ ও মায়াময়। ভোরের শিশিরভেজা ঘাস, নরম রোদ আর প্রকৃতির রঙের পরিবর্তন মনকে প্রশান্ত করে। ব্যস্ত জীবনের কোলাহল থেকে একটু সময় বের করে প্রকৃতির সান্নিধ্যে এলে হেমন্তের অনন্য সৌন্দর্য ও গভীরতা উপলব্ধি করা যায়।”

মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, “হেমন্ত আমন ধানসহ বিভিন্ন ফসলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে কৃষকদের নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ করে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিতে হবে। পাশাপাশি আবহাওয়া ও ধানের পরিপক্বতা বিবেচনায় সঠিক সময়ে ফসল কাটতে পারলে ক্ষতির ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি উৎপাদিত ফসলের গুণগত মান বজায় রাখা সম্ভব।”

হেমন্তের সঙ্গে বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সম্পর্ক গভীর। নতুন ধান ঘরে ওঠার পর নবান্ন উৎসবের মধ্য দিয়ে গ্রামবাংলায় ছড়িয়ে পড়ে আনন্দের আবহ। নতুন চালের পিঠা-পায়েস, আত্মীয়স্বজনের মিলন আর লোকজ ঐতিহ্যের নানা আয়োজনে মুখর হয়ে ওঠে জনপদ। কৃষিনির্ভর বাংলার জীবনধারায় হেমন্ত তাই প্রাচুর্য, আনন্দ ও নতুন সম্ভাবনার প্রতীক।

হেমন্তের সৌন্দর্য কোলাহলমুখর নয়। সে আসে নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে। প্রকৃতির রং বদলায়, মাঠে ফসল পাকে, কৃষকের চোখে জাগে আশার আলো। বাংলার ঋতুচক্রে হেমন্ত তাই শুধু শরৎ ও শীতের মধ্যবর্তী সময় নয়। এটি নতুন ফসল, নতুন স্বপ্ন আর গ্রামবাংলার চিরন্তন সৌন্দর্যের এক মায়াবী অধ্যায়।

শিশিরভেজা সকাল, সোনালি ধানের মাঠ আর নরম রোদের মায়ায় প্রকৃতি যেন বলে উঠছে, হেমন্ত এসেছে নিঃশব্দে। সঙ্গে নিয়ে এসেছে বাংলার মাটি ও মানুষের নতুন দিনের প্রত্যাশা।