প্রবল ইচ্ছা, মনের জোর আর কঠোর প্রচেষ্ঠা যে কাউকে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। ঠিক তেমনি পরিবারের আয় বৃদ্ধি করে সন্তানদের উচ্চ শিক্ষা প্রদানে মাশরুম চাষ করে সাফল্য অর্জন করেছে বান্দরবানের জামছড়ি ইউনিয়নের বাঘমারা বড়ুয়া পাড়ার বাসিন্দা জয় সাগর বড়ুয়া।
ইউটিউবে মাশরুম চাষ দেখে উদ্ধুদ্ধ হয়ে একটি বেসরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখন জয় সাগর বড়–য়া এলাকায় পরিচিত মাশরুম দাদা নামে। স্বামী আর স্ত্রীর সুখের সংসারের পাশাপাশি এখন জয় সাগর বড়–য়ার মাশরুম বিক্রির উপার্জিত অর্থ দিয়ে ২ সন্তানকে চট্টগ্রামে দিচ্ছে উন্নত শিক্ষা।
জয় সাগর বড়–য়া জানান, একটি বেসরকারি চাকরি করতাম, বেতন কম, কষ্ট বেশি ছিল। ২০২১ সালে প্রথম ইউটিউবে দেখলাম মাশরুম চাষ করে লাভবন হওয়া যায়, আর সেই ভিডিও দেখে চাকরি ইস্তফা দিলাম। প্রথমে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে প্রাথমিকভাবে আমার বাড়ীতে মাশরুম চাষ শুরু করি আর মাশরুম চাষ করার পরপরই ফলন ভালো হয় আর বিক্রি করে পাই প্রচুর অর্থ।
এদিকে ২০২৩ সালে সরকারীভাবে আমাকে বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীনে ঢাকার সাভারে ৫ম ব্যাচে মাশরুম চাষের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ১০ দিনের এই প্রশিক্ষণ পেয়ে আমি আরো এগিয়ে যায়। দৈনিক এখন ২০-৩০কেজি আমার কাছে মাশরুম উৎপাদন হচ্ছে আর পাইকারী ৩০০টাকা ও খুচরা ৪০০টাকা কেজিতে মাশরুম বিক্রি হচ্ছে জানান জয় সাগর।
মাশরুম চাষে পরিবারের আর্থিক অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে বলে জয় সাগর জানান, আমার বড় মেয়ে চট্টগ্রামের বিজিসি ট্রাস্টে অনার্স এবং ছেলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে অধ্যায়নরত রয়েছে। পরিবারে জয় সাগরের সাথে তার স্ত্রী শিলু বড়য়ুা সার্বিক সহযোগিতা করছে জানিয়ে জয় সাগর বলেন, মাশরুম বিক্রির অর্থ দিয়ে আমি আমার পরিবার সুন্দরবঅবে চালাতে পারছি আর আমাকে দেখে অনেকে মাশরুম চাষে নেমেছে।

কৃষি অফিসের সহায়তায় আমি একটি অটো ক্লাব ঘর, পাস্তোলাইজেশন, নিকোলেশান চেম্বার এবং একটি ভ্যান গাড়ী পেয়েছি জানিয়ে জয় সাগর বড়ুয়া বলেন,আমার আওতায় এখন জামছড়ি ইউনিয়নের বাঘমারায় ৩০জন চাষী প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা ও সুন্দরভাবে মাশরুম চাষ করে ভালো লাভ করছে।
প্রথমে ওয়েস্টার মাশরুম চাষ করলেও এখন মিল্কি মাশরুম চাষ শুরু করেছি জানিয়ে জয় সাগর বলেন, বান্দরবানে প্রচুর মাশরুমের চাহিদা রয়েছে। তবে মাতৃচারা আর একটি ল্যাব পেলে আমাদের উৎপাদন আরো বাড়বে। বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ থেকে একটি টিস্যু কালচার ল্যাব তৈরি করে দেওয়ায় আশ্বাস দেয়া হলেও সে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় আক্ষেপ করে জয় সাগর বড়–য়া কৃষি বিভাগ ও সরকারের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন যাতে পার্বত্য জেলা বান্দরবানে আরো মাশরুম চাষ বৃদ্ধি করা যায়।
এদিকে সদর উপজেলা কৃষি অফিসার মো.রাকিবুল হাসান জানান, জয় সাগর বড়ুয়া বান্দরবানে প্রচুর মাশরুম উৎপাদন করছেন এবং প্রতিদিন বিক্রি করে ভালো আয় করছেন।
কৃষি বিভাগ জয় সাগরকে বিভিন্ন ধরণের সহযোগিতা করছে মন্তব্য করে সদর উপজেলা কৃষি অফিসার মো. রাকিবুল হাসান আরো জানান, আমরা বান্দরবানে মাশরুম চাষ সম্প্রসারণে নানা উদ্যোগ হাতে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ২০২৩ সাল থেকে বান্দরবানে মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের জন্য প্রশিক্ষণ প্রদান শুরু হয় আর এই পর্যন্ত প্রায় ৫০০চাষী ও উদ্যোক্তা জেলায় এই মাশরুম চাষের সাথে জড়িত জানিয়ে মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসকরণ প্রকল্প, ঢাকা এর প্রকল্প পরিচালক আখতার জাহান কাঁকন জানান, পার্বত্য জেলা বান্দরবানের মাটি, আবহাওয়া, জলবায়ু মাশরুম চাষের উপযোগী। মাশরুম এক ধরণের সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাবার। মাছ বা মাংসের সমতুল্য নির্দোষ আমিষের চমৎকার উৎস এটি, যা মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় আটটি অ্যামিনো অ্যাসিডই সরবরাহ করে। মাশরুম খাবারের ফলে নানা ধরণের উপকারিতা রয়েছে বলে মন্তব্য করে তিনি আরো বলেন, মাশরুম খাবারের ফলে হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণ, হাড় মজবুত থাকে, ক্যালসিয়াম- ফসফরাস ও ভিটামিন ডি এর চাহিদা পূরণ হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। বান্দরবানের পাহাড়ে এই মাশরুমের সম্ভাবনা আরো বেশি।
প্রকল্প পরিচালক আখতার জাহান কাঁকন জানান, আগে পাহাড় থেকে স্থানীয়রা খুঁজে খুঁজে মাশরুম সংগ্রহ ও বিক্রি করলেও এখন বান্দরবানের বিভিন্নস্থানে মাশরুম চাষ ও বিক্রি হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে বান্দরবানে মাশরুম চাষ সম্প্রসারণে বিভিন্ন সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে এবং আগামীতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে জানান তিনি।



