জাতীয়করণের ঘোষণায় আনন্দের মাঝেও মানদণ্ড নিয়ে শিক্ষকদের হতাশা ও আশঙ্কা

থানচির আলোচিত স্কুল

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের সরকারি ঘোষণায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় জনগণের মাঝে আনন্দের সৃষ্টি হলেও নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ নিয়ে হতাশা ও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন দুর্গম এলাকার অনেক শিক্ষক। এমন চিত্র দেখা গেছে বান্দরবানের থানচি উপজেলার প্রত্যন্ত তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে।

দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত এই বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং বিদ্যালয়ের আয়ের উৎস তৈরির লক্ষ্যে ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসন থেকে পাওয়া দুইটি ইঞ্জিন বোট পরিচালনা করে শিক্ষকদের বেতন ও বিদ্যালয়ের পরিচালন ব্যয় বহন করছেন।

গত ২৮ জুন জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ঘোষণা দেওয়ার পর এলাকায় ব্যাপক আনন্দের সৃষ্টি হয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে শিক্ষকতা করা শিক্ষকদের মাঝে দেখা দিয়েছে নতুন শঙ্কা—জাতীয়করণের শর্ত পূরণ না হলে তারা আদৌ চাকরিতে বহাল থাকতে পারবেন কি না।

জানা গেছে, ২০২০ সালে একটি পরিত্যক্ত টিনশেড ঘরে তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। প্রায় ৩ একর জমিতে আগে সেখানে ছিল তিন্দু গ্রুপিং পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ২০১৯ সালে নতুন বহুতল ভবন নির্মাণের পর পুরোনো টিনশেড ভবনটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। সেই জীর্ণ ভবন সংস্কার করে শুরু হয় নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান।

তৎকালীন তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মংপ্রুঅং মারমার অর্থায়ন ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। পাঁচজন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে একটি পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয় এবং রেমাক্রী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াংকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে ২০২২ সালে চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন ভাগ্য চন্দ্র ত্রিপুরা। তিনি বিদ্যালয়ের আর্থিক সহায়তা, আসবাবপত্র এবং আয়ের উৎস হিসেবে একটি ইঞ্জিন বোট প্রদান করেন।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, ভাঙাচোরা টিনশেডের চার কক্ষের মধ্যে তিনটি শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং একটি অফিস কক্ষ। পাশের একটি কক্ষ ছাত্রাবাসের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে নবম শ্রেণিতে ৪ জন, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৮ জন, সপ্তম শ্রেণিতে ৯ জন এবং অষ্টম শ্রেণিতে ৮ জনসহ মোট ২৯ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত পাঠ গ্রহণ করছে। যদিও কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৫২ জন দেখানো হয়েছে।

বিদ্যালয়ে বর্তমানে নিয়মিত শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৪ জন। তবে নথিতে ১৩ জন শিক্ষক দেখানো হলেও অন্যরা বিভিন্ন স্থানে চাকরিরত এবং বিদ্যালয়ে উপস্থিত নেই।

সহকারী শিক্ষক পাওং ম্রো বলেন, “২০২০ সালে ১০ হাজার টাকা বেতনে যোগদান করলেও প্রায় ৪০ মাস ধরে কোনো বেতন পাইনি। এলাকার দরিদ্র শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে মানবিক দায়িত্ব থেকে পাঠদান করে যাচ্ছি। বেতন না পাওয়ায় শিক্ষক নিবন্ধন ও বিএড সম্পন্ন করাও সম্ভব হয়নি।”

NewsDetails_03

তিনি আরও বলেন, নথিতে দেখানো অনেক শিক্ষক প্রধান শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির নিকট আত্মীয় এবং তারা অন্যত্র চাকরি করেন। জাতীয়করণ হলে তারা ফিরে আসবেন কি না, সেটিও প্রশ্নসাপেক্ষ।

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী পংএ খুমী, নাংথং ম্রো, থুইমেচিং মারমা ও চন্দ্রা ত্রিপুরা জানায়, তাদের পরিবার দরিদ্র হওয়ায় অনেকেই পড়াশোনা বন্ধ করার চিন্তা করছিল। কিন্তু জাতীয়করণের ঘোষণা তাদের নতুন আশা দেখাচ্ছে। তারা পড়াশোনা করে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়।

জানা গেছে, জাতীয়করণের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ১২০ জন শিক্ষার্থী, নিজস্ব জমি, মানসম্মত স্থায়ী ভবন, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, শৌচাগার, শিক্ষা পরিবেশ, শিক্ষকদের নিবন্ধন সনদ, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া ও শিক্ষা বোর্ড অনুমোদনের মতো বিষয় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু দেশের অনেক দুর্গম অঞ্চলের প্রতিষ্ঠান এসব শর্ত পূরণে পিছিয়ে রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিবছর ১০ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে, যা উদ্বেগজনক।

সহকারী শিক্ষক পুচিংমং মারমা বলেন, “দীর্ঘ ৬ থেকে ৭ বছর বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করা শিক্ষকরা আশঙ্কা করছেন, জাতীয়করণের কঠোর শর্তের কারণে তাদের অনেকেই বাদ পড়ে যেতে পারেন।”

সহকারী শিক্ষিকা কাইলং খুমী ও নাংছুং খুমী বলেন, “জাতীয়করণের ক্ষেত্রে শুধু অবকাঠামো নয়, দীর্ঘদিন ধরে ত্যাগ স্বীকার করে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া শিক্ষকদের বাস্তব পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিয়ে শর্ত কিছুটা শিথিল করা উচিত।”

অভিভাবক চিংথোয়াইপ্রু মারমা বলেন, “জাতীয়করণের ঘোষণায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের মাঝে আশার সঞ্চার হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত শিক্ষকরা চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাদের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।”

প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং (মিংলেন) বলেন, “দুর্গম অংসাউ খিয়াং পাড়ায় আমার জন্ম। স্বাধীনতার পর থেকেও এই এলাকায় শিক্ষার হার খুবই কম। তাই যত কষ্টই হোক বিদ্যালয়টির জন্য আজীবন শ্রম দিয়ে যাব। ইউনিয়ন পরিষদ ও প্রশাসনের দেওয়া ইঞ্জিন বোট চালিয়ে শিক্ষকদের বেতনের ব্যবস্থা করছি। আমাদের এই ত্যাগ ও সংগ্রামের বিষয়টি সরকার যেন মানবিকভাবে বিবেচনা করে।”

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও তিন্দু ইউপি চেয়ারম্যান ভাগ্য চন্দ্র ত্রিপুরা বলেন, “এ ইউনিয়নে চারটি সরকারি ও চারটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এটি দেশের অন্যতম দুর্গম এলাকা, যেখানে এখনও মোবাইল নেটওয়ার্ক সুবিধা সীমিত। শিক্ষার হারও কম। তাই জাতীয়করণের ঘোষণা দেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। একই সঙ্গে এখানকার শিক্ষক ও জনগণের বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

আরও পড়ুন