আজ এই দিনটাকে মনের খাতায় গেঁথে রেখো

প্রিয় ফটিকছড়িবাসী

পৃথিবীর অস্থিরতম সময়ে বাংলাদেশের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের কোথাও স্বস্তি নেই। উদ্বিঘœ সবাই। সেই নৈরাশ্যের সময়ে মানুষ পেশা হারাচ্ছে। পেশা বদলাচ্ছে। কেউ কেউ জীবন-জীবিকার পেশাও বদলাতে পারছে না। নিদারুণ এক অসহায়ত্বের জীবন ফেরী করে চলছে পৃথিবী এবং আমাদের স্বদেশ।
এই সেই দেশ-স্বজন-চেনা-জানা চারপাশ কেনো জানি অচেনা হয়ে উঠলো। কেউ কারো দায় নিতে অপারগ। মা-বাবা অথবা সন্তান মারা গেলেও কেউ কারো পাশে নেই। ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন- জীবনের জন্য’ এসব প্রতিষ্ঠিত ডায়ালগ যেন খল নায়কের উক্তি-ই হয়ে উঠলো।

স্বজনের লাশ পড়ে থাকে যেখানে সেখানে। কেউ কারো নয়। এই যখন অবস্থা, তখন; জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিলেন, তাঁর পিতার মতোই। ‘কেউ না খেয়ে থাকবে না, কাউকে চিকিৎসা ছাড়া মরতে হবে না’। এই ঘোষণার পর দেশের বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনের সর্বস্তরের সরকারি কর্মচারি-কর্মকর্তারা-জনপ্রতিনিধি-রাজনীতিক-শিল্পপতি-ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা ও সমাজের নিবেদিত সব শ্রেণী-পেশার মানুষ জেগে উঠলেন।

সারাদেশে শুরু হলো মানুষের পাশে মানুষ, প্রাণির পাশেও মানুষ; এ যে এক মহাদুর্যোগ উত্তরণের মহা প্রস্তুতি। তারই ধারাবাহিকতায় দেশের সমতল এলাকার সবচেয়ে জনবহুল এবং আয়তনে বড়ো চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় সূচিত হলো ভিন্নতরো এক উদ্যোগ।
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ভারত গমনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ট্রানজিট ফটিকছড়ির মানুষ জেগে উঠলো কোভিড বিপন্ন মানুষ বাঁচানোর লড়াকু এক সম্মুখ যুদ্ধে।

ফটিকছড়ির মাননীয় সংসদ সদস্য এবং উপমহাদেশের প্রখ্যাত পীর-আউলিয়া পরিবারের সন্তান শ্রদ্ধেয় সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী, মাননীয় নারী সংসদ সদস্য খাদিজাতুল আনোয়ার সনি, সম্মানিত উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এইচ. এম. আবু তৈয়ব, সম্মানিত ইউএনও সায়েদুল আরেফীন এবং সম্মানিত পৌর মেয়র মো: ইসমাঈল; যুথবদ্ধ হয়ে আওয়াজ তুললেন; ‘আমরা ফটিকছড়ির মানুষ, আমরা হারবো না, আমরা সরকারের পাশাপাশি দাঁড়াবো সবাই মিলে।’
কী এক, দৈব মেহেরবানী!

দেশের স্রোত ধারা থেকে জন্ম নেয়া ‘হালদা’ বিধৌত ফটিকছড়ির মানুষ জেগে উঠলেন সর্বশক্তি আর সর্বপ্রাণের উত্তেজনায়। জাতি-ধর্ম-দল-মত নির্বিশেষে মানুষ উদাত্ত চিত্তে উদার সামর্থ্যে ঝাঁপিয়ে পড়লেন ‘একটি কোভিড-১৯’ বিশেষায়িত হাসপাতাল বির্নিমাণে।

উপজেলা সদরের প্রায় অব্যবহৃত ৩০ শয্যার (এক সময়কার সাব-সেন্টার) স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ঘিরে সৃষ্টি হলো সম্মিলিত সৃষ্টির নতুন এক উন্মাদনা।

একজন সরকারি কর্মকর্তা হিশেবে উপজেলা প্রশাসনের প্রধান নির্বাহী পদে থেকে ঐক্যবদ্ধ একটি স্বপ্ন বাস্তবায়নের রুপরেখা তুলে ধরলেন, ইউএনও মো: সায়েদুল আরেফীন।
তাঁর সময় উপযোগী বিনয় আহবানে সাড়া পড়ে গেলো। দায়-দায়িত্ব পালনের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করলেন, শীর্ষস্থানীয় মাননীয় জনপ্রতিনিধিরা। সর্বহারা সংবাদকর্মীরা স্বভাবজাত নিয়মেই বুক উঁচু করে নিলেন প্রচারণার দায়িত্ব। এগিয়ে আসলেন ছাত্র-যুবকরা। সামর্থ্যবান সব মানুষ এগিয়ে আসলেন সর্বশক্তি নিয়ে। অন্যরকম এক তারুণ্যের শক্তিতে যেনো কেঁপে উঠলো দেশ ও বিশ্বের ইতিহাসে পরিচিত ‘ফটিকছড়ি’।

হাজার-লক্ষ-কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলো দান-সম্প্রদানের সীমা। শুধু কী তাই! একটি জরুরী স্বাস্থ্য সেবাদান করতে সক্ষম প্রতিষ্ঠানে যা যা দরকার; সবই যোগাড় হয়ে গেলো সবার সহৃদয় সাড়ায়।

রাজনীতিপ্রবণ ফটিকছড়ির সব দল-মতের মানুষ যেনো মাত্র দুই মাসেই হয়ে উঠলেন জাতির ক্রান্তিকালের মহাঐক্যের মহা প্রতিভূ।
ফটিকছড়ির মানুষ দেশের যতো উপরে আছেন অর্থ-বিত্ত ও আর প্রশাসনিক-রাজনৈতিক পদ-পদবীতে অথবা দেশের বাইরে; সবাই এক বাক্যে সায় দিলেন। প্রমাণ করলেন, ফটিকছড়িই সবার প্রাণ। ‘হালদা’র উদার পলির ঐশ্বর্য্যে যেমন বাপ-দাদার ভিটে আর ফসলি জমি উর্বর হয়ে উঠে, তেমনি নিজের ঘাম-শ্রম-মেধা আর পুঁজিতে কামানো টাকার সর্বোচ্চ অংশ দান করে গড়ে তুললেন, স্বপ্নের ‘ফটিকছড়ি কোভিড-১৯ বিশেষায়িত হাসপাতাল’।

আজ ২৭ জুলাই ২০২০ ইংরেজি। এই দিনে শুভ উদ্বোধন হতে যাচ্ছে দেশের উপজেলা পর্যায়ের প্রথম একমাত্র ‘কোভিড-১৯ বিশেষায়িত হাসপাতাল’। বিস্ময়ের বিষয়, মানুষের টাকায় এই উদ্যোগের প্রধান সমন্বয়কারি ইউএনও সায়েদুল আরেফীন-এর কাছে জমা পড়েছে এক কোটি সত্তর লক্ষ টাকা (১ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা) এবং ৭০ লক্ষ টাকার প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সরঞ্জাম।
নিশ্চয়ই একদিন পরম করুণাময়ের অশেষ দয়ায় মহামারী কোভিড-১৯ বিপর্যয় কেটে যাবে। পৃথিবী এবং স্বদেশ জেগে উঠবে স্বাভাবিক নিয়মেই। আমরা সবাই সে দিনের অপেক্ষায় সৃষ্টিকর্তা মুখ পানে চেয়ে আছি। সে দিন আর দূরে নয়। তখনো এই হাসপাতাল আর মানুষের দান-সম্প্রদানে গড়া সর্বোত্তম স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের উপাদানগুলো ফটিকছড়ির প্রত্যেকটি মানুষের উপকারে আসবে।

তাই বলি,‘প্রিয় ফটিকছড়িবাসী, আজ এই দিনটাকে মনের খাতায় লিখে রেখো..’।

প্রদীপ চৌধুরী:

হালদা পাড়ের স্থায়ী বাসিন্দা এবং বর্তমানে খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি হিসেবে দৈনিক সমকাল পত্রিকায় কর্মরত।

আরও পড়ুন
Loading...